👁 79 Views

জহুরুল ইসলাম বাবু : খাদহীন সরব এক রাজনীতিকের নিরব প্রস্থান

                                   ।। এবিএম ফজলুর রহমান।।

কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া স্মৃতি, কর্ম ও সময়ের সাক্ষ্য সহজে মুছে যায় না। তাঁরা তাঁদের সময়কে অতিক্রম করে হয়ে ওঠেন একটি প্রজন্মের প্রতিনিধি। জহুরুল ইসলাম বাবু ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আশির দশকের ছাত্ররাজনীতির অত্যন্ত পরিচিত মুখ, যাঁর রাজনৈতিক পথচলা পরবর্তী সময়ে বিস্তৃত হয়েছে জাতীয় রাজনীতির পরিসরেও।
২৫ আগস্ট ২০২৬ রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন জহুরুল ইসলাম বাবু। লিভার-সংক্রান্ত জটিলতায় তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গন, বিশেষ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও সহযোদ্ধাদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। খাদহীন সরব এক রাজনীতিকের নিরব প্রস্থান।
জহুরুল ইসলাম বাবুর পরিচয়ের সঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। আশির দশকে যখন দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা ছিল উত্তাল, তখন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসও ছিল নানা মত, আদর্শ ও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সেই সময়ের ছাত্ররাজনীতিতে তিনি ছিলেন সক্রিয় ও সুপরিচিত একজন নেতা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন সংগঠনের নানা কর্মসূচিতে। পরবর্তীতে রাকসুর সিনেট সদস্য হিসেবেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। রাকসুর ভিপি নির্বাচনে তাকে সম্বাব্য প্রার্থী করার করা থাকলেও পরে আর হয়নি।
একজন ছাত্রনেতার রাজনৈতিক জীবন সাধারণত ক্যাম্পাসের সীমানায় থেমে থাকে না। জহুরুল ইসলাম বাবুর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ছাত্রজীবনের রাজনীতি পেরিয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি নিজ জেলা পাবনার রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকান্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তিনি নিরব নিভৃত এক আর্দশবান রাজনীতির প্রতিকৃত।
তাঁকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁদের স্মৃতিতে হয়তো ফিরে আসবে তাঁর সহজ-সরল আচরণ, পরিমিত কথাবার্তা এবং রাজনৈতিক বিষয়ে দৃঢ় অবস্থানের নানা গল্প। রাজনীতির মাঠে সক্রিয় থেকেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অনেকটাই প্রচারবিমুখ। এ কারণেই হয়তো তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অনেক অধ্যায় আজও স্মৃতির অলিন্দে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কিন্তু তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে বড় জায়গাটি হয়তো কোনো পদ নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি ও মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক।
একজন রাজনীতিকের মূল্যায়ন কেবল তিনি কত বড় পদে ছিলেন, কতটা আলোচনায় ছিলেন কিংবা কতটা জনপ্রিয় ছিলেন এসব দিয়ে হয় না। কখনো কখনো একজন মানুষের রাজনৈতিক জীবনের প্রকৃত মূল্য লুকিয়ে থাকে তাঁর নীরব অবদান, সহযোদ্ধাদের স্মৃতি এবং মানুষের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে।
তাঁর জীবনের আরেকটি পরিচয় ছিল ক্রিকেটের সঙ্গে। পাবনা পিওয়াইসি ক্লাবের কৃতি ক্রিকেটার হিসেবে তিনি খেলাধুলার অঙ্গনেও পরিচিত ছিলেন এবং পাবনা সাবেক ক্রিকেটার সমিতির সদস্য ছিলেন। ফলে তাঁর ব্যক্তিজীবনের পরিসর শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; শিক্ষা, সংগঠন, খেলাধুলা ও সামাজিক পরিসর বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাঁর বিচরণ ছিল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাসে বহু ছাত্রনেতা এসেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন, পরে জাতীয় জীবনে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক পথচলা আলাদা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিতে তাঁরা একই সূত্রে বাঁধা তারুণ্যের স্বপ্ন, উত্তাল সময়, সহপাঠীদের সঙ্গে পথচলা এবং পরিবর্তনের আকাংখা।
জহুরুল ইসলাম বাবুর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও তৈরি হয়েছিল রাবি ক্যাম্পাসেই। ছাত্ররাজনীতির সেই সময় তাঁকে শুধু একজন সংগঠক হিসেবে নয়, একজন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেও পরিচিত করে। তাঁর সহযোদ্ধা ও সমসাময়িকদের কাছে সেই সময়ের নানা স্মৃতি আজ নিশ্চয়ই ফিরে আসছে ক্যাম্পাসের মিছিল, সভা, আড্ডা, রাজনৈতিক বিতর্ক আর ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে তরুণদের স্বপ্ন।
সময়ের ব্যবধানে ক্যাম্পাস বদলেছে, রাজনীতির ভাষা বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে। কিন্তু পুরোনো দিনের সেই মানুষগুলোর স্মৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অংশ হয়ে থেকে যায়।
জহুরুল ইসলাম বাবুর রাজনৈতিক জীবনকে শুধু ছাত্ররাজনীতির গতিতে দেখলে তাঁর সামগ্রিক পথচিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ছাত্রজীবনে অর্জিত সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে তাঁকে জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দেয়। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়েও দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু মনের কোনে এক অজানা ব্যথা নিরব কষ্ট প্রকাশ করার আগেই তাকে চিরদিনের মত চলে হলো।
পাবনার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরেও তাঁর উপস্থিতি ছিল। পাবনা কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবেও তিনি নিষ্টার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এই বহুমাত্রিক পরিচয়ই জহুরুল ইসলাম বাবুর জীবনকে আলাদা করে। তিনি ছিলেন একদিকে ছাত্ররাজনীতির সংগঠক, অন্যদিকে জাতীয় রাজনীতির কর্মী; একই সঙ্গে ছিলেন ক্রীড়াপ্রেমী ও সামাজিক কর্মকান্ডে যুক্ত একজন মানুষ।
মানুষের শারীরিক মৃত্যু জীবনের সমাপ্তি ঘটায়, কিন্তু কর্মময় মানুষের ক্ষেত্রে স্মৃতির মৃত্যু হয় না। জহুরুল ইসলাম বাবুর ক্ষেত্রেও তাই। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে, তাঁর কর্মকান্ড মানুষ ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করতে পারে এটাই গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই: তিনি তাঁর সময়ের একজন সক্রিয় মানুষ ছিলেন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতির একটি নির্দিষ্ট সময়ের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর হয়তো আজও আগের মতোই আছে। বদলে গেছে শুধু সময়ের মানুষগুলো। ক্যাম্পাসের কোনো এক প্রান্তে হয়তো তাঁর পুরোনো সহযোদ্ধারা বসে অতীতের গল্প করবেন। ফিরে আসবে আশির দশকের সেই দিনগুলোর কথা। আর সেই স্মৃতির ভেতর দিয়ে ফিরে আসবেন জহুরুল ইসলাম বাবু একজন ছাত্রনেতা, একজন রাজনৈতিক কর্মী এবং একটি সময়ের সাক্ষী হয়ে।
মানুষ চলে যান, সময় চলে যায়; কিন্তু ইতিহাস তার মানুষদের ভুলে যায় না। জহুরুল ইসলাম বাবুও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় তেমনই এক নাম হয়ে থাকবেন। মহান সৃষ্টিকর্তা জহুরুল ইসলাম বাবুর আত্ত্বাকে শান্তিতে রাখুন।

লেখক : এবিএম ফজলুর রহমান, স্টাফ রির্পোটার, দৈনিক সমকাল, পাবনা এবং সাবেক সভাপতি, পাবনা প্রেসক্লাব। ।

এবিএম ফজলুর রহমান
স্টাফ রির্পোটার, সমকাল, পাবনা অফিস
২৯ আগষ্ট, ২০২৬ ইং।
মোবাইল : ০১৭৩২-১১৭০১১।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *