
ছাদেকুল ইসলাম রুবেল, গাইবান্ধা : জীবনভর অর্থের চেয়ে মানুষ গড়াকেই বড় মনে করেছেন তিনি। নিজের দারিদ্র্য ও সীমাবদ্ধতাকে উপেক্ষা করে অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরে মাত্র এক টাকার বিনিময়ে গ্রামের শিশুদের শিক্ষা দিয়ে আসছেন গাইবান্ধা সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের বাগুড়িয়া গ্রামের প্রবীণ শিক্ষক লুৎফর রহমান। সবার কাছে তিনি পরিচিত ‘এক টাকার মাস্টার’ নামেই। এবার তাঁর দীর্ঘদিনের নিঃস্বার্থ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে নতুন একটি ঘর নির্মাণ করে দিচ্ছে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এসএসসি পাস করার পর আর্থিক সংকটের কারণে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে পারেননি লুৎফর রহমান। তবে শিক্ষা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে না রেখে গ্রামের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। সেই থেকে শুরু হয় তাঁর এক অনন্য পথচলা। প্রতীকী সম্মানী হিসেবে মাত্র এক টাকা নিয়ে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পাঠদান করে তিনি হয়ে ওঠেন এলাকার সবার প্রিয় ‘এক টাকার মাস্টার’।
বছরের পর বছর ধরে ঝড়-বৃষ্টি কিংবা রোদ উপেক্ষা করে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে গেছেন তিনি। তাঁর কাছে শিক্ষা কোনো ব্যবসা নয়, বরং সমাজ গড়ার একটি মহৎ দায়িত্ব। তাই অর্থাভাবে যেন কোনো শিশুর পড়াশোনা বন্ধ না হয়, সেই লক্ষ্যেই তিনি আজও নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন।
এই অসাধারণ মানবিক অবদানের প্রতি সম্মান জানিয়ে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লার নির্দেশনায় সদর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাঁর জন্য একটি নতুন ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে।
গিদারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইদু জানান, জেলা প্রশাসনের নির্দেশে ইউনিয়ন পরিষদের তত্ত্বাবধানে ঘরটির নির্মাণকাজ চলছে। নির্মাণ শেষ হলে ওই ঘরেই শিশুদের পাঠদান করবেন ‘এক টাকার মাস্টার’, যা ভবিষ্যতে এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ছোট্ট শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, লুৎফর রহমান শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি মানবিক শিক্ষা আন্দোলনের এক নীরব যোদ্ধা। তাঁর মতো মানুষের পাশে জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবে এবং শিক্ষার জন্য নিবেদিত মানুষদের নতুন করে অনুপ্রাণিত করবে।
এক টাকার বিনিময়ে শুরু হওয়া এই আলোকযাত্রা আজ হাজারো মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। নতুন ঘরটি কেবল একটি বসতঘর নয়, এটি একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের প্রতি সমাজের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রতীক।