
এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ স্টিয়ারিং গিয়ারের ত্রুটির তথ্য গোপনের অভিযোগ, নিরাপত্তা ঝুঁকিতে বন্দর স্টিয়ারিংয়ে কোনো সমস্যা ছিল না। এমন সমস্যা থাকলে জাহাজটি এত দূর আসতে পারত না। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন
চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশের সময় স্টিয়ারিং গিয়ারের ত্রুটির তথ্য গোপন করে বন্দর ও নৌযানের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলার অভিযোগে বিদেশী জাহাজ ‘এমভি সিএনসি ইউরেনাস’-এর মাস্টার ও শিপিং এজেন্টকে এক কোটি টাকা জরিমানা করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। জরিমানার পাশাপাশি ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাবদ আরো ১৫ লাখ টাকা জমা দিতে বলা হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, জাহাজটির ‘স্টিয়ারিং গিয়ার হাইড্রোলিক লকিং অ্যালার্ম’-এ ত্রুটি থাকার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাসময়ে অবহিত করা হয়নি। বরং তথ্য গোপন রেখেই জাহাজটি বন্দরের চ্যানেলে প্রবেশের উদ্যোগ নেয়। এতে বন্দর, জাহাজ, পাইলট, বন্দরের স্থাপনা এবং অন্যান্য নৌযানের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে।
গত ৩ আগস্ট দুপুর সোয়া ২টার দিকে মাল্টার পতাকাবাহী ১৭০ মিটার দীর্ঘ ‘এমভি সিএনসি ইউরেনাস’ চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশের সময় কর্ণফুলী মোহনার কাছে আটকে যায়। স্টিয়ারিং বিকল হয়ে জাহাজটি ২ নম্বর বয়ার সঙ্গে ধাক্কা খায়। পরে সেটি কর্ণফুলীর মোহনা সংলগ্ন প্রতিরক্ষা দেয়ালে আটকে যায়।
চীনের শিকোউ বন্দর থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে চট্টগ্রামে আসা জাহাজটিতে ছিল ১ হাজার ২৮২ টিইইউএস কনটেইনার। জাহাজে কর্মরত ছিলেন ২৪ জন নাবিক।
দুর্ঘটনার পর ৩ আগস্ট গভীর রাতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের সমন্বিত প্রচেষ্টায় জাহাজটি সরিয়ে বন্দরের ‘বি অ্যাঙ্করেজে’ নিরাপদে নোঙর করা হয়। পরে ৮ আগস্ট জাহাজটিকে বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থের ১১ নম্বর জেটিতে নেয়া হয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষের আদেশে বলা হয়েছে, জাহাজটির স্টিয়ারিং গিয়ার হাইড্রোলিক লকিং অ্যালার্মে ত্রুটি থাকার বিষয়টি আগে থেকেই জানা ছিল। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা (আইএসএম) কোড অনুযায়ী পাইলটদের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের সময় বিষয়টি জানানোর কথা থাকলেও তা করা হয়নি।
বন্দর চ্যানেলে প্রবেশের ঠিক আগ মুহূর্তে জাহাজের মাস্টার পাইলটকে ত্রুটির বিষয়টি জানান। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি ডিএনভির ইস্যু করা একটি ক্লাস সনদ হস্তান্তর করা হয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই সনদেই স্টিয়ারিং গিয়ার হাইড্রোলিক লকিং অ্যালার্মে ত্রুটির বিষয়টি উল্লেখ ছিল। সনদের তৃতীয় শর্তে জাহাজ বন্দরে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে পাইলট ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানোর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ছিল। কিন্তু তা না করে জাহাজটি বন্দরে প্রবেশের উদ্যোগ নেয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আদেশে বলা হয়েছে, ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতার বিষয় যথাসময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করে জাহাজ পরিচালনার মাধ্যমে বন্দর, জাহাজ, পাইলট, বন্দর স্থাপনা ও অন্যান্য নৌযানের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্দরের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ কারণে জাহাজটির মাস্টার ও শিপিং এজেন্টকে এক কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাবদ ১৫ লাখ টাকার দুটি পে-অর্ডার বন্দর তহবিলে জমা দিতে বলা হয়েছে।
বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বন্দরের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলায় জাহাজটিকে জরিমানা করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে মঙ্গলবার পর্যন্ত কোনো কমিটিই প্রতিবেদন জমা দেয়নি।
নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন শেখ জামাল উদ্দিন গাজী বলেন, তারা জাহাজটি পরিদর্শন করেছেন। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি কাজ করছে। প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তদন্ত কমিটির সদস্য ডক মাস্টার ক্যাপ্টেন মো. আবু সুফিয়ান বলেন, জাহাজটির বিষয়ে তদন্ত কমিটি কাজ করছে।
জাহাজটির বাংলাদেশী শিপিং এজেন্ট আমেরিকান প্রেসিডেন্ট লাইনস (এপিএল) বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক কনটেইনার শিপিং প্রতিষ্ঠান সিএমএ-সিজিএম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
জাহাজের ত্রুটির তথ্য গোপনের অভিযোগ প্রসঙ্গে এপিএলের এক কর্মকর্তা বলেন, জাহাজে যদি বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি থেকেই থাকে, তাহলে সেটি চীন থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত আসল কীভাবে?
তিনি বলেন, ক্লাস সার্ভের সময় স্টিয়ারিং গিয়ার হাইড্রোলিক লকিং অ্যালার্মে ত্রুটির বিষয় উল্লেখ করে গন্তব্য বন্দরে তা জানাতে বলা হয়েছিল। তাড়াহুড়ার কারণে মাস্টার বিষয়টি পাইলটকে জানাতে পারেননি।
ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, স্টিয়ারিংয়ে কোনো সমস্যা ছিল না। এমন সমস্যা থাকলে জাহাজটি এত দূর আসতে পারত না। বয়ার সঙ্গে ধাক্কা এবং পরে প্রতিরক্ষা দেয়ালে আটকে যাওয়ার ঘটনা দুর্ঘটনাবশত ঘটেছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের জরিমানা পরিশোধের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানান এপিএলের ওই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, জাহাজ থেকে আমদানি পণ্য খালাস করা হলেও বুকিং থাকা প্রায় ১ হাজার ৩০০ রফতানি পণ্যের কনটেইনার জাহাজে তোলা হয়নি। এতে রফতানি খাত ক্ষতির মুখে পড়ছে।
তবে নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত জাহাজটির প্রকৃত ত্রুটি এবং দুর্ঘটনার সঠিক কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।