
মু, আলী আছগর ইমন, সুনামগঞ্জ, (জগন্নাথপুর) প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী বিদ্যাপীঠ স্বরূপচন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯ লাখ টাকার সরকারি মেরামত ও সংস্কার কাজে ব্যাপক অনিয়ম, চরম গাফিলতি ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। শিডিউল বা প্রাক্কলন তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমাফিক কাজ করায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের তীব্র আপত্তির মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত সংস্কার কাজ বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ সময় উপস্থিত বিক্ষুব্ধ জনতার তোপের মুখে তড়িঘড়ি করে সটকে পড়েন সংশ্লিষ্ট উপ-সহকারী প্রকৌশলী ভানু দাস ও ঠিকাদার নজরুল ইসলাম।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সুনামগঞ্জের অধীন ‘সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের মেরামত ও সংস্কার’ প্রকল্পের আওতায় ই-টেন্ডারের মাধ্যমে ই-জিপি প্রক্রিয়ায় কাজটি পায় ‘মেসার্স স্মার্ট এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে বিদ্যালয় ভবনের ফ্লোরে পেটেন্ট স্টোন, আরসিসি ঢালাই, রঙ করা ও বারান্দায় গ্রিল স্থাপনসহ বিভিন্ন সংস্কার কাজের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত নিয়ম মেনে কাজের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকেলে সরেজমিনে ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে ভেতরের ১০ ফুট চওড়া রাস্তায় সিডিউল অনুযায়ী ৫ ইঞ্চি আরসিসি ঢালাই দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে রড না দিয়েই মাত্র ২ থেকে আড়াই ইঞ্চি ঢালাই দেওয়া হচ্ছিল। একই সাথে জমা রাখা নষ্ট হয়ে যাওয়া জমাটবদ্ধ সিমেন্ট, মাত্রাতিরিক্ত বালু এবং কংক্রিট ছাড়া নামমাত্র উপাদানে নিম্নমানের কাজ চালায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বিষয়টি নজরে আসলে স্থানীয়রা প্রতিবাদ জানালেও কোনো পাত্তা দেয়নি তারা। পরবর্তীতে উত্তেজিত জনতার চাপের মুখে কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা স্বরুপ সরকার, মুহিবুর রহমান ও ফারুক মিয়া ও মঈন উদ্দিন বলেন, বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও শুভঙ্করের ফাঁকি দিয়ে অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ চালানো হয়েছে। ঠিকাদার ও প্রকৌশলীর যোগসাজশেই এই অনিয়মের মহোৎসব ঘটেছে। কোনো অবস্থাতেই এই অনিয়ম মেনে নেওয়া হবে না। অবিলম্বে এই নিম্নমানের ঢালাই পুরো ভেঙে সিডিউল মেনে নতুন করে কাজ করার দাবি জানান তারা। একই সাথে ঘটনার পেছনে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক বরখাস্তসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি তোলা হয়।
ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জগন্নাথপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার হাসান সুনু বলেন, ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠের উন্নয়নকাজে কোনো ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে এবং শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় সিডিউল অনুযায়ী স্বচ্ছ ও গুণগত মানসম্পন্ন কাজ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় স্থানীয় সাংবাদিক ও সচেতন সমাজ কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হবে।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সৈয়দ নুর জানান, মঙ্গলবার সকালে তিনি বিদ্যালয়ে আসার আগেই তড়িঘড়ি করে ঢালাইয়ের কাজ শুরু করা হয়। এসে দেখতে পান নকশা অনুযায়ী ৫ ইঞ্চি উচ্চতা নেই এবং ঢালাইয়ে গুণগত মানও মানা হয়নি। এমনকি বস্তায় জমাট বাঁধা নষ্ট সিমেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছিল। তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কাজ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের দাবির সাথে একমত পোষণ করে তিনি জানান, অনিয়ম হওয়া অংশ সম্পূর্ণ ভেঙে নতুন করে ৫ ইঞ্চি ঢালাই নিশ্চিত না করা পর্যন্ত কাজ শুরু করতে দেওয়া হবে না।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ শিক্ষা ও প্রকৌশল বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী সৈয়দ তারেক জহিরুল হক জানান, শিডিউল অনুযায়ী অবশ্যই ৫ ইঞ্চি ঢালাই হতে হবে। অনিয়ম ও গাফিলতির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কাজের গুণগত মান নিশ্চিতে কঠোর নজরদারি থাকবে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।