
আব্দুল মান্নান, শার্শা (যশোর) থেকে ॥ যে ঘরে নতুন প্রাণের আগমনে আনন্দধ্বনি ওঠার কথা, সেই ঘরেই নেমে এসেছে শোকের মাতম। যে বাবা সন্তানের মুখ দেখে বুকে জড়িয়ে ধরার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই বাবাই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। বাবার মৃত্যুর মাত্র ১৫ মিনিট আগে পৃথিবীর আলো দেখল তাঁর সন্তান। জন্মের আনন্দ আর মৃত্যুর শোক সময়ের ব্যবধানে মাত্র ১৫ মিনিটের এই নির্মম পরিহাসে স্তব্ধ হয়ে গেছে একটি পরিবার। মর্মান্তিক এ ঘটনাটি ঘটেছে যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশি ইউনিয়নের কন্যাদাহ গ্রামে। নিহত হাবিবুর রহমান (২৫) ওই গ্রামের হযরত আলীর ছেলে। তাঁর স্ত্রী মিম খাতুন (১৭) পার্শ্ববর্তী সেতাই গ্রামের ফারুক হোসেনের মেয়ে। হাবিবুর বেনাপোল বন্দরে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তীব্র জ্বর ও শারীরিক জটিলতা নিয়ে হাবিবুর বাগআঁচড়ার একটি স্থানীয় ক্লিনিকে ভর্তি হন। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হলে রাজধানীর মগবাজারের রাজমনু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত রোববার সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! ঠিক সেই সময় স্বামীর সুস্থ হয়ে ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকা অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মিমও প্রসববেদনায় কাতর হয়ে ভর্তি ছিলেন বাগআঁচড়া নার্সিং হোম ক্লিনিকে। সেখানে তিনি জন্ম দেন এক পুত্র সন্তানের। স্বামীর মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর মাত্র ১৫ মিনিট আগে পৃথিবীতে আসে শিশুটি। একদিকে মায়ের কোলে নবজাতকের প্রথম কান্না, অন্যদিকে স্বজনদের চোখে প্রিয় মানুষকে হারানোর অশ্র“। যে সন্তানের জন্মসংবাদ শুনে বাবার মুখে হাসি ফোটার কথা, সেই সন্তান জন্মের মুহূর্তেই হারাল বাবার স্নেহের ছায়া। বাবার বুকের উষ্ণতা কিংবা আঙুল ধরে হাঁটার স্মৃতিÑকোনোটিই আর পাওয়া হবে না তার। প্রসূতি মিমের শারীরিক অবস্থা ও মানসিক আঘাতের কথা বিবেচনা করে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে স্বামীর মৃত্যুসংবাদ জানানো হয়নি। পরে সন্তানের জন্মের খবর ছড়িয়ে পড়লে হাবিবুরের বাবা হযরত আলীসহ স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। পরিবারটির এই শোকের ভার যেন ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ছেলেকে হারিয়ে বুকভাঙা কষ্টে হাবিবুরের বাবা হযরত আলী বলেন, “আমার বুকজুড়ে আজ শুধু শূন্যতা। একদিকে আমার আদরের ছেলেটা চলে গেল না ফেরার দেশে, অন্যদিকে আমার ঘরে এল নতুন প্রাণ। কোনটাকে কীভাবে মেনে নেব, বুঝতে পারছি না। আমার এতিম নাতিটার দিকে তাকালেই বুক ফেটে কান্না আসে।” একটি পরিবারের কাছে এর চেয়ে নির্মম বাস্তবতা আর কী হতে পারে! যে শিশুর জন্ম ঘিরে থাকার কথা ছিল বাবার উচ্ছ্বাস, পরিবারের হাসি আর আত্মীয় স্বজনের আনন্দ, সেই শিশুকে ঘিরেই এখন সবার চোখে জল। আর যে মা সন্তানের জন্মের পর স্বামীর পাশে থাকার কথা ভেবেছিলেন, তাঁকে এখন সামলাতে হবে স্বামী হারানোর শোক আর নবজাতককে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। হাবিবুরের মৃত্যুর খবর ও নবজাতকের জন্মের এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় মানুষের মধ্যেও শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজন ও এলাকাবাসী শোকাহত পরিবারটির প্রতি সমবেদনা জানান এবং নবজাতকটির সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য দোয়া করেন। পর দিন সকাল জানাজা শেষে হাবিবুর রহমানকে স্থানীয় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।