
আমার একমাত্র ছেলে ফোন করে বলল, “মা, তুমি আর আমাদের বাসায় এসো না। রূপা ঠিকমতো নিজের মতো থাকতে পারে না। তোমার আসা-যাওয়া ওকে অস্বস্তিতে ফেলে।”
আমি খুব শান্ত গলায় শুধু বলেছিলাম,
“ঠিক আছে বাবা, আর কোনোদিন যাব না।”
ফোনটা কেটে যাওয়ার পর এক মুহূর্তও দেরি করিনি।
মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ খুলে তিন বছর ধরে চালু থাকা সেই অটো পেমেন্টটা বন্ধ করে দিলাম।
প্রতি মাসে ৯,৫০০ টাকা।
ছেলের ফ্ল্যাটের কিস্তি।
যেটা আমি নিজের পেনশনের টাকা বাঁচিয়ে, নিজের প্রয়োজন কমিয়ে, কারও অজান্তে দিয়ে আসছিলাম।
মোবাইলের স্ক্রিন নিভে গেল।
আর আমার ভেতরেও যেন একটা অধ্যায়ের শেষ হয়ে গেল।
সেদিন বিকেলে পুরোনো ঢাকার আমার ছোট্ট ফ্ল্যাটটা অস্বাভাবিক শান্ত ছিল।
জানালার পাশে বসে আমি উলের সুতো দিয়ে একটা ছোট্ট মোজা বুনছিলাম।
আসন্ন নাতি কিংবা নাতনির জন্য।
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
“বাবা রাফি।”
মুখে অজান্তেই হাসি ফুটেছিল।
কিন্তু ফোন ধরার পর সেই হাসি বেশিক্ষণ টিকল না।
ওপাশ থেকে ছেলের কণ্ঠ ভেসে এলো।
গলায় এক ধরনের অস্থিরতা।
মনে হলো কোথাও বাইরে বসে আছে।
পেছনে মানুষের কথাবার্তার শব্দও শোনা যাচ্ছিল।
“মা, একটা কথা ছিল।”
“বল বাবা।”
“আগামী শুক্রবার আর আসতে হবে না।”
আমি চুপ করে রইলাম।
সে আবার বলল,
“রূপার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ও কোনো গন্ধই সহ্য করতে পারে না এখন। তুমি যে গ্রামের মুরগি, হাঁস, এসব রান্না করে নিয়ে আসো… ওর খুব সমস্যা হয়।”
আমি কিছু বললাম না।
রাফি একটু থেমে আবার বলল,
“আর একটা কথা… তুমি কিছু মনে কোরো না। তোমার আসা-যাওয়া একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে। রূপা ঠিকমতো নিজের মতো থাকতে পারে না। নতুন সংসার, নতুন পরিবেশ… বুঝতেই তো পারো।”
আমার হাতের সূঁচটা থেমে গেল।
উলের সুতো আঙুলে জড়িয়ে রইল।
এই ছেলেটাকে মানুষ করতে গিয়ে কত রাত না খেয়ে কেটেছে…
কত ঈদে নিজের জন্য নতুন কাপড় না কিনে ওর জন্য কিনেছি…
কত স্বপ্ন জমা করেছি ওর ভবিষ্যতের জন্য…
আজ সেই ছেলেই আমাকে নিজের ঘরে অস্বস্তির কারণ বলে পরিচয় করিয়ে দিল।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বুকটা তখনও ভাঙেনি।
বরং সবকিছু হঠাৎ খুব পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল।
আমি ধীর স্বরে বললাম,
“ঠিক আছে বাবা।”
“আমি আর আসব না।”
“তোদের কোনো অসুবিধা হবে না।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
মনে হলো রাফি এমন উত্তর আশা করেনি।
হয়তো ভেবেছিল আমি কাঁদব।
অভিমান করব।
অনুরোধ করব।
কিন্তু কিছুই করলাম না।
শুধু মেনে নিলাম।
শেষ পর্যন্ত সে বলল,
“আচ্ছা মা, রাখি।”
ফোন কেটে গেল।
আমি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলাম।
পুরো ঘরটা নিস্তব্ধ।
দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক শব্দ পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
ধীরে ধীরে উঠে নিজের ঘরে গেলাম।
আলমারির নিচের ড্রয়ার খুললাম।
ভেতর থেকে একটা পুরোনো ফাইল বের করলাম।
ফাইলটার মলাটে আমার স্বামী মরহুম আবদুল করিমের হাতের লেখা।
বহু বছর আগের লেখা।
তবু অক্ষরগুলো এখনও স্পষ্ট।
আমি আঙুল বুলিয়ে ফিসফিস করে বললাম,
“দেখছো করিম?”
“আমরা যে সন্তানকে মানুষ করতে জীবন কাটিয়ে দিলাম, সে আজ মানুষ হলো ঠিকই… কিন্তু মানুষত্বটা কোথায় হারিয়ে ফেলল?”
চোখে পানি এল না।
কাঁদতেও ইচ্ছে করল না।
কিছু কষ্ট আছে, যা চোখের জল হয়ে বের হয় না।
শুধু বুকের গভীরে জমাট বেঁধে থাকে।
ঘরে ফিরে এসে কোণায় রাখা কয়েকটা জিনিসের দিকে তাকালাম।
নাতির জন্য কিনে রাখা খেলনা।
একটা ছোট্ট টেডি বিয়ার।
রঙিন ব্লক সেট।
আর আধা বোনা সেই হলুদ মোজাটা।
কয়েক দিন আগেও এগুলো দেখে আমার মন ভরে যেত।
আজ কেমন যেন অর্থহীন লাগছিল।
একটা বড় কালো ব্যাগ এনে সবকিছু গুছিয়ে ভরে ফেললাম।
কিছু ভাঙিনি।
কিছু নষ্টও করিনি।
শুধু সরিয়ে রাখলাম।
যেমন করে মানুষ নিজের ভেতরের কিছু আশা চুপচাপ সরিয়ে রাখে।
তারপর সোফায় এসে বসলাম।
মোবাইলটা হাতে নিলাম।
ব্যাংকের অ্যাপ খুললাম।
সেখানে প্রতি মাসের নির্দিষ্ট তারিখে একটা স্বয়ংক্রিয় লেনদেন সেট করা ছিল।
তিন বছর আগে রাফি আর রূপা ফ্ল্যাট কিনেছিল।
কিস্তির টাকাটা সামলাতে কষ্ট হচ্ছিল।
তখন আমি নিজেই বলেছিলাম,
“তোরা চিন্তা করিস না। যতদিন পারি, আমি আছি।”
সেই থেকেই প্রতি মাসে ৯,৫০০ টাকা কেটে যেত।
কেউ জানত না।
এমনকি রূপাও না।
হয়তো রাফিও ভুলে গিয়েছিল।
মানুষ যখন অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন অনেক ত্যাগই তার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়।
স্ক্রিনে লাল অক্ষরে লেখা ছিল—
“স্থায়ী পেমেন্ট বাতিল করুন।”
আমি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
তারপর চাপ দিলাম।
একটা সতর্কবার্তা এলো।
“আপনি কি নিশ্চিত?”
আমি আবার চাপ দিলাম।
“হ্যাঁ।”
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লেনদেন বাতিল হয়ে গেল।
কোনো ঝড় হলো না।
কোনো শব্দ হলো না।
শুধু একটা দায়িত্ব শেষ হয়ে গেল।
এরপর রান্নাঘরে গেলাম।
চুলার ওপর তখন গরম গরম গরুর মাংসের ঝোল বসানো।
রাফিদের জন্য রান্না করেছিলাম।
ভাবছিলাম শুক্রবার নিয়ে যাব।
ঢাকনা খুলতেই ভাপ উঠে এল।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
তারপর ধীরে ধীরে পুরোটা সিঙ্কে ঢেলে দিলাম।
মাংস।
ঝোল।
সব।
কিছুই রেখে দিলাম না।
ঠিক সেই সময়—
শহরের এক অভিজাত রেস্টুরেন্টে বসে ছিল রাফি আর রূপা।
রূপার মুখে তৃপ্তির হাসি।
সে বলছিল,
“তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। অবশেষে ব্যাপারটা বললে।”
“আমি কাউকে অপছন্দ করি না, কিন্তু সবকিছুর একটা সীমা থাকে।”
রাফি আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে হেসে বলল,
“আর কোনো চিন্তা নেই। সব ঠিক করে ফেলেছি।”
ওয়েটার বিল নিয়ে এলো।
বিলের পরিমাণ দেখে রাফি স্বাভাবিকভাবেই নিজের কার্ড বের করল।
বহুদিন ধরেই সে হিসাব না করেই খরচ করতে শিখে গেছে।
কারণ বড় একটা দায়ভার যে অদৃশ্যভাবে অন্য কেউ বহন করছিল।
ওয়েটার কার্ডটা মেশিনে দিল।
কিছুক্ষণ পর মাথা তুলে বলল,
“স্যার, ট্রানজ্যাকশনটা হয়নি।”
রাফি ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আবার চেষ্টা করুন।”
দ্বিতীয়বারও একই ফল।
ঠিক তখনই তার ফোনে একের পর এক মেসেজ ঢুকতে শুরু করল।
ব্যাংকের নোটিফিকেশন।
রাফি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
মুখের রং ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
আর সে তখনও জানত না—
যে ঝড়টা তার জীবনে ঢুকতে যাচ্ছে, সেটার শুরু মাত্র হয়েছে।
চলবে…
নীল_জোয়ার
[লেখক গল্প_ঘর ]
পর্ব–১