
মোঃ বুলবুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিঃ কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলা প্রশাসনে উপপ্রশাসনিক কর্মকর্তা মোছা. জেসি চৌধুরীকে ঘিরে উঠেছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে সরকারি বিভিন্ন সুবিধা ও ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ কারণে স্থানীয়দের একটি অংশ তাকে ‘অঘোষিত ইউএনও’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
অভিযোগের পরিধি শুধু নিজের নিকটাত্মীয়দের ডিলারশিপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রশাসনিক দায়িত্বের সুবাদে তার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে সার ডিলারশিপের আবেদনকারীদের অনেকের সঙ্গে আগাম আর্থিক লেনদেনের সমঝোতা করে ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে।
চলমান সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরেই এসব অভিযোগ এখন নতুন করে সামনে এসেছে।
জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, উলিপুরসহ বিভিন্ন উপজেলায় ৪২টি শূন্য ডিলার ইউনিটে সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, একই পরিবারের একজনের ডিলারশিপ থাকলে পরিবারের অন্য কেউ আবেদন করতে পারবেন না। সরকারি কর্মচারী ও জনপ্রতিনিধিদেরও ডিলার হওয়ার সুযোগ নেই।
নাগেশ্বরী উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর উপজেলায় সার ডিলারশিপের জন্য ৮৬টি আবেদন জমা পড়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে ইউনিয়নভিত্তিক ডিলার নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
হাসনাবাদ ইউনিয়নে সার ডিলারশিপের জন্য ১৪টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘আব্দুল্লাহ ট্রেডার্স’, যার স্বত্বাধিকারী হিসেবে জেসি চৌধুরীর শাশুড়ি লুৎফা বেগমের নাম রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার নিকটাত্মীয় একই উপজেলার সরকারি সার ডিলারশিপের জন্য আবেদন করায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে-আবেদন যাচাই-বাছাই ও সুপারিশের প্রক্রিয়ায় জেসি চৌধুরীর কোনো ধরনের প্রভাব থাকবে কি না।
অন্যদিকে জেসি চৌধুরীর ভাসুর মাইদুল ইসলামের নামে এর আগে ওএমএস ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অর্থাৎ একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে সরকারি খাদ্য ও কৃষি-সংশ্লিষ্ট ডিলারশিপের বিষয়টি সামনে আসায় স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
জেসি চৌধুরী নিজেই ভাসুরের নামে ওএমএস ডিলারশিপ এবং শাশুড়ির নামে সার ডিলারশিপের আবেদনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, “আমার শ্বাশুড়ি সারের ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেছেন। যদি কোনো অভিযোগ থাকে তাহলে সেটি ইউএনও স্যার তদন্ত করে বাতিল করবেন। এতে আমার আপত্তি নেই।”
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, উপজেলা প্রশাসনের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় উপজেলার প্রায় সব ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধির সঙ্গে জেসি চৌধুরীর নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ থাকায় সার ডিলারশিপের আবেদনকারীদের ওপরও তিনি প্রভাব বিস্তার করতে পারেন—এমন অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় একাধিক অভিযোগকারীর দাবি, কয়েকজন আবেদনকারীর সঙ্গে আগাম অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, কার আবেদন কোন পর্যায়ে আছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে এবং কীভাবে ডিলারশিপ নিশ্চিত করা যাবে-এসব বিষয়ে জেসি চৌধুরীর মাধ্যমে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে।
এ অভিযোগের কারণে চলমান ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় উপজেলা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
শুধু সার ডিলারশিপ নয়, রায়গঞ্জ এলাকায় মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে টিসিবির ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে জেসি চৌধুরীর বিরুদ্ধে।
স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতাকে টিসিবির ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার বিষয়ে এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি সুবিধা ও সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তার প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
হাসনাবাদ ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব আলহাজ্ব বেলাল হোসেন বলেন, “জেসি চৌধুরী আওয়ামী পরিবারের সন্তান। ইউএনওর প্রশাসনিক কর্মকর্তার পরিচয়ে আপন ভাসুরকে ওএমএস ডিলার নিয়োগ করেছেন। মসজিদভিত্তিক ইমাম-মুয়াজ্জিন নিজের স্বামীর বাড়ির জামে মসজিদে টাকার বিনিময়ে নিজের পছন্দের লোক নিয়োগ করেছেন। এখন প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন-এবার নিজের শাশুড়ির নামে সারের ডিলারশিপ তিনি কনফার্ম করবেন। তিনি এখন নাগেশ্বরীর অঘোষিত ইউএনও।”
এদিকে, নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আব্দুর রশিদের বিরুদ্ধেও সার ডিলারশিপ নেওয়ার জন্য প্রশাসনিক পর্যায়ে তদবির চালানোর অভিযোগ করেছেন হাসনাবাদ ইউনিয়ন বিএনপির একাধিক নেতা।
তাদের অভিযোগ, সরকারি চাকরিতে থাকা আব্দুর রশিদ নিজের নামে ডিলারশিপ নিতে না পেরে তার বড় ভাই আঃ আজাদ আলীর নামে ‘মেসার্স কামাল ট্রেডার্স’ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সার ডিলারশিপ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এ জন্য তিনি নাগেশ্বরী ইউএনও কার্যালয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ ও তদবির চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
জেসি চৌধুরীকে ঘিরে ডিলার নিয়োগের অভিযোগের মধ্যেই নাগেশ্বরীতে সার বিতরণ পরিস্থিতি নিয়ে একাধিকবার উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ১৪ সেপ্টেম্বর বেরুবাড়ী, বামনডাঙ্গা ও রামখানা ইউনিয়নে সার না পাওয়ার অভিযোগে কৃষকেরা সড়ক অবরোধ করেন। পরে ১৮ সেপ্টেম্বর বল্লভেরখাস ইউনিয়নের গাবতলা বাজারেও সারের দাবিতে কয়েকশ কৃষক সড়ক অবরোধ করেন এবং এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন।
১৮ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় ইউএনও মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। ওই সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দাবি করেন, উপজেলায় পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে।
নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, “সারের ডিলারশিপের বিষয়টি আমি পুরোপুরি অবগত নই। জেসি চৌধুরীর নিকটাত্মীয় আবেদন করতেই পারে। যোগ্যতা যার আছে, সে চূড়ান্ত হবে। কে কার আত্মীয়-এটা মুখ্য বিষয় নয়।”
তবে চলমান সার ডিলার নিয়োগে আত্মীয়তার সম্পর্ক, প্রশাসনিক প্রভাব এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগগুলো সামনে আসায় নিয়োগ প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়-সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।
কারণ, সরকারি নীতিমালায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের ডিলারশিপের বিষয়ে স্পষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে জেসি চৌধুরীর শাশুড়ির আবেদন, তার ভাসুরের পূর্বের ওএমএস ডিলারশিপ এবং বিভিন্ন আবেদনকারীর সঙ্গে কথিত আর্থিক সমঝোতার অভিযোগ-সবকিছু মিলিয়ে সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নটি সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি একই অফিসে দীর্ঘদিন চাকুরির সুবাদে এসব কর্মকর্তা সবমহলে প্রভাব বিস্তার করে উপজেলাবাসীকে একপ্রকার জিম্মি করে রেখেছেন। তাই অবিলম্বে এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে আসল রহস্য। দোষী সাব্যস্তের পর দোষীদের বদলীসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ে উপজেলার মানুষের সময়ের দাবি।