
মাকসুদুল হক, ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি: ইস্তাম্বুল ও আবুধাবি হয়ে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটারের দীর্ঘ আকাশপথ। এরপর সড়কপথের ক্লান্তি। সব মিলিয়ে দীর্ঘ ২৪ ঘণ্টার একটানা জার্নি। কিন্তু দাদার বাড়ির আঙিনায় পা রাখতেই সব ক্লান্তি যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল! ইউরোপের বিলাসী জীবন আর নাগরিক সুবিধা পেছনে ফেলে নাড়ির টানে ঝিনাইদহের হরিনাকুণ্ডু উপজেলায় দাদার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে জন্মসূত্রে পর্তুগিজ নাগরিক ছোট্ট মারিয়া। তার এই আগমনকে কেন্দ্র করে এখন পুরো গ্রামজুড়ে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
মারিয়া পর্তুগাল প্রবাসী বাবুল হোসেন ও মরিয়ম দম্পতির কোল আলো করে আসা ফুটফুটে কন্যাসন্তান। ২০২৩ সালের ১৭ জুন তারিখে পর্তুগালে জন্ম নেওয়া মারিয়া জন্মসূত্রেই সেই দেশের নাগরিক। তবে নাগরিকত্ব কিংবা ভাষা কোনো কিছুই তাকে নাড়ির টান থেকে দূরে রাখতে পারেনি। বর্তমানে তিন বছর বয়সী শিশু মারিয়া একসঙ্গে তিনটি ভাষায় ভাঙা ভাঙা শব্দে কথা বলতে শুরু করেছে। স্কুলে পর্তুগিজ ভাষা, পারিবারিক পরিমণ্ডলে মাতৃভাষা বাংলা এবং বাবা-মায়ের কাছে শেখা ইংরেজি—সব মিলিয়ে এক কৌতূহলোদ্দীপক ভাষার মিশ্রণ ও মিষ্টি কথার জাদুতে সে এখন মাতিয়ে রাখছে চারপাশ। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দাদার বাড়িতে এসে ছোট্ট মারিয়া এখন ভীষণ হাসিখুশি ও আনন্দে মেতে উঠেছে।
এই প্রবাসী দম্পতির জীবনের গল্পটিও বেশ অনুপ্রেরণার। মারিয়ার বাবা বাবুল হোসেনের পৈত্রিক নিবাস ঝিনাইদহের হরিনাকুণ্ডু উপজেলায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে সফলতার সাথে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর ২০০৯ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ পেয়ে পাড়ি জমান জার্মানিতে। সেখানে পড়াশোনা শেষ করে তিনি ইউরোপের অপর দেশ পর্তুগালে গমন করেন এবং মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে পর্তুগালে গুগলের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানে মর্যাদাপূর্ণ চাকুরিতে যোগদান করেন।
প্রবাস জীবনের মাঝেই ২০১৬ সালে তিনি দেশে ফিরে দিনাজপুর জেলার মেয়ে মরিয়ম বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পরবর্তীতে ২০২০ সালে পর্তুগালের স্থায়ী নাগরিকত্ব লাভ করার পর তিনি স্ত্রী মরিয়মকে নিজের কর্মস্থল পর্তুগালে নিয়ে যান।
বিদেশের মাটিতে সব ধরনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও নাগরিক সুবিধা থাকার পরেও, দেশের প্রতি গভীর টান থেকে এই সফল দম্পতি সুযোগ পেয়ে ছুটে আসেন জন্মভূমিতে। পর্তুগাল প্রবাসী বাবুল হোসেন তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, “বিদেশের মাটিতে যত সুযোগ-সুবিধাই থাকুক না কেন, নাড়ির টান ও দেশের মাটির চেয়ে আপন কিছু হতে পারে না। দীর্ঘদিন পর পরিবার ও এলাকার মানুষের সাথে দেখা হয়ে অন্যরকম এক ভালো লাগা কাজ করছে। আর মারিয়াও এখানে এসে খুব দ্রুত সবার সাথে মিশে গেছে।”
ইউরোপের নাগরিকত্ব পাওয়া ছোট্ট মারিয়া ও এই প্রবাসী দম্পতিকে কাছে পেয়ে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মাঝে আনন্দের হাওয়া বইছে। গ্রামের মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে আসছেন পর্তুগিজ মারিয়ার মিষ্টি মুখের আধো-আধো বাংলা কথা শুনতে এবং তাকে একনজর দেখতে।