
নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর: লালমনিরহাট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের ওয়ারলেস অপারেটর আবুল কালাম আজাদকে ঘিরে আবারও আলোচনার ঝড় উঠেছে। টানা প্রায় ১৭ বছর একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন, ওয়ারলেস অপারেটর হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন একাধিক পদের দখল দাড়িত্ব, বদলির মাত্র এক বছরের মাথায় পুনরায় লালমনিরহাটে ফিরে আসা এবং প্রভাব খাটিয়ে বদলি করানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি দীর্ঘদিন লালমনিরহাট জেলা ত্রাণ কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। ওয়ারলেস অপারেটর পদে থাকলেও জনবল সংকটের কারণে উচ্চমান সহকারী ও অফিস সহকারীর পদ দখল দাড়িত্ব করেন। এতে কার্যত দীর্ঘ সময় তিনটি পদের কাজ তার হাতেই কেন্দ্রীভূত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগে তিনি অফিসে প্রভাবশালী অবস্থান গড়ে তোলেন। প্রশাসনিক কার্যক্রম, নথি ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন দাপ্তরিক সিদ্ধান্তে তার প্রভাব ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ৫ আগস্টের ফ্যাসিস্ট সরকারের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ে বদলি করা হয়। সেখানে প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালনের পর চলতি মাসে লালমনিরহাটে আবার ফিরে আসেন।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, আবুল কালাম আজাদ বিভিন্ন মহলে নিজেকে বর্তমান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে থাকেন এবং মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে পুনরায় লালমনিরহাটে বদলি হয়েছেন বলে প্রচার করেন। তবে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রীর দপ্তরের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। দাবি করা হচ্ছে, তার নিজ এলাকা কুড়িগ্রামের রৌমারী, শ্বশুরবাড়ি চিলমারীসহ বিভিন্ন স্থানে নিজের ও স্বজনদের নামে-বেনামে সম্পদ রয়েছে। এছাড়া লালমনিরহাট শহরেও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রায় ১০ শতাংশ জমি ক্রয়ের অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, অতীতেও জেলা ত্রাণ কার্যালয়ের এক কর্মচারী ড্রাইভার রাজিকুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ দাখিল করেছিলেন। তবে সেই অভিযোগের তদন্ত বা নিষ্পত্তি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে,সেই সময়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে উঠা বসা ছিল এই আবুল কালাম আজাদের।
এ বিষয়ে আবুল কালাম আজাদের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছিলাম। সেই আবেদনের ভিত্তিতেই আমাকে পুনরায় লালমনিরহাটে বদলি করা হয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ে আমি এক বছর কর্মরত ছিলাম।”
মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে বদলি করানোর অভিযোগ সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি। আর লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন স্থানে নিজের বা স্বজনদের নামে সম্পত্তি থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অফিসে এসে দেখা করেন, তখন কথা হবে।”
এদিকে স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন ওয়ারলেস অপারেটর কীভাবে টানা ১৭ বছর একই কর্মস্থলে থাকেন? আবার বদলির মাত্র এক বছরের মধ্যেই কীভাবে একই জেলায় ফিরে আসেন? এর পেছনে প্রশাসনিক প্রয়োজন ছিল, নাকি অন্য কোনো প্রভাব বা বিশেষ সুপারিশ কাজ করেছে—এ নিয়ে জনমনে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, সরকারি চাকরিতে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে অবস্থান, দ্রুত পুনর্বদলি, ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার এবং সম্পদ নিয়ে ওঠা অভিযোগ—সবকিছুই নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। অভিযোগ সত্য হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রশাসনিক মহলের দরকার বলে মনে করেন।
এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে কয়েকটি প্রশ্ন
– একজন কর্মচারী কীভাবে টানা ১৭ বছর একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করলেন?
– বদলির মাত্র এক বছরের মধ্যে কী প্রক্রিয়ায় তিনি আবার লালমনিরহাটে ফিরলেন?
– বদলির ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ সুপারিশ বা প্রভাব ছিল কি?
– মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের সত্যতা কী?
– তার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি?
– অতীতে দাখিল হওয়া অভিযোগগুলোর তদন্ত বা নিষ্পত্তি কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে?