👁 273 Views

আমার বয়স ৫৩ বছর। আমি যাকে বিয়ে করেছি তার নাম পারুল। বয়স ৪০ এর বেশি হবে না।।

 

ছেলের বউ ভাত না দেওয়ার কারণে আজকে বিয়ে করে ঘরে বউ নিয়ে আসলাম। আজকে থেকে আলাদা খাবো আমরা। আর ছেলে আর ছেলের বউ আলাদা খাবে। আমি বউ নিয়ে ঘরে ঢোকার সময় ছেলের বউ শিমু যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। যার সবসময় মুখ চলে, সে এখন একদম চুপ হয়ে গেছে। ছেলে এখনো অফিসে, হয়তো একটু পরেই শিমুর ফোন পেয়ে চলে আসবে। আজকে আমিও সবকিছুর জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।

আমার বয়স ৫৩ বছর। আমি যাকে বিয়ে করেছি তার নাম পারুল। বয়স ৪০ এর বেশি হবে না। আমার প্রথম স্ত্রী হৃ*দরোগে মা**রা গেছে ৯ বছর আগে। আমার স্ত্রী মা**রা যাওয়ার কয়েক মাস আগেই আমি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়েছিলাম।

স্ত্রী মা**রা যাওয়ার পর সবাই আমাকে আবার বিয়ে করতে বলেছিল। কিন্তু আমি আর বিয়ে করিনি। তখন আমার ছেলে শাহেদ অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে। মনে মনে ভেবে নিয়েছিলাম, আমি আর বিয়ে করবো না। ছেলের অনার্সটা শেষ হওয়ার পর ছেলেকেই বিয়ে করাবো। তারপর বাকি জীবনটা নিজের মতো করে কাটিয়ে দেবো।
আমি সেই হিসেবেই ছেলেকে বড় করেছি। নিজের হাতে রান্না করে ছেলেকে খাওয়াতাম। সকালে উঠে নাস্তা বানাতাম, দুপুরে রান্না করতাম, আবার রাতে ছেলে বাসায় ফিরলে তার জন্য খাবার গরম করে রাখতাম। ছেলের পড়াশোনার কোনো কষ্ট যেন না হয়, সেদিকেই আমার সবসময় খেয়াল থাকতো।

অনার্স শেষ করার পর নিজের পেনশনের কিছু টাকা দিয়ে শাহেদের জন্য একটা চাকরি নিয়ে দিলাম। আমি চেয়েছিলাম ছেলে নিজের পায়ে দাঁড়াক। চাকরি পাওয়ার এক মাস পরেই শাহেদ আমাকে এসে বললো, সে তার পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করতে চায়। শিমুর সঙ্গে নাকি অনার্সে পড়ার সময় থেকেই তার প্রেম।
আমি ছেলের পছন্দের বিরুদ্ধে যাইনি। কারণ আমি চেয়েছিলাম ছেলে সুখে থাকুক। তাই শিমুর সঙ্গে শাহেদের বিয়ে দিয়ে দিলাম।
কিন্তু বিয়ের এক মাস পর থেকেই আমার ছেলে আর ছেলের বউয়ের ব্যবহার পাল্টে যেতে লাগলো। আগে শাহেদ অফিস থেকে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করতো, বাবা খেয়েছো? বিয়ের পর সেই প্রশ্নটাও আর করতো না।

তারা আমাকে খেতে ডাকতো না। ডাইনিং টেবিলে তরকারির বাটি থাকতো, কিন্তু সেই বাটিতে আমার জন্য তরকারি থাকতো না। অনেক সময় ভাতও শেষ হয়ে যেত। আমি তখন নিজের জন্য আলাদা করে কিছু রান্না করে নিতাম। প্রথম দিকে কিছু বলিনি। ভেবেছিলাম, নতুন সংসার। সময় গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু একদিন শাহেদের সামনেই শিমু আমাকে বললো, “ওনাকে বসিয়ে বসিয়ে আমি খাওয়াতে পারবো না। সারাদিন শুধু শুয়ে বসে থাকে আর চায়ের দোকানে আড্ডা দেয়। ওনার মতো মানুষ রাস্তায় কাজ করে খাচ্ছে।”

শিমুর কথাটা শুনে আমি সেদিন কোনো উত্তর দিইনি। শুধু শাহেদের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম, যে ছেলেকে নিজের হাতে এতদিন মানুষ করলাম, আজ তার স্ত্রী আমাকে এভাবে কথা বলছে, আর আমার ছেলে পাশে দাঁড়িয়ে থেকেও কিছু বলছে না।
সেই রাতেই আমি মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিলাম। আমি কারো ওপর নির্ভর করে আর খাবো না। আমার যতদিন বেঁচে থাকার সামর্থ্য আছে, নিজের খাবার নিজেই জোগাড় করবো।
তারপর কয়েকদিন পর পারুলের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। পারুলের স্বামী কয়েক বছর আগে মা**রা গেছে। তারও সংসারে আপন বলতে তেমন কেউ নেই। এক মেয়ে ছিলো তারো বিয়ে হয়ে গেছে। বয়স আমার থেকে কিছুটা কম। অনেক কথা বলার পর আমি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিই। পারুল প্রথমে রাজি হচ্ছিল না। পরে আমার পরিস্থিতি সব শুনে সে বিয়েতে রাজি হয়ে যায়।
আজ সেই পারুলকে বিয়ে করে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসলাম।

বাড়ির দরজায় ঢোকার সময় শিমু আমাদের দেখে একদম চুপ হয়ে গেল।, সে কখনো ভাবেনি আমি সত্যিই আবার বিয়ে করবো। তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছিলাম, সে ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড রে*গে গেছে।
আমি পারুলকে নিয়ে সরাসরি নিজের রুমে চলে গেলাম। কিছুক্ষণ পর বাইরে থেকে শিমুর ফোনে কথা বলার শব্দ শুনতে পেলাম। বুঝতে পারলাম, সে শাহেদকে ফোন করেছে।

এক ঘণ্টার মধ্যে শাহেদ বাড়িতে এসেই চিৎকার করে আমাকে ডাকতে লাগলো, “বাবা! বাবা!”
আমি রুম থেকে বের হয়ে বললাম, “এভাবে চিৎকার করছিস কেন?”
শাহেদ রা*গে কাঁপতে কাঁপতে বললো, “আমি এগুলো কী শুনছি? তুমি বুড়ো বয়সে এই কাজ করলে? আমার দিকটা একটু ভাবলে না?”
আমি শান্তভাবে বললাম, “যা শুনেছিস সব সত্যি। তোর চিন্তা করলে আমার না খেয়ে ম*রতে হবে। তোর চিন্তা তুই কর, আমার চিন্তা আমি করি।”

শাহেদ আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। মনে হলো, সে কখনো ভাবেনি আমি তার সঙ্গে এভাবে কথা বলবো।
আমি আবার বললাম, “আর শুন, এই বাড়িতে রান্নাঘর যেহেতু একটাই, তার জন্য তোর বউকে বলে দিস সকাল আটটার আগেই রান্না সেরে ফেলবে। আটটার পর আমার স্ত্রী রান্নাঘরে যাবে। আজ থেকে আমরা আলাদা খাবো।”

শাহেদ বললো, “মানে তুমি আমাদের সঙ্গে আর খাবে না?”
আমি বললাম, “না। এতদিন তোদের সঙ্গে খেয়েছি। এখন থেকে আমি আর আমার স্ত্রী আলাদা রান্না করে খাবো।”
তারপর আমি বললাম, “আর নতুন একটা ফ্রিজ কিনে নিস। এটা আমাদের লাগবে।”

শাহেদ আমার কথা শুনে আরও অবাক হয়ে গেল। সে বললো, “মানে আমি এখন ফ্রিজ কিনবো কিভাবে? সবে মাত্র ১৮ তারিখ।”
আমি বললাম, “ঠিক আছে, তাহলে বেতন পেয়ে এই মাসেই কিনে নিস।”
শাহেদ আর কোনো কথা বলতে পারলো না। আমি তাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজের রুমে চলে আসলাম।

পারুল এতক্ষণ রুমের ভেতর থেকে আমাদের সব কথা শুনছিল। আমি রুমে ঢোকার পর পারুল আমাকে বললো, “ছেলের সঙ্গে এইভাবে কথা বলা ঠিক হয় নাই আপনার। ছেলে রা*গ করে যদি আমাদের সঙ্গে খারাপ কিছু করে?”
আমি পারুলের দিকে তাকিয়ে বললাম, “তুমিও আমার মতো কথা না বললে এই বাড়িতে টিকতে পারবে না। আমার ছেলের বউ অনেক পাজি মেয়ে। ওকে বেশি সুযোগ দিলে মাথায় উঠে বসবে।”

পারুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, “আপনি যা করেছেন, সেটা হয়তো আপনার কষ্ট থেকে করেছেন। কিন্তু আপনার ছেলে এটা সহজে মেনে নেবে না।”
আমি বললাম, “শাহেদ আমার ছেলে। ও আমার ওপর রা*গ করতে পারে, কিন্তু আমি অন্যায় কিছু করিনি। এত বছর আমি ওর জন্য করেছি। এখন নিজের জন্য একটু ভাবলে যদি আমার অপ*রাধ হয়, তাহলে সেই অপ*রাধ আমি মেনে নিলাম।”

পারুল আর কোনো কথা বললো না। আমিও চুপ করে বসে রইলাম।
হঠাৎ বাইরে থেকে শিমুর গলার শব্দ শুনতে পেলাম। সে কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। কথাগুলো পুরোপুরি পরিষ্কার না হলেও একটা কথা আমার কানে এলো।
“মা, তুমি কালকে না, আজকেই চলে আসো। আমি একা এটা সামলাতে পারবো না।”
আমি কথাটা শুনে পারুলের দিকে তাকালাম। পারুলও আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

শিমু শুধু শাহেদকে দিয়ে কিছু করাতে পারলো না দেখে সে তার মাকেও এই বাড়িতে নিয়ে আসবে?

চলবে…?

একঘরে দুইহাড়ি
পর্ব ০১
লেখক The Story Haven (শাহেদ খান)

প্রথম পর্ব কেমন লাগলো?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *