
এম সাজেদুল ইসলাম (সাগর) , নবাবগঞ্জ (দিনাজপুর) প্রতিনিধি : দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের শিক্ষা বিস্তার, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে এক অবিস্মরণীয় নাম মরহুম আফসার আলী বিএসসি। নিজের মেধা, শ্রম, সততা ও দূরদর্শী চিন্তায় তিনি এই অঞ্চলের উন্নয়নের যে মজবুত ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন, তা আজও এলাকার মানুষের কাছে বড় অনুপ্রেরণা হয়ে আছে। ২০১৪ সালের ১ নভেম্বর বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আজ তাঁর দ্বাদশ মৃত্যুবার্ষিকীতে নবাবগঞ্জবাসী গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে এই কৃতি সন্তানকে। মৃত্যুর এক যুগ পেরিয়ে গেলেও তাঁর অবদান ও কর্মময় জীবন আজও নবাবগঞ্জবাসীর স্মৃতিতে অম্লান।
১৯৩১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করা আফসার আলী বিএসসি ছিলেন অত্যন্ত প্রখর ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন মানুষ। ১৯৫৪ সালে তিনি নবাবগঞ্জ থানার প্রথম দিকের বিএসসি ডিগ্রিধারীদের একজন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে একটি সম্মানজনক সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেও, নিজ এলাকার অনগ্রসর মানুষের উন্নয়ন ও শিক্ষার আলো ছড়ানোর তাগিদে সেই চাকরি ছেড়ে নবাবগঞ্জে ফিরে আসেন। এরপর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজেকে নিয়োজিত করেন শিক্ষা, যোগাযোগ ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে।
নবাবগঞ্জের শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আজকের নবাবগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, এফতেদায়ি মাদ্রাসা ও নবাবগঞ্জ কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে তিনি সরাসরি ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পাশাপাশি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়, মহিলা কলেজ, নবাবগঞ্জ ডাকঘর, এসএসসি পরীক্ষাকেন্দ্র ও প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগেও তাঁর অসামান্য অবদান ছিল।
শিক্ষার পাশাপাশি নবাবগঞ্জের রাস্তাঘাট, যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণে তিনি আজীবন কাজ করেছেন। শুধু সমাজ সংস্কারই নয়, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধ, প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতামূলক কর্মকাণ্ডেও তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। এছাড়া, সাঁওতাল সম্প্রদায়ের শেষকৃত্যের জন্য জমি এবং মুসলমানদের ঈদগাহের জন্য জমি দান করে তিনি এলাকায় মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িকতার এক অনন্য ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
উপজেলা সদরের বাসিন্দা রেজাউল ইসলাম বলেন, “নবাবগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে আফসার আলী বিএসসির অবদান চিরস্মরণীয়। শিক্ষকদের সম্মান, শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়নে তাঁর আন্তরিকতা বর্তমান প্রজন্মের জন্য অনুসরণীয়।”
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুল হক বলেন, “আফসার আলী বিএসসি ছিলেন নবাবগঞ্জের উন্নয়নের জন্য নিবেদিতপ্রাণ এক মানুষ। নিজের ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে এলাকার মানুষের শিক্ষা ও কল্যাণকে তিনি সবসময় বেশি গুরুত্ব দিতেন। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর এই মহান অবদান তুলে ধরা অত্যন্ত প্রয়োজন।”
মরহুমের ছেলে ও সহকারী অধ্যাপক আল আলিমুল রাজি রাজিব বাবার স্মৃতি চারণ করে বলেন, “আমার বাবার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার মানসিকতা। তিনি নিজের এলাকার মানুষের উন্নয়ন ও শিক্ষার প্রসারকে জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছিলেন। তাঁর আদর্শ ও কর্মময় জীবন আমাদের পরিবারের জন্য চরম গর্বের। আমরাও বাবার দেখানো পথে মানুষের কল্যাণে কাজ করে যেতে চাই।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, নবাবগঞ্জের উন্নয়ন ও শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে আফসার আলী বিএসসির অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাঁর কর্মময় জীবন নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে এবং স্মৃতি সংরক্ষণে উপজেলা সদরে তাঁর নামে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ বিষয়ে তাঁরা উপজেলা প্রশাসনের সুদৃষ্টি ও সহযোগিতা কামনা করেছেন।
২০১৪ সালের ১ নভেম্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য প্রতিষ্ঠান, জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ ও মানুষের প্রতি নিখাদ ভালোবাসার মধ্য দিয়ে আজও নবাবগঞ্জবাসীর হৃদয়ে বেঁচে আছেন আফসার আলী বিএসসি। নবাবগঞ্জের উন্নয়ন ইতিহাসে তাঁর অবদান আগামী প্রজন্মের জন্য চিরকাল আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।