👁 161 Views

ঝিনাইদহে সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে সাংবাদিকের ওপর হামলা ও কনডেম সেলে প্রেরণ: সচেতন মহলে গুঞ্জন ও সাংবাদিক মহলে উদ্বেগ

ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি- শনিবার  ৩১ অক্টোবর : ঝিনাইদহে সরকারি কলেজের উন্নয়নকাজের অনিয়মের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন দুই সাংবাদিক। তবে ঘটনার এখানেই শেষ নয়; হামলার শিকার দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সাংবাদিক অরিত্র কুমার কুণ্ডু এবং তাঁর সহযোগী বাংলা-৭১-এর প্রতিনিধি হাবিবুর রহমানকে উল্টো মারধর ও চাঁদাবাজি মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় পুলিশের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, জেলা ডিবি পুলিশের মাদক সংশ্লিষ্টতার খবর প্রকাশ করায় পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাঁদের এই ফাঁদে ফেলা হয়েছে এবং কারাগারে পাঠানোর পর কনডেম সেলে রাখার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের সচেতন মহলে তীব্র গুঞ্জন এবং সাংবাদিক ও মানবাধিকার মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

কাজের অনিয়ম ও নেপথ্যের ঘটনা
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঝিনাইদহ সরকারি নুরুননাহার মহিলা কলেজে বাউন্ডারি ওয়াল (সীমানা প্রাচীর) এবং ড্রেন নির্মাণের সংস্কারকাজ চলছিল। এই সংস্কারকাজের শুরুতেই পুরোনো অবকাঠামো ভাঙার পর বেরিয়ে আসে বিপুল পরিমাণ সরকারি ইট ও রড। নিয়মানুযায়ী সরকারি কোনো স্থাপনা বা পুরোনো মালামাল অপসারণ বা বিক্রি করতে হলে নিলাম বা সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু এই কলেজে ড্রেন ও ওয়াল নির্মাণের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। কোনো রকম দরপত্র বা প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব ছাড়াই প্রায় ৩৮ হাজার টাকা সমমূল্যের পুরোনো সরকারি ইট ও রড রাতারাতি গায়েব করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

এই মালামালগুলো কোথায় সরানো হয়েছে, কারা এর সাথে জড়িত এবং এই অর্থ সরকারি তহবিলে জমা হয়েছে কি না—এমন সুনির্দিষ্ট অনিয়মের তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করতেই গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে কলেজ ক্যাম্পাসে যান অনুসন্ধানী সাংবাদিক অরিত্র কুমার কুণ্ডু এবং হাবিবুর রহমান।

কলেজে অবরুদ্ধ ও রড দিয়ে বেদম মারধর
অনিয়মের বিষয়ে তথ্য জানতে চাইলে কলেজের অধ্যক্ষ বিজন কুমার সরকারের সঙ্গে সাংবাদিকদের বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে উন্নয়নকাজের এই লুটপাট ও অনিয়ম ধামাচাপা দিতেই অধ্যক্ষের উপস্থিতিতে কলেজ কর্তৃপক্ষ ও বহিরাগত একটি চক্র চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে তাঁদের অবরুদ্ধ করে রড দিয়ে বেদম মারধর করে। পরে সাংবাদিকরা কলেজ থেকে চলে আসার চেষ্টা করলে দ্বিতীয় দফায় ডেকে নিয়ে তাঁদের আবার মারধর করা হয় বলে জানা গেছে।

সংবাদের জেরে প্রাণনাশের হুমকি ও জিডি
এর আগে, গত ১০ অক্টোবর দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকায় ‘ডিবি পুলিশের মাদক কারবার নিয়ে সংবাদ, সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকি’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন অরিত্র কুণ্ডু। এই খবর প্রকাশের পর থেকেই তিনি মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো ও প্রাণনাশের শঙ্কা প্রকাশ করে আসছিলেন। নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চলতি মাসের ১১ তারিখে ঝিনাইদহ সদর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ ও সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে রেখেছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো।

মামলার আগেই হাতকড়া ও সময়ের রহস্য
থানায় দায়েরকৃত প্রাতিষ্ঠানিক এজাহার (মামলা নং-৪৭, তারিখ: ২৬/১০/২০২৬) বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মামলাটি থানায় আনুষ্ঠানিকভাবে রুজু হয়েছে বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে (১৬:১০ ঘটিকায়)। অথচ আহত দুই সাংবাদিককে সকাল ১১টার দিকেই হাতকড়া পরিয়ে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। কোনো লিখিত অভিযোগ বা মামলা ছাড়া এভাবে আগেভাগেই থানায় নেওয়ার বিষয়টি পুলিশের অতিউৎসাহী আচরণ ও পরিকল্পিত ফাঁদের প্রমাণ দেয় বলে দাবি করেছেন অরিত্রর বাবা।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, “আমার ছেলে ডিবির ওসিকে নিয়ে সম্প্রতি সংবাদ করায় ঝিনাইদহের পুলিশ-প্রশাসন ক্ষিপ্ত ছিল। নিউজের কথা বলে তাকে কলেজে ডেকে নিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করা হয় এবং পরে পুলিশ অধ্যক্ষকে দিয়ে মামলা করাতে বাধ্য করেছে।”

মামলার বাদী অধ্যক্ষ বিজন কুমার সরকারের বক্তব্যেও রহস্যের ইঙ্গিত মিলেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি গণমাধ্যমকে বিস্তারিত বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না, আপনাকে সামনাসামনি আসতে হবে।” সদর থানার ওসি তাকে মামলা করতে বাধ্য করেছেন কি না এবং চাঁদাবাজির কোনো প্রমাণ আছে কি না—এমন প্রশ্নেরও কোনো সদুত্তর দেননি তিনি।

রিমান্ড আবেদনে ‘কাল্পনিক‘ গল্প ও ডোপ টেস্টের তোড়জোড়
আদালতে এসআই মো. মাসুম বিল্লাহ ও ওসি মো. আসাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত ৫ দিনের রিমান্ড আবেদনে (জিআর নং-৫০৪/২৬) সাধারণ চাঁদাবাজির অভিযোগকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। অরিত্রর আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান এর অভিযোগ, মামলাটিকে বড় রূপ দিতে ‘সরকারবিরোধী পরিকল্পনা উদ্ঘাটন’ এবং ‘ইন্ধনদাতা ও অর্থায়নকারী সিন্ডিকেট’ খোঁজার কাল্পনিক দাবি যুক্ত করা হয়েছে।

আইনজীবী আরও জানান, চাঁদাবাজির মামলা করিয়ে পুলিশ বিদ্যুৎ গতিতে অরিত্রর ডোপ টেস্ট করায়। সেখানে প্রথমে ‘ইয়াবা পজিটিভ’ দাবি করা হলেও, পরে পুলিশ সুপার আশিস বিন হাছান দাবি করেন যে ডোপ টেস্টে “মাত্রাতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ পাওয়া গেছে, যা আইনজীবীদের মতে ‘ক’ শ্রেণির মাদক।” তবে অরিত্রর পারিবারিক চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ও চিকিৎসার নথি বিশ্লেষণ করে পুলিশের এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রমাণিত হয়েছে।

অকাট্য মেডিকেল নথিতে ডোপ টেস্টের অসাড়তা প্রমাণ
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত অরিত্র কুণ্ডুর অফিশিয়াল মেডিকেল প্রেসক্রিপশন এবং হাসপাতালের টিকিট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ডোপ টেস্টে পাওয়া তথাকথিত সিডেটিভ বা ঘুমের ওষুধ মূলত তাঁর দীর্ঘমেয়াদী মানসিক রোগের চিকিৎসার অংশ। দেশের শীর্ষস্থানীয় মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের অফিশিয়াল প্রেসক্রিপশনে এর অকাট্য প্রমাণ রয়েছে:

  • বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন: যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) সাইকিয়াট্রি, অ্যাডিকশন স্লিপ ও নিউরো বিশেষজ্ঞ এবং বিভাগীয় প্রধান ডা. লে. কর্নেল জুলহাস উদ্দিন আহাম্মদ-এর অফিশিয়াল প্রেসক্রিপশনে স্পষ্ট দেখা যায়, রোগী অরিত্র কুণ্ডু দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বাইপোলার ও মানসিক জটিলতায় ভুগছেন। এই রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য তাঁকে চিকিৎসকের লিখিত আদেশে Asipam (এসিপাম), Nercital (নার্সিটাল), Quiech 25mg (কুইচ), Mitrazin (মিট্রাজিন), Mitapro (মিট্রাপ্রু), Mylan (মাইল্যান), Dormicum (ডর্মি কাম), Basit (বাসিট), Mylin (মাইলিন), Rabemax (রাবেম্যাক্স), Panto (প্যান্টো) এবং Inj. Fluphenazine Decanoate (ইনজেকশন ফ্লুফেনাজিন ডেকানোট)-এর মতো উচ্চমাত্রার সাইকোট্রপিক, সিডেটিভ ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ নিয়মিত সেবন করতে হয়।
  • জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের নথি: ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত সরকারি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল-এর বহির্বিভাগের টিকিট (রেজি: ৩৩৬১৭/১০৭) পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অরিত্রর মানসিক অবস্থা গুরুতর থাকায় চিকিৎসকেরা তাঁকে সরাসরি হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসার সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেখানেও তাঁকে Tab. Mirzalux 15mg (মির্জালাক্স) এবং Tab. Zepril 2mg (জেপ্রিল)-সহ নানা ধরনের স্নায়ু শিথিলকরণ ওষুধ নিয়মিত সেবনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

 

কনডেম সেলে রাখার বিষয় ও মানসিক অবস্থা
অরিত্রর বাবা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তাঁর ছেলে একজন সার্টিফাইড মানসিক ও বাইপোলার ডিজঅর্ডারের রোগী। চিকিৎসকের লিখিত নির্দেশ ও অফিশিয়াল প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী রোগনিয়ন্ত্রণের জন্য তাকে নিয়মিত এই ওষুধগুলো সেবন করতে হয়, যার সমস্ত নথিপত্র তাদের কাছে সুরক্ষিত রয়েছে। একজন নিয়মিত চিকিৎসাধীন রোগীকে কেবল আক্রোশবশত পুলিশ ডোপ টেস্টের ফাঁদে ফেলে মাদকসেবী বানানোর অপচেষ্টা করছে। শুধু তাই নয়, কারাগারে পাঠানোর পর সাধারণ সেলের পরিবর্তে ফাঁসির আসামিদের জন্য নির্ধারিত ‘কনডেম সেলে’ রেখে একজন অসুস্থ সাংবাদিককে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত ও হেনস্তা করার এক নজিরবিহীন ও অমানবিক অপচেষ্টা চালাচ্ছে ঝিনাইদহ পুলিশ।

তবে পুলিশের বিশেষ আগ্রহের বিষয়ে ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার আশিস বিন হাছান বলেন, “আমরা ডোপ টেস্টে মাত্রাতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ পেয়েছি। আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি এটা ‘ক’ শ্রেণির মাদক। তবে অরিত্র যদি প্রমাণ করতে পারেন যে এটা ডাক্তারের পরামর্শে সেবন করেন, তাহলে বেঁচে যাবেন। তাই এটা মূল মামলায় যোগ করিনি, তদন্তের সময় জুড়ে দেওয়া হবে।” সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পুলিশের এত তোড়জোড় কেন, জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, অরিত্রর বিরুদ্ধে আরও অনেক অভিযোগ আছে এবং তার ওপর ঝিনাইদহের সবাই বিরক্ত।

সাংবাদিক সংগঠন ও মানবাধিকার মহলের তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ
পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সরকারি কাজের অনিয়ম ও দুর্নীতির সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের এভাবে পরিকল্পিতভাবে মারধর, ডোপ টেস্টের নামে হয়রানি এবং কনডেম সেলে আটকে রাখার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)। এক যৌথ বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, “সংবাদ প্রকাশের জেরে একজন সাংবাদিককে এভাবে পরিকল্পিত ফাঁদে ফেলা এবং একজন গুরুতর অসুস্থ মানুষকে নির্জন কনডেম সেলে আটকে রাখা স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করার শামিল। অবিলম্বে এই মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।”

পাশাপাশি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া বহির্ভূতভাবে মামলা রুজুর আগেই সাংবাদিকদের হাতকড়া পরানো এবং চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন থাকা সত্ত্বেও বৈধ ওষুধকে মাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবিতে দেশজুড়ে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

মাকসুদুল হক, ঝিনাইদহ