👁 434 Views

ধানে ভরা গোলা, সুখে ভরা ঘর—গ্রাম বাংলার হারিয়ে যাওয়া সেই ঐতিহ্যের শেষ সাক্ষী বাঁশের গোলা

ছাদেকুল ইসলাম রুবেল,পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা) প্রতিনিধিঃ একসময় গ্রাম বাংলার সমৃদ্ধির সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল—”গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ”। কৃষকের ঘরে বাঁশের তৈরি ধানের গোলা থাকাটাই ছিল স্বচ্ছলতা, নিরাপত্তা ও সুখ-সমৃদ্ধির প্রতীক। অথচ আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাংলার শতবর্ষের সেই ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন আর চেনে না বাঁশের তৈরি ধানের গোলা; বইয়ের পাতায় কিংবা প্রবীণদের স্মৃতিচারণেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে গ্রামীণ জীবনের এই অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ।
ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজে শত শত বছর ধরে বাঁশ, বেত ও কাঠ দিয়ে তৈরি গোলায় ধান সংরক্ষণের প্রচলন ছিল। কৃষকরা মৌসুম শেষে ধান শুকিয়ে গোলায় সংরক্ষণ করতেন, যাতে বছরের প্রয়োজনীয় খাদ্য মজুত থাকে এবং আর্দ্রতা, ইঁদুর ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে শস্য রক্ষা পায়। সাধারণত গোলাগুলো মাটির ওপরে উঁচু খুঁটির ওপর বসানো হতো, যাতে বন্যার পানি বা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের প্রভাব না পড়ে।
গ্রামীণ জনপদে একসময় বাঁশের গোলা ছিল প্রতিটি স্বচ্ছল কৃষক পরিবারের গর্ব। বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা গোলা শুধু শস্যের ভাণ্ডারই ছিল না, ছিল কৃষকের সারা বছরের পরিশ্রমের প্রতীক। ভালো ফলনের বছর গোলা উপচে পড়া ধান দেখে পরিবারে যেমন আনন্দ নেমে আসত, তেমনি গ্রামের মানুষও সেই পরিবারকে সচ্ছল গৃহস্থ হিসেবে মূল্যায়ন করত।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে এখনো দু-একটি পুরোনো বাঁশের গোলার দেখা মেলে। তবে সেগুলোর অধিকাংশই সময়ের ভারে নুয়ে পড়েছে। কোথাও বাঁশ পচে গেছে, কোথাও কাঠামো ভেঙে পড়েছে। অযত্ন-অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার কৃষি সংস্কৃতির এই অনন্য ঐতিহ্য।
কৃষি গবেষকদের মতে, আধুনিক চালকল, গুদাম, প্লাস্টিক ও টিনের সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কম্বাইন হারভেস্টার এবং বাজারভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থার বিস্তারের ফলে ধানের গোলার ব্যবহার দ্রুত কমে গেছে। কৃষকরা এখন ফসল ঘরে তোলার পর দ্রুত বিক্রি করে দেন। ফলে দীর্ঘদিন ধান সংরক্ষণের প্রয়োজনও আগের তুলনায় অনেক কমেছে।
প্রবীণ কৃষকদের ভাষ্য, “একসময় গোলা ভরা ধান দেখেই পরিবারের সুখ-সমৃদ্ধি বোঝা যেত। এখন সেই দৃশ্য আর চোখে পড়ে না।” তাদের মতে, ধানের গোলা হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ জীবনের আবেগ, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সংস্কৃতিবিদদের অভিমত, বাঁশের তৈরি ধানের গোলা শুধু একটি সংরক্ষণ পদ্ধতি নয়; এটি বাংলার কৃষিনির্ভর সভ্যতার ইতিহাস, লোকজ স্থাপত্য ও জীবনযাপনের এক অনন্য নিদর্শন। এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে স্থানীয় প্রশাসন, সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ও জাদুঘরগুলোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে—কীভাবে তাদের পূর্বপুরুষেরা প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করে নিজেদের খাদ্য ও জীবনকে নিরাপদ রাখতেন।
বাংলার চিরচেনা সেই বাঁশের গোলা আজ হয়তো আর কৃষকের উঠোনে আগের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে নেই, কিন্তু ইতিহাসের পাতায়, লোকজ সংস্কৃতিতে এবং প্রবীণদের স্মৃতিতে এটি চিরকালই বেঁচে থাকবে বাংলার কৃষক সমাজের গৌরব, আত্মনির্ভরতা ও ঐতিহ্যের এক অবিনাশী প্রতীক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *