
এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ নগরীর প্রতি চারটি বাড়ির মধ্যে প্রায় একটিতে এডিস মশার লার্ভা, গত দুই মাসের পরিস্থিতি ডেঙ্গুর অশনিসংকেত দিচ্ছে। জুন মাসের জরিপ চিত্র উদ্বেগজনক।
চট্টগ্রামে শিশুদের হামের প্রকোপের মধ্যেই বর্ষা মৌসুমে নতুন উদ্বেগ হয়ে দেখা দিয়েছে ডেঙ্গু। স্বাস্থ্য অধিদফতরের জরিপে নগরীর আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চলতি বছরের ২ জুলাই পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৩১৭ জন, মারা গেছেন একজন। এ পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রস্তুতি ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বর্ষা শুরু হওয়ার পর থেকেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে শুরু করেছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১৭৬ জন। শুধু জুন মাসেই ভর্তি হয়েছেন ১২২ জন, যা আগের মাসগুলোর তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। চলতি জুলাই মাসের প্রথম দুই দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন আরও ১৯ জন।
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, নগরীর প্রতি চারটি বাড়ির মধ্যে প্রায় একটিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ডেঙ্গুর অশনিসংকেতঃ
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, গত দুই মাসের পরিস্থিতি ডেঙ্গুর অশনিসংকেত দিচ্ছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বর্ষার মাঝামাঝি সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩১৭ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৬৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২ জন আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি একজনের মৃত্যু হয়। মার্চে আক্রান্ত হন ২০ জন, এপ্রিলে ২৯ জন, মে মাসে ৩৭ জন, জুনে ১২২ জন এবং জুলাইয়ের প্রথম দুই দিনে ১৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
অতীতের চিত্রঃ
চট্টগ্রামে ২০২১ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ২৭১ জন, মারা যান পাঁচজন। ২০২২ সালে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ হাজার ৪৪৫ জনে এবং মৃত্যু হয় ৪১ জনের।
২০২৩ সালে ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ওই বছর আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১৪ হাজার ৮৭ জন এবং মারা যান ১০৭ জন, যা ছিল চট্টগ্রামের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতিগুলোর একটি।
২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কমে চার হাজার ৩২৩ জনে নেমে এলেও মৃত্যু হয় ৪৫ জনের। ২০২৫ সালে আক্রান্ত হন চার হাজার ৮৬৪ জন এবং মারা যান ২৫ জন।
বেড়েছে এডিসের লার্ভাঃ
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের উদ্যোগে পরিচালিত ‘ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক এডিস মশার সার্ভে’তে দেখা গেছে, নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টি ওয়ার্ডে ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করে ৯৯টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ বাড়িতে লার্ভার উপস্থিতি মিলেছে।
জরিপে ১১৪টি পজিটিভ কনটেইনারও শনাক্ত করা হয়েছে, যেখানে এডিস মশার লার্ভা জন্ম নিচ্ছিল।
উত্তর কাট্টলী, পাহাড়তলী, আলকরণ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, দক্ষিণ বালুচরা, পাথরঘাটা ও আন্দরকিল্লা—এই আটটি ওয়ার্ডকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনাক্ত হওয়া এডিস মশার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই এডিস ইজিপটাই প্রজাতির, যা ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রধান বাহক। বাকি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এডিস এলবোপিকটাস, যা ডেঙ্গুর দ্বিতীয় প্রধান বাহক।
স্বাস্থ্য বিভাগের প্রস্তুতিঃ
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘জুন মাসের জরিপে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন ও সুপারিশ সিটি করপোরেশনের কাছে পাঠানো হয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা নিধনের বিকল্প নেই এবং এ দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।’
তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত রাখার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে লিফলেট বিতরণ ও মাইকিংয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
সতর্ক থাকার পরামর্শঃ
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেজের (বিআইটিআইডি) অধ্যাপক ডা. মো. মামুনুর রশীদ বলেন, ‘বর্ষা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া থেকে বাঁচতে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে এবং কোথাও যেন পানি জমে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘জ্বর, শরীরব্যথা কিংবা শরীরে র্যাশ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।’
সিটি করপোরেশন যা করছেঃ
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এ সময়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কম। ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমরা ছয় মাস ধরে পরিবেশবান্ধব আমেরিকান প্রযুক্তির বিটিআই ব্যবহার করছি। মশক নিধন কার্যক্রমের মান বাড়াতে সাতজন পরিদর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি জানান, প্রতিটি ওয়ার্ডে সকালে লার্ভিসাইড এবং বিকালে এডাল্টিসাইড প্রয়োগ করা হচ্ছে। পাশাপাশি চসিকের তত্ত্বাবধানে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা কর্নার চালু রয়েছে। মেমন হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু ওয়ার্ডও চালু করা হয়েছে।
মেয়র বলেন, ‘সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সিএনজি অটোরিকশার মাধ্যমে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ এবং নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।’
চসিকের ম্যালেরিয়া ও মশক নিধন কর্মকর্তা শরফুল ইসলাম মাহি বলেন, ‘মশা নিধন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। জনবল ও ওষুধের কোনো সংকট নেই। আগামী ছয় মাসের ওষুধ মজুত রয়েছে। নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে ২০৫ জন স্প্রেম্যান নিয়মিত কাজ করছেন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর জন্য আলাদা বিশেষ স্প্রে টিমও কাজ করছে।’