
মোঃ নজরুল ইসলাম, একই পরিবারের একজন নয়, দুজন নয়—একে একে তিন-তিনজন ডক্টরেট ডিগ্রিধারী বিজ্ঞানী। চিকিৎসা ও জিন প্রকৌশলের মতো জটিল বিজ্ঞানের দরবারে বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়াচ্ছেন তারা। বলছিলাম নরসিংদী সদর উপজেলার মাধবদী পৌরসভার তিতু খাঁ রোডসংলগ্ন টাটাপাড়া মহল্লার ঐতিহ্যবাহী ‘খান বাড়ি’র কথা। একই পরিবার থেকে উঠে আসা তিন বিজ্ঞানী—চাচা ড. রফিকুল ইসলাম খান এবং তাঁর দুই ভাতিজী ড. সানজিদা খান ও ড. ফারহীন খান বিশ্বজুড়ে গবেষণার পাশাপাশি পরিবার, এলাকা ও পুরো বাংলাদেশের জন্য বয়ে এনেছেন অভূতপূর্ব গৌরব।
প্রথম পথিকৃৎ: আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা বিজ্ঞানী ড. রফিকুল ইসলাম খান
পরিবারের এই সফলতার ধারার অন্যতম পথিকৃৎ ড. রফিকুল ইসলাম খান। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৭ সালে জেনেটিক্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। পরবর্তীতে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে ১৯৮৯ সালে নিউজিল্যান্ডের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলিংটন থেকে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি অর্জন করেন।
দেশে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পরমাণু শক্তি কমিশন ও ইক্ষু গবেষণা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও বৈজ্ঞানিক হিসেবে কাজ করার পর তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পাড়ি জমান। যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া (CSIRO), যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোভার্টিস/সিনজেন্টার মতো আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ২৫ বছরেরও বেশি সময় জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তাঁর নামের পাশে রয়েছে ৩টি আন্তর্জাতিক পেটেন্ট, ২টি বই এবং ১৬টি বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা। কেবল গবেষণায় নয়, নিজ জন্মস্থান টাটাপাড়ায় ড. রফিকুল ইসলাম খান হাসপাতাল, রাস্তা ও জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করে সমাজসেবায়ও রেখেছেন অনন্য অবদান।
চক্ষু চিকিৎসায় নতুন উদ্ভাবন: ড. সানজিদা খান
চাচার পথ ধরে উচ্চশিক্ষার শিখরে পৌঁছেছেন ভাতিজী ড. সানজিদা খান। ঢাকার গ্রিন হেরাল্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ‘ও’ ও ‘এ’ লেভেল শেষ করে পিতা মুজিবুর রহমান খানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রু ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিজ্ঞান, গণিত ও জীববিজ্ঞানে স্নাতক শেষ করার পর ২০২৫ সালে মেধাভিত্তিক পূর্ণ বৃত্তিতে ওরেগন হেলথ অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি (OHSU) থেকে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
তাঁর পিএইচডি গবেষণার মাধ্যমে মানবচক্ষুর কর্নিয়ার চিকিৎসায় আলোকরশ্মিভিত্তিক এক যুগান্তকারী ইমেজিং পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে, যা শিগগিরই আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। বর্তমানে গবেষণা ফলাফলকে আরও সমৃদ্ধ করতে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈজ্ঞানিক হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজ করছেন।
নবজাতকের দৃষ্টি ফেরানোর গবেষণায় সাফল্য: ড. ফারহীন খান
পরিবারের কনিষ্ঠতম ডক্টরেটধারী ড. ফারহীন খান। ১৯৯৮ সালে জন্ম নেওয়া ফারহীন ২০০০ সালে বাবা মো. হাবিবুর রহমান খান ও মা তাসলিমা হাসান খানের সাথে কানাডায় পাড়ি জমান। সেখানে হাই স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কানাডার বিখ্যাত ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও বায়োকেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। সম্প্রতি তিনি কানাডার শীর্ষস্থানীয় টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেছেন।
ড. ফারহীন খানের গবেষণার বিষয়বস্তু মানবচক্ষু, বিশেষ করে ভূমিষ্ঠ নবজাতকদের অন্ধত্ব প্রতিরোধ ও নষ্ট হয়ে যাওয়া দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধারের উদ্ভাবনী পদ্ধতি। তাঁর এই গবেষণা পদ্ধতি কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ জাপান, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির শীর্ষ মেডিকেল ও বায়োটেক কোম্পানির ভূয়সী প্রশংসা ও স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্বমঞ্চে বাঙালি নারীর এই অভাবনীয় সাফল্য বাংলাদেশ ও প্রবাসের সুধীমহলে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দিয়েছে।
মাধবদীর টাটাপাড়া গ্রামের একই পরিবারের তিন বিজ্ঞানীর এমন আকাশছোঁয়া গৌরবময় অর্জন শুধু মাধবদী বা নরসিংদী নয়, পুরো বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক অনুকরণীয় ও বর্ণিল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
