
মনোহরদী (নরসিংদী): জীবনে সাফল্য অর্জনের জন্য শুধু মেধা কিংবা ভালো ফলাফল যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিয়মিত পরিশ্রম, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সঠিক কৌশল এবং সঠিক পথে অবিচল থাকা—এমন বার্তা দিয়েছেন বি.জে.এস.এম মডেল কলেজের প্রভাষক তৌফিক সুলতান।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকালে নরসিংদীর মনোহরদীতে বি.জে.এস.এম মডেল কলেজে ২০২৬–২০২৭ শিক্ষাবর্ষের একাদশ শ্রেণির নবীনবরণ অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি প্রচলিত **‘খরগোশ ও কচ্ছপের গল্প’**কে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষা তুলে ধরেন।
মনোহরদীর রসুলপুর, হাতিরদিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত Brave Jubilant Scholars of Monohardi Model College (BJSM Model College)-এর EIIN 140263। প্রতিষ্ঠানটির অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী এখানে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
প্রথম দৌড়: আত্মতুষ্টি সাফল্যের সবচেয়ে বড় বাধা নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তৌফিক সুলতান বলেন, খরগোশ ও কচ্ছপের প্রথম দৌড়ের গল্পে খরগোশ দ্রুত এগিয়ে গিয়েও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণে মাঝপথে বিশ্রাম নেয়। অন্যদিকে ধীরগতির কচ্ছপ থেমে না গিয়ে অবিরত এগিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়।
এই গল্পের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের সম্পর্ক তুলে ধরে তিনি বলেন, এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন করার পর কেউ যদি মনে করে ‘আমি তো ভালোই করেছি, এখন আর বেশি পড়াশোনা করার প্রয়োজন নেই’, তাহলে সেই আত্মতুষ্টিই তার পরবর্তী সাফল্যের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাঁর মতে, একটি ভালো ফলাফল কোনো শিক্ষার্থীর যাত্রার শেষ নয়; বরং সেটি পরবর্তী বড় লক্ষ্যের জন্য একটি শক্তিশালী সূচনা।
দ্বিতীয় দৌড়: মেধাকে কাজে লাগাতে হবে দ্বিতীয় দৌড়ের গল্পের প্রসঙ্গ টেনে তৌফিক সুলতান শিক্ষার্থীদের বোঝান, শুধু মেধাবী হলেই সফল হওয়া যায় না—মেধাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করাও একটি বড় যোগ্যতা।
তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থীর ভালো ফলাফল, মেধা কিংবা প্রতিভা তখনই অর্থবহ হয়, যখন সে সেই সক্ষমতাকে নিয়মিত পড়াশোনা, অনুশীলন, সময় ব্যবস্থাপনা ও লক্ষ্য অর্জনের কাজে ব্যবহার করতে পারে।
অর্থাৎ, মেধা হলো সম্ভাবনা; আর পরিশ্রম ও সঠিক প্রয়োগ সেই সম্ভাবনাকে সাফল্যে রূপ দেয়।
তৃতীয় দৌড়: শুধু পরিশ্রম নয়, সঠিক পথও জরুরি খরগোশ-কচ্ছপের তৃতীয় দৌড়ের মাধ্যমে তিনি নবীনদের সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরেন—সাফল্যের জন্য শুধু দ্রুততা, মেধা বা কঠোর পরিশ্রমই যথেষ্ট নয়; সঠিক পথ নির্বাচন করাও জরুরি।
তৌফিক সুলতানের ভাষ্যে, একজন শিক্ষার্থী অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়াশোনা করেও প্রত্যাশিত ফলাফল পায় না। এর কারণ সবসময় মেধার অভাব নয়; কখনো কখনো পড়াশোনার পদ্ধতি, পরিকল্পনা, বিষয়ভিত্তিক কৌশল কিংবা সময় ব্যবস্থাপনায় ভুল থাকতে পারে।
তাই তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “কত ঘণ্টা পড়েছ—শুধু সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; কীভাবে পড়েছ, কী শিখেছ এবং শেখাটাকে কীভাবে কাজে লাগাচ্ছ—সাফল্যের জন্য সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।”
‘নিয়মিত পড়াশোনা, সঠিক কৌশল ও সঠিক দিকনির্দেশনা’
নবীনদের সফলতার জন্য তিনি কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে অনুসরণের পরামর্শ দেন। এর মধ্যে রয়েছে—
১. নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা
২. প্রতিদিন নিয়মিত পড়াশোনা করা
৩. সময়ের সঠিক ব্যবহার করা
৪. দুর্বল বিষয়গুলো চিহ্নিত করে বেশি অনুশীলন করা
৫. মুখস্থের পরিবর্তে বুঝে শেখার চেষ্টা করা
৬. নিয়মিত নিজের অগ্রগতি যাচাই করা
৭. প্রয়োজন হলে শিক্ষকের পরামর্শ নেওয়া
৮. আত্মতুষ্টি ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এড়িয়ে চলা
৯. ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া
১০. সঠিক পথ ও ইতিবাচক পরিবেশ ধরে রাখা।
‘আজকের নবীনই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে’
তৌফিক সুলতান নবীন শিক্ষার্থীদের মনে করিয়ে দেন, কলেজজীবন শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার সময় নয়; এটি নিজের চিন্তা, দক্ষতা, চরিত্র ও ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ সময়।
তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থীর আজকের ছোট ছোট অভ্যাসই আগামী দিনের বড় পরিচয় তৈরি করে। তাই কলেজজীবনের শুরু থেকেই সময়ের মূল্য বুঝে নিয়মিত পড়াশোনা, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও আত্মউন্নয়নের চর্চা করা প্রয়োজন।
তিনি নবীনদের উদ্দেশে আরও বলেন, “সাফল্য হঠাৎ এসে দরজায় কড়া নাড়ে না। প্রতিদিনের ছোট ছোট সঠিক সিদ্ধান্ত, নিয়মিত পরিশ্রম এবং সঠিক পথে অবিচল থাকার ফল হিসেবেই একদিন সাফল্য সামনে এসে দাঁড়ায়।”
নবীনবরণে অনুপ্রেরণামূলক বার্তা
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অন্যান্য বক্তারাও উচ্চশিক্ষা, মাদকমুক্ত সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, আন্তর্জাতিক শিক্ষার সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ গঠনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেন।
প্রধান আলোচক অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা অর্জন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ও বিদেশি বৃত্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মঞ্জিল মোল্লা শিক্ষার্থীদের সাফল্যের সঙ্গে শিক্ষকের সাফল্যের গভীর সম্পর্ক তুলে ধরেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহামুদুল হাসান শিক্ষার্থীদের মাদক থেকে দূরে থাকা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সব মিলিয়ে নবীনবরণ অনুষ্ঠানটি শুধু নতুন শিক্ষার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং একাদশ শ্রেণিতে পা রাখা শিক্ষার্থীদের সামনে শিক্ষাজীবনের লক্ষ্য, সাফল্যের কৌশল ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি বাস্তব দিকনির্দেশনা তুলে ধরেছে।
শেষ কথা : খরগোশ-কচ্ছপের গল্পের মাধ্যমে প্রভাষক তৌফিক সুলতানের বক্তব্যের মূল শিক্ষা যেন এক বাক্যেই ধরা যায়—
«“মেধা তোমাকে এগিয়ে দিতে পারে, পরিশ্রম তোমাকে টিকিয়ে রাখতে পারে; কিন্তু সঠিক পথই তোমাকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।”»
নবীনদের জন্য এ বার্তাই হতে পারে নতুন শিক্ষাজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিজ্ঞা—থামব না, আত্মতুষ্ট হব না; ভুল পথে ছুটবও না—সঠিক লক্ষ্য, সঠিক কৌশল ও নিয়মিত পরিশ্রমের মাধ্যমে এগিয়ে যাব।
লামিয়া ইসলাম
সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম
কাপাসিয়া, গাজীপুর
ই-মেইল: lamiyaislam.on@gmail.com
মোবাইল: +৮৮০ ১৭০৭-০৩৯৭৩০