
পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা) সংবাদদাতাঃ যে মেয়েটির বাবার সংসারে ঠাঁই হয়নি, যে পরিবার বছরের পর বছর নানার বাড়িতে অভাব-অনটনের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে—সেই অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী উম্মে কুলছুম বৃষ্টি আজ নতুন স্বপ্ন দেখছে।
কারণ, তার হাতে উঠেছে একটি নতুন সেলাই মেশিন। শুধু একটি যন্ত্র নয়, এটি তার কাছে আত্মমর্যাদা, আত্মনির্ভরতা এবং পরিবারের ভাগ্য বদলের প্রতীক।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী পৌরসভার বাসিন্দা বৃষ্টির বড় বোন ফাতেমা আক্তার শারীরিক ও বাকপ্রতিবন্ধী। চলতি এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেও শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে দাঁড়িয়ে থেকে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে তাকে। দুই মেয়েকে নিয়ে প্রায় সাত বছর ধরে নানার বাড়িতেই মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন মা ছামছুন্নাহার বেগম।
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি স্মার্টফোনে ভিডিও দেখে সেলাই শেখার চেষ্টা করত বৃষ্টি। নানার সহায়তায় একটি পুরোনো সেলাই মেশিনে কাজ শুরু করে ঈদের মৌসুমে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয়ও করেছে। তবে একটি আধুনিক সেলাই মেশিন ছিল তার বহুদিনের স্বপ্ন।
সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে বসুন্ধরা শুভসংঘের তিন মাসব্যাপী বিনামূল্যের সেলাই প্রশিক্ষণ শেষে।
আবেগাপ্লুত বৃষ্টি বলে, “এখন আরও দক্ষ হয়েছি। নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারব, প্রতিবন্ধী বোনের পাশে দাঁড়াতে পারব। এই মেশিন আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে।”
মা ছামছুন্নাহার বেগমের কণ্ঠেও ছিল কৃতজ্ঞতা। তিনি বলেন, “আমার মেয়ের হাতে সেলাই মেশিন তুলে দিয়ে বসুন্ধরা শুভসংঘ আমাদের পরিবারকে নতুন জীবন দিয়েছে। এখন আর কারও কাছে হাত পাততে হবে না।”
বৃষ্টির নানা,দৈনিক খবর পত্রের সাংবাদিক নুরুল ইসলাম বলেন, “অনেক কষ্টের মধ্যেও দুই নাতনি কখনো হার মানেনি। সুযোগ পেলে ওরা অনেক দূর এগিয়ে যাবে।”
শুধু বৃষ্টিই নয়, একই প্রশিক্ষণ শেষে সেলাই মেশিন পেয়েছেন আরও ২৩ জন অসচ্ছল নারী। প্রত্যেকের জীবনসংগ্রামের গল্প প্রায় একই—দারিদ্র্য, বঞ্চনা আর স্বাবলম্বী হওয়ার অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
সম্প্রতিক পলাশবাড়ী উপজেলা পরিষদ হলরুমে তিন মাসের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করা ২৪ জন নারীর হাতে সেলাই মেশিন ও গাছের চারা তুলে দেন বসুন্ধরা গ্রুপের উপদেষ্টা ও কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন।
অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমিনুল ইসলাম বুলবুলসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং বসুন্ধরা শুভসংঘের কেন্দ্রীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথি ইমদাদুল হক মিলন বলেন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই সেলাই মেশিনগুলো শুধু উপহার নয়, অসচ্ছল নারীদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।
একটি সেলাই মেশিন, ২৪টি পরিবার, আর অসংখ্য স্বপ্ন—পলাশবাড়ীতে বসুন্ধরা শুভসংঘের এই উদ্যোগ প্রমাণ করল, সামান্য সহায়তাও কারও জীবনে নতুন ভোরের সূচনা করতে পারে।