👁 277 Views

মেধাপাচার: ভবিষ্যৎ হারানোর নীরব সংকেত

মেধাপাচার: ভবিষ্যৎ হারানোর নীরব সংকেত
বাংলাদেশ কি তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদকে অজান্তেই হারিয়ে ফেলছে?

স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের পর বাংলাদেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে উন্নয়নের প্রচলিত সূচকগুলো আর ভবিষ্যতের সাফল্য নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট নয়। গত কয়েক দশকে দেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে, দারিদ্র্যের হার কমেছে, গড় আয়ু বেড়েছে, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, অবকাঠামো উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি এসেছে এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশকে এখন আর কেবল উন্নয়ন সহায়তার উপর নির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হয় না; বরং সম্ভাবনাময় একটি উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবুও এই সাফল্যের আড়ালে এমন একটি সংকট নীরবে গভীর হচ্ছে, যা আজকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না। এটি এমন একটি ক্ষতি, যার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান নয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির উদ্ভাবনী ক্ষমতা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, গবেষণা, এমনকি রাষ্ট্রের কৌশলগত সক্ষমতাকেও দুর্বল করে দিতে পারে। সেই সংকটের নাম—মেধাপাচার (Brain Drain)।

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছে। তাদের একটি অংশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ পাচ্ছে। একইভাবে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী এবং বিভিন্ন পেশার দক্ষ মানুষ উন্নত গবেষণা, কর্মপরিবেশ ও পেশাগত সম্ভাবনার সন্ধানে বিদেশে স্থায়ী হচ্ছে। তাদের সাফল্য নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয়। বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাগার, হাসপাতাল, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশিদের অবদান আমাদের মানবসম্পদের সক্ষমতারই প্রমাণ।
তবে রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে আসে। এই মানুষগুলোর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনী শক্তির কতটা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের কাজে লাগছে? আর যদি সেই সম্ভাবনার বড় অংশই অন্য দেশের অর্থনীতি, গবেষণা ও প্রযুক্তিকে সমৃদ্ধ করে, তাহলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে কী হারাচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই একটি প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা দরকার। বিদেশে পড়তে যাওয়া, কাজ করা কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হওয়া নিজেই মেধাপাচার নয়। বর্তমান বিশ্বে জ্ঞান ও দক্ষতার আন্তর্জাতিক প্রবাহ স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। বরং বিদেশে শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জন একটি দেশের জন্য সম্পদে পরিণত হতে পারে। যদি সেই জ্ঞান কোনো না কোনোভাবে নিজের দেশের উন্নয়নে ফিরে আসে। মেধাপাচার তখনই জাতীয় উদ্বেগে পরিণত হয়, যখন একটি দেশ ধারাবাহিকভাবে তার সবচেয়ে দক্ষ মানুষদের হারায়, কিন্তু তাদের বিকল্প তৈরি করতে পারে না কিংবা এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, যেখানে তারা ফিরে এসে কাজ করতে আগ্রহী হন।

এই আলোচনায় একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি। একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, তার মানুষ। সৌদি আরব বা কাতারের শক্তি তেল ও গ্যাস। অস্ট্রেলিয়ার শক্তি খনিজ সম্পদ। কিন্তু বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি সবসময়ই ছিল তার মানুষ। তৈরি পোশাকশিল্প থেকে শুরু করে ঔষুধশিল্প, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা প্রবাসী আয়। সব ক্ষেত্রেই মানুষের দক্ষতা ও শ্রম দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু একটি অর্থনীতি যখন নিম্ন আয়ের স্তর থেকে মধ্যম আয়ের দিকে অগ্রসর হয়, তখন শুধু শ্রম আর যথেষ্ট থাকে না। তখন উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে জ্ঞান, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবন। বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসও এ কথাই বলে। আজ যে দেশগুলো প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তারা প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে নয়; গবেষণা, শিক্ষা এবং উদ্ভাবনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কারণেই এগিয়ে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, বায়োটেকনোলজি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মহাকাশ প্রযুক্তি কিংবা উন্নত চিকিৎসা। এইসব ক্ষেত্রের নেতৃত্ব দিচ্ছে সেই দেশগুলো, যারা কয়েক দশক আগে থেকেই গবেষণাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিয়েছিল।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা UNESCO-এর তথ্য অনুযায়ী, গবেষণা ও উন্নয়নে (Research and Development বা R&D) বিনিয়োগ, গবেষকের সংখ্যা এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতা একটি দেশের দীর্ঘমেয়দি প্রতিযোগিতা নির্ধারণের অন্যতম প্রধান সূচক। একইভাবে Global Innovation Index-এ ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো শক্তিশালী গবেষণা অবকাঠামো, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ।
বাংলাদেশেও গবেষণার ইতিবাচক উদাহরণ কম নয়। কৃষি গবেষণার ফলে অধিক ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে, ঔষুধশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে, দুর্যোগ পূর্বাভাস ও ঘূর্ণিঝড় ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এসেছে। এইসব অর্জনের পেছনে নীতিনির্ধারণের পাশাপাশি গবেষক, বিজ্ঞানী এবং পেশাজীবীদের দীর্ঘদিনের অবদান রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আগামী বিশ বা ত্রিশ বছরের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য কি আমরা পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করছি? বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, জিনপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা এবং জলবায়ু অভিযোজন নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছে, তখন বাংলাদেশ কি সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য নিজস্ব গবেষক, উদ্ভাবক এবং প্রযুক্তিবিদদের ধরে রাখতে পারছে?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়।
কারণ মেধাপাচারের ক্ষতি কখনও তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। একজন গবেষক বিদেশে চলে গেলে পরদিন কোনো কারখানা বন্ধ হয়ে যায় না। একজন বিজ্ঞানী অন্য দেশে স্থায়ী হলে সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতি ধসে পড়ে না। কিন্তু দশ বছর পরে দেখা যায়, যে প্রযুক্তি আমরা আজ কোটি কোটি টাকা দিয়ে আমদানি করছি, সেটি হয়তো এমন একজন বাংলাদেশির গবেষণার ফল, যিনি নিজের দেশে সেই গবেষণা করার সুযোগ পাননি। এই ক্ষতির কোনো তাৎক্ষণিক পরিসংখ্যান নেই।
কিন্তু ইতিহাস বলে, যে দেশ নিজের সেরা মেধাকে ধরে রাখতে পারে না, সে একসময় অন্যের উদ্ভাবনের ক্রেতায় পরিণত হয়। আর যে দেশ মেধাকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে, ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত সেই দেশের পক্ষেই কথা বলে।

কেন মেধাবীরা দেশ ছাড়ছে: শুধু অর্থ নয়, আস্থারও প্রশ্ন
মেধাপাচার নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই একটি ব্যাখ্যা সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। বিদেশে বেতন বেশি, তাই মানুষ দেশ ছাড়ছে। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ বা সরল নয়। অর্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, কিন্তু সেটিই একমাত্র কারণ নয়। একজন গবেষক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক কিংবা প্রকৌশলীর কাছে পেশাগত জীবনের মূল্যায়ন হয় আরও কয়েকটি বিষয় দিয়ে। গবেষণার পরিবেশ, স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সবচেয়ে বড় কথা, যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন। একজন গবেষক যখন একটি নতুন ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করে, তখন তিনি শুধু অর্থ চান না; তিনি এমন একটি পরিবেশ চান যেখানে ব্যর্থ হওয়ারও স্বাধীনতা থাকবে। কারণ গবেষণার ইতিহাস বলে, দশটি পরীক্ষার মধ্যে নয়টিই ব্যর্থ হতে পারে, কিন্তু সেই একটি সফল পরীক্ষাই কখনও কখনও একটি দেশের অর্থনীতি বদলে দিতে পারে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনেক উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও গবেষণা এখনো অনেকাংশে প্রকল্পনির্ভর এবং সীমিত অর্থায়নের উপর নির্ভরশীল। গবেষণা অবকাঠামো, আধুনিক ল্যাবরেটরি, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক মেধাবী গবেষক বিদেশে যাওয়াকেই স্বাভাবিক ক্যারিয়ার হিসেবে দেখে থাকে। এটি কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা।

মেধাপাচারের প্রকৃত ক্ষতি কোথায়?
অনেকেই মনে করে, একজন চিকিৎসক বা প্রকৌশলী বিদেশে চলে গেলে দেশে আরেকজন তৈরি হয়ে যাবে। কথাটি আংশিক সত্য হলেও বাস্তবতা আরও জটিল। একজন দক্ষ গবেষক তৈরি করতে প্রায়ই ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগে। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা এবং দীর্ঘ গবেষণা-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে একজন মানুষ বিশ্বমানের বিজ্ঞানী বা বিশেষজ্ঞে পরিণত হয়। অর্থাৎ একজন গবেষক শুধু একজন ব্যক্তি নন; তাঁর পেছনে রয়েছে একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। যখন সেই ব্যক্তি স্থায়ীভাবে অন্য দেশে গবেষণা করে, তখন তার নতুন আবিষ্কার, নতুন প্রযুক্তি, নতুন পেটেন্ট, নতুন প্রতিষ্ঠান কিংবা নতুন শিল্পের সুফল প্রধানত সেই দেশই পেয়ে থাকে। এই কারণেই উন্নত দেশগুলো মেধাবী অভিবাসীদের আকৃষ্ট করতে এত আগ্রহী। তারা জানে, দক্ষ মানুষকে আকর্ষণ করা মানে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে শক্তিশালী করা।

গবেষণার দুর্বলতা মানে ভবিষ্যতের দুর্বলতা
বাংলাদেশে গবেষণার প্রসঙ্গ অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ গবেষণা একটি দেশের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে প্রভাবিত করে। কৃষি থেকে স্বাস্থ্য, শিল্প থেকে পরিবেশ, জ্বালানি থেকে তথ্যপ্রযুক্তি, সব ক্ষেত্রেই নতুন জ্ঞানই উন্নয়নের ভিত্তি। বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নতুন উদ্ভিদ রোগ, কৃষিজমি হ্রাস এবং পানির সংকট আগামী দশকগুলোতে কৃষিকে আরও কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে কে? কৃষিবিজ্ঞানী। জীবপ্রযুক্তি গবেষক। মৃত্তিকাবিজ্ঞানী। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ। অর্থাৎ সেই মানুষগুলো, যাদের আমরা আজ তৈরি করছি। যদি এই দক্ষ মানুষদের বড় একটি অংশ বিদেশে স্থায়ীভাবে চলে যায় এবং দেশে পর্যাপ্ত গবেষণা পরিবেশ তৈরি না হয়, তাহলে ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

স্বাস্থ্য খাতে শুধু হাসপাতাল বাড়ালেই হবে না
স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন শুধু নতুন হাসপাতাল নির্মাণের উপর নির্ভর করে না। চিকিৎসা গবেষণা, জনস্বাস্থ্য, মহামারি বিশ্লেষণ, ঔষুধ উদ্ভাবন এবং চিকিৎসা প্রযুক্তির উন্নয়ন—এসবই একটি আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। বাংলাদেশের ঔষুধশিল্প আজ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করছে। কিন্তু ভবিষ্যতে যদি নতুন ঔষুধ, বায়োটেকনোলজি বা উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তিতে এগিয়ে যেতে হয়, তাহলে আরও বেশি চিকিৎসা গবেষক, জীববিজ্ঞানী এবং বায়োমেডিক্যাল প্রকৌশলী প্রয়োজন হবে। এই দক্ষতা আমদানি করা যায় না; তৈরি করতে হয়।

সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি: নতুন যুগের প্রতিযোগিতা
একবিংশ শতাব্দীর প্রতিযোগিতা শুধু সীমান্তে নয়, ডিজিটাল জগতেও। আজ একটি সাইবার হামলা একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ গ্রিড, বিমান চলাচল, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা সরকারি তথ্যভাণ্ডারকে অচল করে দিতে পারে। তাই সাইবার নিরাপত্তা এখন শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তারও বিষয়। একইভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, রোবোটিক্স, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি এবং তথ্য বিশ্লেষণ আগামী দিনের অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তুলবে। যদি বাংলাদেশ এই খাতে নিজস্ব দক্ষ জনবল তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি বিশ্বে উদ্ভাবক ও প্রযুক্তি নির্মাতা হওয়ার পরিবর্তে ভোক্তা দেশ হিসেবেই থেকে যাবে।

নদী, পানি ও জলবায়ু: বাংলাদেশের নিজস্ব গবেষণার প্রয়োজন
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়ে আলাদা। নদী, বন্যা, উপকূল, লবণাক্ততা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, এইসব সমস্যার সমাধান অন্য কোনো দেশের গবেষণা হুবহু অনুসরণ করে সম্ভব নয়। প্রয়োজন বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গবেষণা। এই গবেষণা করবে বাংলাদেশের জলবিদ, পরিবেশবিজ্ঞানী, নদী প্রকৌশলী, ভূতত্ত্ববিদ এবং তথ্য বিশ্লেষকেরা। অর্থাৎ মেধাবী মানুষরাই।

উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ
বাংলাদেশের অর্থনীতি গত কয়েক দশকে মূলত শ্রমনির্ভর শিল্প, রপ্তানি এবং প্রবাসী আয়ের উপর ভিত্তি করে এগিয়েছে। কিন্তু আগামী কয়েক দশকের অর্থনীতি হবে জ্ঞাননির্ভর। যে দেশ নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করবে, উচ্চমূল্যের শিল্প গড়ে তুলবে এবং গবেষণাকে অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করবে, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় তারাই এগিয়ে থাকবে। এই কারণেই মেধাপাচারের প্রশ্নটি কেবল একজন মানুষের বিদেশে চলে যাওয়ার প্রশ্ন নয়। এটি একটি দেশের গবেষণা সক্ষমতা, উদ্ভাবনী শক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
প্রশ্নটি তাই আর শুধু—”কতজন বিদেশে গেল?”—এতটুকু নয়।
প্রকৃত প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারছে, যেখানে একজন মেধাবী তরুণ মনে করবে যে, বিশ্বের সেরা শিক্ষা অর্জনের পর নিজের দেশের জন্য কাজ করাও একটি বাস্তব এবং সম্মানজনক সম্ভাবনা?

সমাধানের পথ: মেধাপাচার নয়, মেধার প্রবাহ
মেধাপাচার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই একটি ভুল করে বসি। আমরা সমস্যাটিকে কেবল আবেগ দিয়ে বিচার করি, “মেধাবীরা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে।” কিন্তু উন্নয়নের ইতিহাস বলছে, প্রশ্নটি বিদেশে যাওয়া নয়; প্রশ্নটি হলো, একটি দেশ তার মেধাকে কতটা কাজে লাগাতে পারছে। আজ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশই বিদেশি মেধার উপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, জার্মানি কিংবা অস্ট্রেলিয়ার গবেষণাগার, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা কাজ করছে। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন এবং ভারতও একসময় উল্লেখযোগ্য মেধাপাচারের মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু তারা একটি বিষয় দ্রুত উপলব্ধি করেছিল। মেধাকে ধরে রাখার একমাত্র উপায় দেশপ্রেমের আহ্বান নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে যোগ্য মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা ও গবেষণা বিনিয়োগের মাধ্যমে। সিঙ্গাপুর বুঝেছিল, প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত হলেও মানবসম্পদ সীমাহীন সম্ভাবনার উৎস। তাই তারা গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে স্থান দিয়েছে। ভারত গত দুই দশকে তথ্যপ্রযুক্তি, স্টার্টআপ, মহাকাশ গবেষণা এবং ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসারের মাধ্যমে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে বিদেশে থাকা ভারতীয় বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তারাও বিভিন্নভাবে দেশের উন্নয়নে যুক্ত হচ্ছে। এই উদাহরণগুলোর মূল শিক্ষা একটিই, মেধাকে বন্দি করে রাখা যায় না; কিন্তু মেধার জন্য আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করা যায়।

বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত করণীয়
বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় মেধা কৌশল (National Talent Strategy) গড়ে তোলা। এটি কোনো একটি মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়; শিক্ষা, বিজ্ঞান, শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং বৈদেশিক সম্পর্ক সব ক্ষেত্রকে সমন্বিত করে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

প্রথমত, গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তবে শুধু অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; গবেষণার অর্থ যেন দ্রুত, স্বচ্ছ এবং দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহৃত হয়, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রকল্পের জন্য স্থিতিশীল অর্থায়ন অপরিহার্য।

দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলতে হবে। উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ উদ্ভাবন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা থেকে শিল্পে স্থানান্তরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সাফল্যে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশেও গবেষণাকে গবেষণাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব উৎপাদন, কৃষি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি এবং প্রযুক্তিতে প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।

তৃতীয়ত, প্রবাসী বাংলাদেশি গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি। সবাইকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, আবার প্রয়োজনও নেই। কিন্তু তাঁরা যৌথ গবেষণা, অতিথি অধ্যাপনা, গবেষণা তত্ত্বাবধান, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতার মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।

চতুর্থত, মেধার মূল্যায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একজন তরুণ গবেষক বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক তখনই দেশে থেকে কাজ করতে আগ্রহী হবে, যখন সে বিশ্বাস করবে যে তাঁর অগ্রগতি নির্ভর করবে যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা এবং গবেষণার মানের উপর।

পঞ্চমত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে সামাজিকভাবে আরও মর্যাদা দিতে হবে। আমাদের সমাজে এখনো গবেষকের সাফল্য অনেক সময় নীরবে থেকে যায়, অথচ তাঁর একটি আবিষ্কার হাজারো মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। গবেষণাকে জাতীয় আলোচনার অংশ বানানোও গুরুত্বপূর্ণ।

একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার
মেধাপাচারের সমাধান কখনোই সীমাবদ্ধতা তৈরি করা নয়। মানুষকে বিদেশে যাওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করাও সমাধান নয়। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত বাংলাদেশ যেন এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যেখানে বিদেশে অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি আবার দেশের উন্নয়নে ফিরে আসে। উন্নয়ন অর্থনীতিতে একে ক্রমেই “Brain Circulation” বা মেধার চলমান প্রবাহ হিসেবে দেখা হয়ে থাকে অর্থাৎ, মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজ করবে, কিন্তু তাঁদের জ্ঞান, গবেষণা, বিনিয়োগ এবং অভিজ্ঞতা নিজ দেশের সঙ্গেও যুক্ত থাকবে।

শেষ কথা
বাংলাদেশের সামনে এখন যে প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো আমরা কি আগামী ২৫ বা ৩০ বছরের কথা ভাবছি? আজ যে শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে কাজ করছে, সে হয়তো আগামী দিনের একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী। আজ যে তরুণ প্রকৌশলী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা করছে, সে হয়তো এমন একটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। আজ যে কৃষি গবেষক লবণাক্ততা-সহনশীল ফসল নিয়ে কাজ করছে, তাঁর গবেষণাই হয়তো ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি হবে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাঁদের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছি, যেখানে তাঁরা নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পাশাপাশি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নও দেখতে পারে? ইতিহাস আমাদের একটি বিষয় স্পষ্টভাবে শেখায় যে, যে জাতি তার মেধাকে মূল্য দেয়, গবেষণায় বিনিয়োগ করে এবং উদ্ভাবনকে রাষ্ট্রনীতির অংশ বানায়, দীর্ঘমেয়াদে সেই জাতিই টেকসই উন্নয়ন অর্জন করে। আর যে জাতি তার সেরা মেধাকে হারাতে থাকে, একসময় তাকে অন্যের জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায় শুধু অবকাঠামো, রপ্তানি বা প্রবৃদ্ধির গল্প হবে না। সেটি হবে জ্ঞান, গবেষণা এবং উদ্ভাবনের গল্প।
আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আরও কতজন মেধাবী দেশ ছাড়ল, সেটি নয়।
বরং প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবে, যেখানে একজন মেধাবী তরুণ বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে গর্ব করে বলতে পারে, “অর্জিত জ্ঞান দিয়ে আমি আমার দেশকে এগিয়ে নিতে চাই”?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, আগামী প্রজন্ম একটি প্রযুক্তিনির্ভর, উদ্ভাবনী ও আত্মনির্ভর বাংলাদেশ পাবে, নাকি এমন একটি দেশ পাবে, যা এখনো অন্যের উদ্ভাবনের অপেক্ষায় থাকে। কারণ, একবিংশ শতাব্দীতে একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার প্রাকৃতিক সম্পদে নয়, বরং মানুষের মেধা, জ্ঞান ও উদ্ভাবনী সক্ষমতায় নিহিত।

লেখক, সংগ্রাহক ও গবেষকঃ হক মোঃ ইমদাদুল, জাপান
coinbangla@gmail.com
৬ই জুলাই ২০২৬ই; সোমবার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *