
ইয়ানূর রহমান : যশোরের পুলেরহাটের আদ্-দ্বীন সখিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় এক মাছ ব্যবসায়ীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর। উত্তেজিত স্বজনেরা এ সময় হাসপাতালে বিক্ষোভ করেন ও জুতা নিক্ষেপ করেন।
স্বজনদের দাবি, শার্শার বাগআঁচড়া থেকে জ্বর নিয়ে ইমরান হাসপাতালে এসেছিলেন পরীক্ষা করাতে। অথচ চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা করা বাদ রেখে নিজ উদ্যোগে ইনজেকশন দেন। এরপরই ইমরান অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিছু সময় পর তিনি মারা যান। কিন্তু মৃত ইমরানকে জীবিত বলে আইসিইউতে রাখা হয়। পরে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। বিষয়টি স্বজনেরা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। এ নিয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত হাসপাতালে চরম উত্তেজনা বিরাজ করে। বিক্ষোভে ফেটে পড়েন স্বজনেরা। ভাঙচুরের চেষ্টা চালায় একটি পক্ষ। ইমরানের মা ক্ষুব্ধ হয়ে হাসপাতালের দিকে জুতা নিক্ষেপ করেন। এ সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তোপের মুখে পড়ে। হাসপাতালের পরিচালক ডা. ইমদাদ হোসেন হিমশিম খেয়ে যান পরিস্থিতি সামাল দিতে । পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোতোয়ালি থানার এসআই জাহিদ হাসানের নেতৃত্বে একটি টিম সেখানে যেয়ে দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলে।
স্বজনেরা দাবি করেন, যে চিকিৎসক চিকিৎসা দিয়েছেন তাকে হাজির করতে হবে। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে হাজির করেনি। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর পুলিশের উপস্থিতিতে পরিচালক বলেন, চিকিৎসক আসছেন। কিন্তু ডাক্তাররা আর আসেননি। পরে পরিবারের সদস্যরা কোতোয়ালি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। ইমরান বাগআঁচড়া গাজীপাড়ার শওকত আলী বিশ্বাসের ছেলে। পেশায় তিনি একজন মাছ ব্যবসায়ী ছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ইমরানের সংসারে ১৭ মাস বয়সী একমাত্র ছেলে এলহাম রয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যের আকস্মিক মৃত্যুতে স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর রোগীর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে তাদের যথাযথভাবে অবহিত করা হয়নি। বরং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় গাফিলতি, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ছাড়াই ওষুধ ও ইনজেকশন প্রয়োগ এবং রোগীর অবনতিশীল অবস্থাকে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।
নিহতের খালাতো ভাই ইসমাইল হোসেন বলেন, ভাইকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর কয়েকটি পরীক্ষা দেওয়া হয়। আমাদের বলা হয়েছিল রাত ৯টার দিকে রিপোর্ট পাওয়া যাবে। এরপর একজন সেবিকা কিছু ওষুধের তালিকা দেন। আমরা হাসপাতালের ফার্মেসি ও বাইরের দোকান থেকে ওষুধ সংগ্রহ করি। কিন্তু রোগীর মূল সমস্যা ছিল শ্বাসকষ্ট। আমরা ভেবেছিলাম তাকে দ্রুত অক্সিজেন দেওয়া হবে। পরিবর্তে একের পর এক ইনজেকশন দেওয়া হয়।
তার অভিযোগ, প্রথম ইনজেকশন দেওয়ার পর থেকেই ইমরান অস্বস্তি অনুভব করতে থাকেন। তিনি চিকিৎসাকর্মীদের কাছে কষ্টের কথা জানান এবং পরবর্তী ইনজেকশন না দেওয়ার অনুরোধও করেন। কিন্তু এরপরও তাকে আরও ইনজেকশন দেওয়া হয়।
ইসমাইল হোসেন বলেন, প্রথম ইনজেকশনের পর ভাই বারবার বলছিল, তার খুব কষ্ট হচ্ছে। দ্বিতীয় ইনজেকশনের পর তার মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে শুরু করে। এরপর তৃতীয় ইনজেকশন দেওয়ার কিছুক্ষণ পর সে প্রস্রাব করে দেয় এবং নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তখনই আমরা বুঝতে পারি বড় ধরনের কিছু ঘটেছে।
স্বজনদের আরও দাবি, রোগীর অবস্থার দ্রুত অবনতি হলেও চিকিৎসকরা তা গুরুত্ব সহকারে নেননি। পরে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ইমরান তখনই মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টি আড়াল করার জন্য তাকে কিছু সময় আইসিইউতে রাখা হয় এবং পরে মৃত্যুর ঘোষণা দেওয়া হয়।
এদিকে নিহতের বাবা শওকত আলী বিশ্বাস যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে তার ছেলে ইমরানকে চিকিৎসার জন্য আদ্-দ্বীন হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই স্যালাইনের সঙ্গে এবং হাতে লাগানো ক্যানুলার মাধ্যমে একাধিক ইনজেকশন প্রয়োগ করেন।
অভিযোগপত্রে তিনি দাবি করেন, ইনজেকশন দেওয়ার পরপরই তার ছেলে চিৎকার করতে শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই মারা যান। এরপর মৃত অবস্থায় তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিবারের সদস্যদের কাছে এসে মৃত্যুর খবর জানায়।
শওকত আলী বিশ্বাস অভিযোগ করেন, ভুল চিকিৎসার কারণেই তার ছেলের মৃত্যু হয়েছে। তিনি ঘটনার তদন্তপূর্বক দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনার পর হাসপাতাল চত্বরে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নিহতের স্বজন, প্রতিবেশী এবং স্থানীয় শত শত মানুষ হাসপাতালের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা চিকিৎসকদের উপস্থিত করে ঘটনার ব্যাখ্যা দাবি করেন এবং চিকিৎসা অবহেলার বিচার চান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। অনেকেই হাসপাতালটির চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং স্বাস্থ্য বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত প্রায় ১টার দিকে তারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ৩০ মিনিটের আল্টিমেটাম দেন। তাদের দাবি ছিল, রোগীর চিকিৎসায় জড়িত চিকিৎসকদের সামনে এনে পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে হবে।
এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ডা. ইমদাদ হোসেন বলেন, তাদের কোনো ভুল নেই। নিয়ম অনুযায়ী ইমার্জেন্সিতে ইমরানকে দেখা হয়েছে। এরপর তাকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও দেখেছেন। তবে কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ওসি মাসুম খান বলেন, পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশের একাধিক টিম বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।
এদিকে রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত হাসপাতাল এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছিলেন। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিহতের স্বজনদের বিক্ষোভ চলছিল এবং তারা চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের শাস্তি এবং স্বাস্থ্যসেবায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন।#