👁 119 Views

নেত্রকোনায় ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় কৃষকরা

নেত্রকোনা থেকে এ কে এম আব্দুল্লাহঃ গত কয়েকদিন ধরে অব্যাহত ভারী বৃষ্টিপাত ও ভারতের মেঘালয় রাজ্যে থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলসহ বিভিন্ন নিন্মাঞ্চলে তৈরি হয়েছে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। একদিকে দ্রুত বাড়ছে নদ-নদীর পানি, অন্যদিকে যে কোনো সময় ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে হাওরের বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে কৃষকরা। ফলে বোরে মওসুমের শেষ প্রান্তে এসে কৃষকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গত কয়েকদিন ধরে অব্যাহত ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সোমেশ্বরী, কংস, ধলাই, উব্দাখালীসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশেষ করে সীমান্তবর্তী দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলার পাহাড়ি ঢল নেমে নিম্নাঞ্চলে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। আজ বুধবার বিকাল ৩ টার দিকে কংশ ভূগাই নদীর জারিয়া জান্ঝাইল পয়েন্টে বিপদসীমার ৮৭ সেঃ মিঃ উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে কলমাকান্দা, মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরি উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। হাওরাঞ্চলে এখন বোরো ধান কাটার ভরা মৌসুম। কিন্তু টানা বৃষ্টির কারণে জমিতে জলাবদ্ধতা তৈরী হওয়ায় কৃষকেরা ক্ষেতে মেশিন নামাতে পারছে না। হাওরে শ্রমিক সংকটের কারনে এক এক জন শ্রমিকে রোজ দিতে হচ্ছে ১৫ শত টাকা করে। অধিক টাকা খরচ করে যে সব ধান কাটা হয়েছে, সেগুলোও ঠিকমতো শুকানো যাচ্ছে না। ফলে একদিকে ধানের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে অপরদিকে ন্যায্য বাজার মূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষকরা।
খালিয়াজুরি উপজেলার বল্লী গ্রামের  হাওরপাড়ের কৃষক আবুল মিয়া বলেন, ‘ধান পুড়োপুড়ি পেকেছে। কিন্তু বৃষ্টি থামছে না। বাঁধ ভেঙে গেলে সব শেষ হয়ে যাবে। সারা বছরের একমাত্র ফসল যে কোন সময় পানিতে চলে যেতে পারে।’
রসুলপুর গ্রামের আব্দুর রহমানের কণ্ঠে হতাশা, ‘বাঁধের অবস্থা খুব খারাপ। কয়েক জায়গায় ফাটল ধরেছে। আমরা নিজেরা মাটি ফেলে ঠেকানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু পানি বাড়লে আর ফসল রক্ষা হবে না।’
স্থানীয় কৃষকরা জানান, হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধগুলো অনেক জায়গায় দুর্বল। কোথাও কোথাও ছোট ছোট ফাটল দেখা গেছে আগেই। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব জায়গায় চাপ বাড়ছে, যা বড় ধরনের ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি করছে। অতীতে এমন পরিস্থিতিতে বাঁধ ভেঙে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজার হাজার একর জমির ধান তলিয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। জেলায় ছোট-বড় হাওর আছে ১৩৪টি। আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষায় এ বছর ১৩৮ কিলোমিটার ডুবন্ত অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পাউবো ও উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এসব বাঁধ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৩১ কোটি টাকা। এসব বাঁধের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৪১ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল।
মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গাপুতা হাওরে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকরা ঝুঁকি নিয়েই ধান কাটার কাজে ব্যস্ত। কেউ হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছেন, কেউবা কাটা ধান নৌকায় তুলে উঁচু জায়গায় নিচ্ছেন। আকাশে মেঘ জমলেই কাজের গতি বেড়ে যায় তাদের। ধানক্ষেতে পানি জমে যাওয়ায় ও ডিজেল সংকটে দ্রুত ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।
মোহনগঞ্জ উপজেলার জৈনপুর গ্রামের কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, ‘দিন-রাত এক করে ধান কাটছি। শ্রমিকের মজুরি অনেক বেড়ে গেছে, তবুও লোক পাওয়া যাচ্ছে না। সবাই নিজের জমির ধান কাটতে ব্যস্ত। এর মধ্যে বৃষ্টি হলে বন্ধ হয়ে যায় কাজ।’
কৃষি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, আমরা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। কোথাও যাতে ধান কাটা বিলম্ব না হয়, সে বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে। প্রয়োজনে হারভেস্টারসহ আধুনিক যন্ত্র ব্যবহারেরও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, বিরূপ আবহাওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই কৃষকরা অসহায়।
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। কোথাও কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত মেরামতের চেষ্টা চলছে। তবে হঠাৎ করে পানির চাপ বেড়ে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা মূলত এ মৌসুমের বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। পাশাপাশি উজানেও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, ফলে আরও বেড়ে যেতে পারে নদ-নদীর পানি।
নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু অব্যাহত ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে কৃষকের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের ফসল ঠিকমতো ঘরে তুলতে পারবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। চলতি বোরো মওসুমে জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫ শত ৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। আর ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭ শত ৩২ মেট্রিক টন। সোমবার বিকাল পর্যন্ত ধান কাটা হয়েছে ৬৫ শতাংশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *