👁 383 Views

​ছেলের হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মিথ্যা মামলার আসামি ৮০ বছরের শিক্ষক

মোঃ বুলবুল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টারঃ
সন্তান হারানোর শোক বুকে নিয়ে বিচার পাওয়ার আশায় আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন ৮০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোশাররফ হোসেন মাস্টার। অথচ ন্যায়বিচার তো পানইনি, উল্টো পুত্রশোকে কাতর এই বৃদ্ধ ও তাঁর পরিবারকে হতে হয়েছে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মিথ্যা মামলার আসামি।
​ঘটনাটি ঘটেছে রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের সোনারপাড়া গ্রামে। 
সরেজমিন ঘুরে এবং মামলার কাগজপত্র যাচাই করে জানা যায়, রাধানগর সোনারপাড়ার বাসিন্দা ৮০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোশাররফ হোসেন মাস্টার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সন্তান হারানোর নির্মম যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁর ছেলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ল্যান্স কর্পোরাল মোছাদ্দেক হাসান। দেশের জন্য দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা এই সেনাসদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো হয়রানিমূলক মামলার আসামি হতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন পরিবারটি।
​পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ল্যান্স কর্পোরাল মোছাদ্দেক হাসান প্রায় ১৯ বছর ধরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। শান্তিরক্ষা মিশন শেষ করে দুই মাসের ছুটিতে বাড়িতে আসেন তিনি। গত ২৫ মার্চ (২০২৫) শুক্রবার বাড়ির ইটের দেয়ালে পানি দেওয়ার মতো একটি সাধারণ কাজ করার সময় তাহের, আতিয়ার ও তৈয়বসহ কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর ওপর আচমকা হামলা চালায়।
​অভিযোগ রয়েছে, হামলার সময় মাসুদা ও মজিদা নামের দুই নারী মোছাদ্দেকের চোখে বালি ছিটিয়ে দিলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এই সুযোগে ১ নং আসামী তাহের ছোরা দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করে এবং ৩ নং আসামী তৈয়ব আলী বুকের ওপর বসে গলা টিপে শ্বাসরোধের চেষ্টা করে। মোছাদ্দেকের মৃত্যু নিশ্চিত করতে ৫ নং আসামী মাসুদ আলী ছোরা দিয়ে পুনরায় তাঁর মাথায় গুরুতর কোপ দেয়।
​এ সময় মোছাদ্দেক হাসানকে বাঁচাতে তাঁর ভাতিজা মমিনুল, ছোট ভাই মওদুদ, বড় ভাই মোস্তাক ও ভাতিজা আমিনুল এগিয়ে এলে তাঁদেরকেও নির্মমভাবে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। আসামীদের হামলায় ভাতিজা মমিনুলের বাম পায়ের হাঁটু ভাঙাসহ সবাই গুরুতর আহত হন। চিৎকার শুনে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে আহতদের উদ্ধার করে বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। মোছাদ্দেক হাসানের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে প্রথমে রংপুর সিএমএইচ এবং পরে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা সিএমএইচে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৯ মার্চ তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
​এ ঘটনায় বদরগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা (মামলা নং-৭২/২৫) দায়ের করা হয়। তবে নিহতের পরিবারের দাবি, এই হত্যা মামলাকে ভিন্ন খাতে মোড় নিতে এবং আসল ঘটনা ধামাচাপা দিতে আসামিপক্ষ পরিকল্পিতভাবে নিহত সেনাসদস্যের বাবা মোশাররফ হোসেন মাস্টার ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মিথ্যা সিআর-১৫৮/২৫ মামলা দায়ের করে।
​পুত্রশোকে ভেঙে পড়া মোশাররফ হোসেন মাস্টার আক্ষেপ করে বলেন, “আমি চেয়েছিলাম আমার ছেলের হত্যার বিচার। কিন্তু আজ আমাকে এবং আমার পরিবারকেই আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। শেষ বয়সে পিতার কাঁধে সন্তানের লাশের চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে? ছেলের হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে যদি নিজেকেই আসামি হতে হয়, তবে এটা কেমন বিচারব্যবস্থা?”
​এদিকে মোশাররফ হোসেন মাস্টারের পরিবারের বিরুদ্ধে করা মামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন এলাকাবাসী। স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল লতিফ, সাবেক ইউপি সদস্য সাহেদুল হক, আনিছুল হকসহ এলাকার প্রায় ৩০০ মানুষ মিথ্যা সিআর-১৫৮/২৫ মামলার বিরুদ্ধে একাত্মতা প্রকাশ করে গণস্বাক্ষর করেছেন।
​আজমল হক, বাবলু হক, আব্দুল আজিজসহ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মোশাররফ হোসেন মাস্টার ও তাঁর তিন ছেলে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে বসবাস করছেন। ঘটনার দিন বা পরবর্তীতে সেখানে কোনো লুটপাট বা অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেনি। আতিয়ার রহমান (৭২/২৫ নম্বর হত্যা মামলার ২ নম্বর আসামী) মূল ঘটনা ধামাচাপা দিতেই এই ভিত্তিহীন সিআর-১৫৮/২৫ নম্বর মামলাটি করেছেন।
​স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, মিথ্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে না গিয়ে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য না নিয়েই একপেশে তদন্ত করেছেন। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান এবং প্রয়োজনে আদালতে গিয়ে সত্য সাক্ষ্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
​একজন সেনাসদস্যকে হত্যার পর দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া এবং উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারকে হয়রানি করার ঘটনায় ক্ষোভ ফুঁসে উঠছে এলাকায়।
 এলাকাবাসীর স্পষ্ট দাবি—ল্যান্স কর্পোরাল মোছাদ্দেক হাসান হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করে প্রকৃত দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হোক এবং নিঃশর্তভাবে পরিবারটির বিরুদ্ধে করা মিথ্যা সিআর-১৫৮/২৫ মামলাটি প্রত্যাহার করা হোক।