👁 398 Views

জনসংখ্যা নয়, সুস্থ, দক্ষ ও কর্মক্ষম প্রজন্মই সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি

প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের এই সময়ে শিক্ষা, দক্ষতা ও শারীরিক সক্ষমতার সমন্বয়ই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জনশক্তির শক্তি
একটি দেশের উন্নয়ন আমরা সাধারণত কিছু দৃশ্যমান সূচকের মাধ্যমে বিচার করি—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, রাস্তাঘাট, সেতু, শিল্পকারখানা, প্রযুক্তির ব্যবহার কিংবা শিক্ষার বিস্তার। এসব নিঃসন্দেহে উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। কিন্তু একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা পেতে হলে শুধু তার বর্তমান অবকাঠামো, অর্থনীতি কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির দিকে তাকালে হয় না; তাকাতে হয় তার শিশু ও তরুণদের দিকে। তারা কীভাবে বেড়ে উঠছে, কী খাচ্ছে, কতটা শারীরিকভাবে সক্রিয়, কীভাবে অবসর কাটাচ্ছে, প্রযুক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করছে এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য কতটা প্রস্তুত হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তরেই অনেকটা লুকিয়ে আছে আগামী বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র।

এই উপলব্ধিটি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার কাছে আরও স্পষ্ট হয়েছে। প্রায় পাঁচ দশক আগে আমার নিজের শৈশবের দিকে তাকালে বর্তমান সময়ের সঙ্গে একটি বড় পার্থক্য চোখে পড়ে। সেই পার্থক্যকে অবশ্য ‘আগে ভালো ছিল, এখন খারাপ’—এই সরল ব্যাখ্যায় দেখার সুযোগ নেই। সময় বদলেছে, জীবনযাত্রা বদলেছে, মানুষের সুযোগ বেড়েছে, প্রযুক্তি এসেছে এবং পৃথিবী মানুষের হাতের নাগালে চলে এসেছে। আমাদের প্রজন্ম যে অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে বড় হয়েছে, সেটিও অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এমন কিছু নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেগুলোকে এখন গুরুত্ব দিয়ে না দেখলে আগামী দিনে আমাদের উন্নয়নের হিসাবটি অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার সঙ্গে শিক্ষা, দক্ষতা, শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক সুস্থতার ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা যায়, সেটি এখন শুধু পরিবার বা ব্যক্তির বিষয় নয়; এটি জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

যুদ্ধের সময়ের শৈশব থেকে আজকের ডিজিটাল শৈশব
১৯৭১ সালে আমি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। পূর্ব পাকিস্তান তখন মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে। চারদিকে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক, অভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের অজানা শঙ্কা। নিয়মিত তিন বেলা মাছ-ভাত পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে উঠত। আমাদের বাড়িটি ছিল সাত পরিবারের একটি বড় যৌথ পরিবার। বড় জেঠা বাড়িতে থাকতেন; অন্যরা যুদ্ধ, চাকরি কিংবা জীবিকার প্রয়োজনে শহরে থাকতেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৪৭ জন মানুষের বসবাস ছিল সেই বাড়িতে।

আমার জেঠাতো ভাই মাহফুজ, দুলাল, জেঠাতো বোন নাসিমা ও শেলী—আমরা ছিলাম প্রায় সমবয়সী। আমাদের শৈশবের বিনোদনের জন্য আলাদা কোনো আয়োজন ছিল না। জীবনই ছিল আমাদের বিনোদন। কখনো মাছ ধরতে যেতাম, কখনো শালুক-শাপলা তুলতাম, কখনো কচুর ঘাটি সংগ্রহ করতাম। গ্রীষ্মের বিকেলে স্কুলের ফাঁকে ডাংগুলি, দাঁড়িয়াবান্ধা, কুতকুত, মার্বেল কিংবা কাবাডি খেলতাম। বর্ষাকালে ঘরে বসে লুডু বা দাবা খেলতাম। কখনো কয়েকটি সিমের বিচি হাতে নিয়ে জোড়-বিজোড় খেলায় মেতে উঠতাম। আমাদের তখন স্মার্টফোন ছিল না, ভিডিও গেম ছিল না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আমাদের জীবন আদর্শ ছিল। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও নানা সীমাবদ্ধতা ছিল সেই জীবনের বাস্তবতা। সেই কষ্ট, সেই অভাব কিংবা সেই অনিশ্চয়তা আমরা কোনোভাবেই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কামনা করি না। বরং আমরা চাই আমাদের সন্তানরা আমাদের চেয়ে অনেক ভালো জীবন পাক। তবে সেই কঠিন জীবনের মধ্যেও এমন একটি বিষয় ছিল, যা আজকের জীবন থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে—শরীরকে স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করার অভ্যাস।

আমরা আলাদা করে ব্যায়াম করতাম না, কারণ হাঁটা, দৌড়ানো, খেলাধুলা, সাঁতার, মাঠে ছুটে বেড়ানো কিংবা পারিবারিক ও কৃষিজীবনের নানা কাজে অংশ নেওয়ার মধ্যেই শরীর সক্রিয় থাকত। তখন ‘ফিটনেস’ শব্দটি হয়তো আমরা জানতাম না, কিন্তু জীবন নিজেই আমাদের শিখিয়ে দিত যে শরীরকে সচল রাখার জন্য আলাদা কোনো বিলাসী আয়োজনের প্রয়োজন নেই। আমাদের দৈনন্দিন জীবনই ছিল এক ধরনের স্বাভাবিক শারীরিক অনুশীলন।

আজকের প্রজন্মের সামনে সেই বাস্তবতা নেই, আর থাকাও উচিত নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা সেই জীবন থেকে কী শিখতে পারি? উত্তরটি অতীতে ফিরে যাওয়ার মধ্যে নয়; বরং অতীতের কিছু সুস্থ অভ্যাসকে বর্তমানের আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা যায়, তার মধ্যে।

উন্নত জীবনযাত্রার সঙ্গে বাড়ছে নিষ্ক্রিয়তা
আজকের পৃথিবী নিঃসন্দেহে আমাদের সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধাজনক। একটি স্মার্টফোনের মাধ্যমে বিশ্বের বিপুল জ্ঞান মানুষের হাতে চলে এসেছে। অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল ব্যাংকিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক চিকিৎসা, দ্রুত যোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার মানুষের জীবনকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে, যা কয়েক দশক আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল। তাই প্রযুক্তিকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর কোনো যুক্তি নেই। আগামী বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, শিল্প ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে প্রযুক্তি আরও গভীরভাবে যুক্ত হবে এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছাড়া ভবিষ্যৎ কর্মবাজারে টিকে থাকাও কঠিন হবে।

সমস্যা প্রযুক্তির অস্তিত্বে নয়; সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন প্রযুক্তি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন, চলাফেরা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার জায়গা দখল করতে শুরু করে। একটি শিশু যদি পড়াশোনা, খেলাধুলা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, ঘুম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজের বাইরে দিনের বড় অংশ স্ক্রিনে কাটায়, তাহলে তার জীবনযাত্রায় ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একইভাবে একজন তরুণ যদি যাতায়াত, কাজ ও অবসরের প্রায় পুরো সময়টাই বসে কাটায়, তাহলে শরীরের স্বাভাবিক সক্রিয়তা কমে যায়। প্রযুক্তি আমাদের সময় বাঁচাচ্ছে, পরিশ্রম কমাচ্ছে এবং কাজকে সহজ করছে—এটি নিঃসন্দেহে ভালো; কিন্তু সেই বাঁচানো সময় যদি শেষ পর্যন্ত আরও বেশি বসে থাকা, আরও বেশি স্ক্রিনে থাকা এবং আরও কম শারীরিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়, তাহলে সুবিধার সঙ্গে নতুন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাকে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করছে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৩১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৮১ শতাংশ কিশোর-কিশোরী প্রয়োজনীয় মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ড করে না। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার সঙ্গে হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, কিছু ক্যানসার এবং বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের জন্য WHO প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৬০ মিনিট মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুপারিশ করেছে। ফলে খেলাধুলাকে শুধু বিনোদন কিংবা অবসর কাটানোর উপায় হিসেবে দেখলে বিষয়টির গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হয়; এটি সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতা ধরে রাখারও অংশ।

বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা
বিশ্বের এই প্রবণতা বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক। WHO-নেতৃত্বাধীন একটি বড় গবেষণায় ২০০১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ১৪৬ দেশের প্রায় ১৬ লাখ স্কুলগামী কিশোর-কিশোরীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কিশোর-কিশোরী প্রয়োজনীয় মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ড করছিল না। মেয়েদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল আরও উদ্বেগজনক।

অবশ্যই মনে রাখতে হবে, এটি ২০১৬ সালের তথ্য; তাই এটিকে আজকের বাংলাদেশের হুবহু চিত্র বলা যাবে না। কিন্তু একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বোঝার ক্ষেত্রে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের জীবন ক্রমেই শহরমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বসে থাকার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। শহরের আবাসিক এলাকায় খেলার মাঠের সংকট, নিরাপদে হাঁটা বা সাইকেল চালানোর সুযোগের অভাব, শিক্ষাজীবনের অতিরিক্ত চাপ এবং বিনোদনের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল নির্ভরতা—সব মিলিয়ে শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক কর্মকাণ্ডের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে।

তবে বিষয়টিকে শহর-গ্রামের সরল বিভাজনে দেখাও ঠিক হবে না। গ্রামের সব শিশু সক্রিয় আর শহরের সব শিশু নিষ্ক্রিয়—বাস্তবতা এত সরল নয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক শ্রেণিতে শারীরিক কর্মকাণ্ড, খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির সমস্যা ভিন্ন ভিন্ন রূপে দেখা যাচ্ছে। কোথাও এখনও অপুষ্টি বড় সমস্যা, কোথাও আবার অতিরিক্ত ক্যালরি ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা নতুন সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

অপুষ্টি থেকে অতিপুষ্টি—পরিবর্তিত চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ একসময় প্রধানত খাদ্য ও অপুষ্টির সমস্যার সঙ্গে লড়েছে। সেই সমস্যা এখনও শেষ হয়নি। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের সামনে আরেকটি বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে—অতিরিক্ত ক্যালরি, প্রক্রিয়াজাত খাবার, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা।

UNICEF Bangladesh-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের শিশুদের মধ্যে Stunting ও Wasting-এর মতো অপুষ্টির সমস্যা এখনও রয়েছে; একই সঙ্গে শিশু ও কিশোরদের অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতাও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে। অর্থাৎ আমাদের পুষ্টি-চ্যালেঞ্জ এখন আর কেবল ‘খাবার নেই’—এই একমাত্র সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্ন এখন খাবারের পরিমাণের পাশাপাশি তার গুণগত মান, পুষ্টিমান, খাদ্যাভ্যাস এবং সেই খাবারের সঙ্গে শরীর কতটা সক্রিয় থাকছে—এসব নিয়েও।

এখানেই পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে শুধু বেশি খাওয়ানোকে যত্নের প্রমাণ হিসেবে দেখলে হবে না; কী খাচ্ছে, কতটা খাচ্ছে, কখন খাচ্ছে এবং তার জীবনযাত্রা কতটা সক্রিয়—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। একটি শিশু পর্যাপ্ত খাবার পেলেই যে সুস্থ থাকবে, এমন নয়; তার প্রয়োজন সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম, শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন।

সার্টিফিকেটের সঙ্গে প্রয়োজন বাস্তব কর্মক্ষমতা
বাংলাদেশ শিক্ষার বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। আজকের তরুণ প্রজন্ম আমাদের প্রজন্মের তুলনায় বেশি শিক্ষিত, প্রযুক্তিতে বেশি অভ্যস্ত এবং বিশ্বের সঙ্গে অনেক বেশি সংযুক্ত। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের একটি বড় অর্জন। কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য তখনই তৈরি হয়, যখন তা দক্ষতা, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত হয়।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করলেও নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে প্রায় ৮৭ লাখ। একই সঙ্গে তরুণদের দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল কাজের সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই বাস্তবতা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। আমরা কতজন তরুণকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ দিতে পারছি, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সেই শিক্ষা দিয়ে তারা বাস্তবে কী করতে পারছে। একজন শিক্ষিত তরুণ যদি বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে না পারে, কর্মক্ষেত্রের চাপ সামলাতে না পারে, দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পারে কিংবা দীর্ঘমেয়াদি কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় শৃঙ্খলা ও স্বাস্থ্য ধরে রাখতে না পারে, তাহলে শুধু সার্টিফিকেট দিয়ে তার পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব নয়।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য তাই শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল কিংবা সনদ অর্জন হওয়া উচিত নয়। শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং সুস্থ জীবনযাপনের অভ্যাসকেও যুক্ত করতে হবে। কারণ আগামী দিনের কর্মক্ষেত্রে শুধু জ্ঞান থাকা যথেষ্ট হবে না; সেই জ্ঞানকে কাজে লাগানোর সক্ষমতাও থাকতে হবে।

জনসংখ্যা বড় হলেই জনশক্তি বড় হয় না
বাংলাদেশের সামনে যে বড় সুযোগটি রয়েছে, তার নাম Demographic Dividend বা জনমিতিক লভ্যাংশ। কর্মক্ষম বয়সী মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলে একটি দেশ দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ পায়। কিন্তু এই সুযোগ কোনোভাবেই স্বয়ংক্রিয় নয়।

কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছানো মানেই কর্মক্ষম জনশক্তি হওয়া নয়। একজন তরুণের বয়স ২০ বা ২৫ হলেই সে দেশের অর্থনীতির জন্য প্রস্তুত হয়ে যায় না। তাকে শিক্ষিত হতে হবে, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে হবে, শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, তার জন্য উৎপাদনশীল কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

এই কারণে জনমিতিক লভ্যাংশকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে শিক্ষা, দক্ষতা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও কর্মসংস্থানকে আলাদা আলাদা খাত হিসেবে দেখলে হবে না। এগুলো পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একটি শিক্ষিত কিন্তু অসুস্থ জনগোষ্ঠী যেমন তার পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারবে না, তেমনি একটি সুস্থ কিন্তু অদক্ষ জনগোষ্ঠীও আধুনিক অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনশীলতা অর্জন করতে পারবে না।

তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের প্রশ্ন শুধু ‘জনসংখ্যা কত হবে’—এটি হওয়া উচিত নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, এই বিপুল জনগোষ্ঠীর কত অংশকে আমরা সুস্থ, শিক্ষিত, দক্ষ, কর্মক্ষম এবং উৎপাদনশীল জনশক্তিতে পরিণত করতে পারব।

শরীরকে মানবসম্পদ উন্নয়নের বাইরে রাখা যাবে না
আমাদের জাতীয় পরিকল্পনায় মানবসম্পদ বলতে আমরা সাধারণত শিক্ষা ও দক্ষতাকে বুঝি। শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাকে অনেক সময় আলাদা বিষয় হিসেবে দেখা হয়। অথচ একজন মানুষের কর্মক্ষমতা তার শরীর ও মনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।

নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড শুধু শরীরের জন্য নয়; মানসিক সুস্থতা এবং সামগ্রিক জীবনমানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। একজন তরুণের যদি ভালো শিক্ষা থাকে, প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকে, কিন্তু দীর্ঘ সময় কাজ করার মতো শারীরিক সক্ষমতা না থাকে, অথবা মানসিক চাপ সামলানোর মতো সুস্থ জীবনযাপনের অভ্যাস না থাকে, তাহলে তার দক্ষতার পূর্ণ অর্থনৈতিক মূল্যও পাওয়া যাবে না। এ কারণেই ভবিষ্যতের কর্মী তৈরির অর্থ শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়। তাকে এমন জীবনযাপনের অভ্যাসও দিতে হবে, যা দীর্ঘ কর্মজীবনের চাপ সামলানোর জন্য উপযোগী। শরীর তাই মানবসম্পদের বাইরে কোনো আলাদা বিষয় নয়; শরীরও মানবসম্পদেরই অংশ।

সমাধান অতীতে ফিরে যাওয়া নয়
এই সমস্যার সমাধানের জন্য আমাদের অতীতে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন অতীতের কিছু ভালো অভ্যাসকে আধুনিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা। স্কুলে শারীরিক শিক্ষাকে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে এনে গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুদের নিয়মিত মাঠে খেলার সুযোগ দিতে হবে। কাবাডি, ফুটবল, ক্রিকেট, সাঁতার, দৌড়, সাইক্লিং কিংবা বয়স ও পরিবেশ উপযোগী অন্যান্য খেলাধুলাকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। শহরে মাঠের সংকট থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে ছোট খেলার মাঠ, হাঁটার জায়গা ও কমিউনিটি স্পোর্টসের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একটি শহর শুধু বড় রাস্তা, উঁচু ভবন ও শপিংমল দিয়ে বাসযোগ্য হয় না; শিশুদের দৌড়ানোর জায়গা আছে কি না, মানুষ নিরাপদে হাঁটতে পারে কি না—সেটিও একটি উন্নত শহরের মানদণ্ড হওয়া উচিত। জিম অবশ্যই একটি বিকল্প হতে পারে, কিন্তু সেটিই একমাত্র সমাধান নয়। হাঁটা, সাইকেল চালানো, সিঁড়ি ব্যবহার করা এবং দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন শারীরিক কর্মকাণ্ডও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার জন্য সবার ব্যয়বহুল জিমে যাওয়ার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন এমন একটি জীবনযাপন, যেখানে শরীরকে প্রতিদিন কিছুটা হলেও কাজে লাগানো হয়।

পরিবারেও পরিবর্তন দরকার। শিশুর হাতে ডিভাইস তুলে দিয়ে বাবা-মা নিজেরা যদি সারাক্ষণ স্ক্রিনে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে শুধু শিশুকে ফোন কম ব্যবহার করতে বলা খুব একটা কার্যকর হবে না। খাবারের সময় ফোন দূরে রাখা, ঘুমের আগে স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস কমানো, পরিবারের জন্য কিছুটা Device-free সময় নির্ধারণ করা এবং প্রতিদিন কিছু সময় হাঁটা বা খেলাধুলার অভ্যাস পরিবার থেকেই শুরু করা সম্ভব। শিশুকে যে জীবন শেখাতে চাই, বড়দেরও তার কিছুটা বাস্তবে পালন করতে হবে।

প্রযুক্তিকে অস্বীকার নয়, নিয়ন্ত্রণে রাখা
আগামী দিনের বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, ডিজিটাল যোগাযোগ, অটোমেশন ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অপরিহার্য হবে। আমাদের সন্তানদের এই পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করতে হবে। প্রযুক্তি থেকে তাদের দূরে রাখার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। বরং প্রযুক্তিকে কীভাবে শেখার, সৃষ্টিশীলতার, যোগাযোগের এবং উৎপাদনশীলতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায়, সেটিই শেখাতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের এমন শরীর ও মনও তৈরি করতে হবে, যা সেই প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীর চাপ বহন করতে পারে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা কম্পিউটার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করতে জানে, কিন্তু বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করে, কিন্তু প্রযুক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল নয়; যারা সার্টিফিকেট অর্জন করে, কিন্তু বাস্তব দক্ষতাও অর্জন করে; যারা কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করতে পারে, আবার নিজের স্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতার প্রতিও দায়িত্বশীল থাকে।

প্রযুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কোনো সমাধান নয়; বরং সময়ের বাস্তবতাকে অস্বীকার করা। প্রয়োজন প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করা নয়, বরং মানুষের প্রয়োজন ও সক্ষমতার সঙ্গে প্রযুক্তির একটি স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য তৈরি করা। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে আরও সহজ, দ্রুত ও দক্ষ করে তুলবে—এটাই তার উদ্দেশ্য। কিন্তু সেই সহজতার বিনিময়ে যদি আমরা শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয়, মানসিকভাবে নির্ভরশীল এবং জীবনযাপনে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ি, তাহলে প্রযুক্তির অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত আমাদের জন্য কতটা কল্যাণ বয়ে আনবে, সেই প্রশ্নটিও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করবে, কিন্তু মানুষকে যেন প্রযুক্তিনির্ভর ও দুর্বল করে না ফেলে—সেটিই হতে হবে আমাদের মূল লক্ষ্য।

এখনই সময় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে নতুন করে ভাবার
আমাদের প্রজন্মের জীবন ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। আমরা চাই আমাদের সন্তানরা আমাদের চেয়ে ভালো থাকুক, উন্নত শিক্ষা পাক, উন্নত চিকিৎসা পাক, প্রযুক্তির সুযোগ পাক এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করুক। কিন্তু উন্নত জীবন যেন কেবল বেশি আরাম ও কম পরিশ্রমের জীবনে পরিণত না হয়। কারণ এমন উন্নয়ন যদি মানুষের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়, তাহলে তার মূল্য একসময় স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা এবং জীবনমানের ওপর পড়তে পারে।

বাংলাদেশের সামনে এখনও একটি বড় সুযোগ আছে। আমাদের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক শক্তির প্রধান ভিত্তি হতে পারে। কিন্তু সেই জনগোষ্ঠীকে শুধু সংখ্যায় বড় রাখলেই হবে না; তাদের সুস্থ, শিক্ষিত, দক্ষ, কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল করে তুলতে হবে। শিক্ষা যদি দক্ষতায় রূপান্তরিত না হয়, দক্ষতা যদি কর্মসংস্থানে পৌঁছাতে না পারে, আর কর্মসংস্থানে থাকা মানুষ যদি দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ ও কর্মক্ষম না থাকে, তাহলে জনমিতিক লভ্যাংশের সম্ভাবনাও পূর্ণ মাত্রায় কাজে লাগানো সম্ভব হবে না।

একসময় কয়েকটি সিমের বিচি হাতে নিয়ে আমরা জোড়-বিজোড় খেলতাম, কাবাডির মাঠে ছুটতাম, শালুক-শাপলা তুলতে পানিতে নামতাম। সেই জীবন ছিল কঠিন, কিন্তু শরীর, প্রকৃতি ও বাস্তব জীবনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল গভীর। আজকের শিশুর হাতে সেই পৃথিবীর বদলে এসেছে সম্পূর্ণ নতুন এক পৃথিবী—ডিজিটাল, দ্রুত এবং অসীম সম্ভাবনাময়। আমাদের দায়িত্ব পুরোনো পৃথিবী ফিরিয়ে আনা নয়; বরং সেই পুরোনো জীবনের সুস্থ অভ্যাস এবং নতুন পৃথিবীর প্রযুক্তিগত সম্ভাবনাকে একসঙ্গে নিয়ে চলা। শিশুর হাতে প্রযুক্তি থাকবে, কিন্তু মাঠও থাকবে। বই থাকবে, কিন্তু খেলাধুলার সুযোগও থাকবে। সার্টিফিকেট থাকবে, কিন্তু বাস্তব দক্ষতাও থাকবে। উন্নত জীবন থাকবে, কিন্তু সেই জীবনের সঙ্গে সুস্থ শরীর, স্থির মন এবং দায়িত্বশীল জীবনযাপনের অভ্যাসও থাকবে।

কারণ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কত বড় হবে, তা শুধু আমরা কতজন মানুষ—এতে নির্ধারিত হবে না; নির্ধারিত হবে আমাদের মানুষগুলো কতটা সুস্থ, দক্ষ, কর্মক্ষম ও সৃজনশীল হয়ে উঠতে পারছে তার ওপর। একটি দেশের জনসংখ্যা তখনই প্রকৃত জনশক্তিতে পরিণত হয়, যখন সেই জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, দক্ষতা, স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা একে অন্যকে শক্তিশালী করে। সেই কারণে আগামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ শুধু অবকাঠামোতে নয়, প্রযুক্তিতেও নয়, এমনকি শুধু শিক্ষাতেও নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হলো মানুষের ওপর—এমন একটি প্রজন্মের ওপর, যারা জ্ঞানকে দক্ষতায়, দক্ষতাকে উৎপাদনশীলতায় এবং সুস্থ শরীর ও মনকে দীর্ঘ কর্মক্ষম জীবনে রূপান্তর করতে পারবে।

আমাদের সন্তানদের হাতে আমরা যে বাংলাদেশ তুলে দিতে চাই, সেই বাংলাদেশ শুধু প্রযুক্তিতে উন্নত হলেই হবে না; তাকে মানুষের দিক থেকেও শক্তিশালী হতে হবে। আর সেই শক্তির ভিত্তি তৈরি হবে আজকের শিশুদের শিক্ষা, খাদ্যাভ্যাস, খেলাধুলা, প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরন, পারিবারিক পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে।
আজকের শিশু শুধু আগামী দিনের নাগরিক নয়; সে আগামী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তি। তাই তাদের সুস্থতা, শিক্ষা ও দক্ষতার প্রতি বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। আর সেই বিনিয়োগের সময়টা ভবিষ্যতে নয়, এখনই।

লেখক, সংগ্রাহক ও গবেষকঃ হক মোঃ ইমদাদুল, জাপান
coinbangla@gmail.com
৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ইং, রবিবার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *