👁 510 Views

পবিত্র মুহাররম ও আশুরা: ঐতিহাসিক ক্রান্তিকাল এবং উম্মাহর করণীয়

                                    লেখক : মুহাম্মদ রাশেদ খান 

ভূমিকা: 
ইসলামি বর্ষপঞ্জি বা হিজরি সনের রাজকীয় সূচনা ঘটে পবিত্র মুহাররম মাসের মাধ্যমে। এটি কেবল একটি নতুন বছরের প্রথম মাসই নয়, বরং মহান আল্লাহ তায়ালার ঘোষিত ‘আশহুরে হুরুম’ বা পরম সম্মানিত চার মাসের অন্যতম একটি। পরিচ্ছন্ন আধ্যাত্মিক জীবন গঠন, ইবাদতের স্পৃহা বৃদ্ধি এবং অতীত জীবনের পাপ পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হওয়ার এক অনন্য বার্তা নিয়ে এই মাসটি প্রতিবছর মুসলিম উম্মাহর দ্বারে ফিরে আসে। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্য অনুযায়ী, এ মাসের প্রতিটি দিনই বরকতময়, বিশেষ করে এর দশম দিন তথা ‘আশুরা’র রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ও দীর্ঘ ঐতিহাসিক পটভূমি। একজন প্রকৃত মুমিনের জীবনে মুহাররম মাসটি অন্যায়-অসৎ পথ পরিহার করে সত্য, ন্যায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে নতুন করে পথচলার এক মহা অনুপ্রেরণা।
মুহাররম মাস ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং এটি আল্লাহ তায়ালার কাছে অত্যন্ত সম্মানিত ও পবিত্র চার মাসের একটি। পবিত্র কুরআনের ভাষায় একে ‘আরবাআতুন হুরুম’ বা চার সম্মানিত মাস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। একজন মুমিনের আত্মিক উন্নয়ন, গুনাহ মাফ এবং নতুন বছরের ইবাদতের সূচনা করার জন্য এই মাসটি এক অনন্য সুযোগ। নিচে মুহাররম মাসের ঐতিহাসিক পটভূমি, ফজিলত এবং কুরআন ও হাদিসের আলোক নির্দেশিত গুরুত্বপূর্ণ আমলসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. মুহাররম মাসের ঐতিহাসিক পটভূমি:
পবিত্র ইসলামি ইতিহাসে মুহাররম মাস, বিশেষ করে এর দশম দিন বা ‘আশুরা’ নানা তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার স্মারক।
ক)
মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলের মুক্তিআশুরার সবচেয়ে প্রামাণ্য ও প্রাচীন ঐতিহাসিক ভিত্তি হলো এই দিনে মহান আল্লাহ ফেরাউনের অত্যাচার থেকে আল্লাহর নবী হযরত মুসা (আ.) এবং তাঁর সম্প্রদায় বনি ইসরাইলকে অলৌকিকভাবে উদ্ধার করেছিলেন। অন্যদিকে দাম্ভিক ফেরাউন ও তার বিশাল বাহিনীকে লোহিত সাগরে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন।হাদিসের বিখ্যাত গ্রন্থ সহীহ বুখারীতে এসেছে:হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় আগমন করলেন, তখন দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখছে। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটি কোন দিন যাতে তোমরা রোজা রাখছ?’ তারা বলল, ‘এটি এমন একটি মহান দিন, যেদিন আল্লাহ মুসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার দলকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। তাই মুসা (আ.) শুকরিয়াস্বরূপ এ দিনে রোজা রেখেছিলেন, এজন্য আমরাও রোজা রাখি।’ তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তোমাদের চেয়ে আমরা মুসা (আ.)-এর অধিক হকদার ও নিকটবর্তী।’ অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে রোজা রাখলেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। (সহীহ বুখারী, হাদিস: ২০০৬)
খ)
কারবালার মর্মান্তিক বিয়োগান্তক ঘটনা৬১ হিজরির ১০ই মুহাররম ইরাকের কারবালা প্রান্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত হুসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা ইয়াজিদের বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন। অন্যায়, জুলুম ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সত্য ও ইনসাফের পক্ষে মাথা নত না করার এক চিরন্তন প্রতীকী শিক্ষা দিয়ে গেছে এই কারবালার ঘটনা। তবে মনে রাখা জরুরি, কারবালার ঘটনার বহু আগে থেকেই ইসলামে মুহাররম ও আশুরার দিনটি সম্মানিত ও ফজিলতপূর্ণ ছিল।
২. পবিত্র কুরআনে মুহাররম মাসের মর্যাদা:
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বছরের ১২ মাসের মধ্যে ৪টি মাসকে বিশেষভাবে সম্মানিত ঘোষণা করেছেন, যার অন্যতম হলো এই মুহাররম। ইরশাদ হয়েছে:”নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারোটি, যেদিন তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। তার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত দীন। সুতরাং তোমরা এই মাসগুলোতে নিজেদের প্রতি জুলুম করো না…” (সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৩৬)
মুফাসসিরগণের মতে, এই সম্মানিত চার মাসে যেকোনো পাপ কাজের ভয়াবহতা যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি নেক আমলের সওয়াব ও গুরুত্বও বহুগুণ বেড়ে যায়।
৩. মুহাররম মাসে মুমিনের করণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ আমল:
হাদিসের আলোকে মুহাররম মাসে একজন মুমিনের প্রধান আমলগুলো নিম্নরূপ:
ক)
বেশি বেশি নফল রোজা রাখারমজানের পর বছরের অন্য যেকোনো মাসের চেয়ে মুহাররম মাসে রোজা রাখার ফজিলত সবচেয়ে বেশি। আল্লাহর রাসূল (সা.) এই মাসটিকে বিশেষায়িত করে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “রমজানের পর সবচেয়ে উত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)
খ)
আশুরার বিশেষ রোজা পালন (১০ই মুহাররম)মুহাররম মাসের ১০ তারিখ তথা আশুরার দিনের রোজার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। এক দিনের এই রোজা বান্দার পূর্ববর্তী এক বছরের সগিরা গুনাহ মাফ করে দেয়।রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন: “আমি আশা করি আল্লাহর কাছে যে, এটি বিগত এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবে।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)
গ)
ইহুদিদের সাথে বৈসাদৃশ্য রক্ষার্থে জোড়া রোজা রাখাইহুদিরা শুধু ১০ই মুহাররম একক একটি রোজা রাখত। রাসূলুল্লাহ (সা.) মুসলিম উম্মাহকে তাদের ইবাদতের রীতির সাথে হুবহু মিল না রেখে বৈচিত্র্য আনার জন্য আশুরার রোজার সাথে আগে বা পরে আরও একটি রোজা মিলিয়ে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যদি আমি আগামী বছর বেঁচে থাকি, তবে অবশ্যই ৯ তারিখেও রোজা রাখব।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩৪)
রোজা রাখার সুন্নাহ পদ্ধতি:
সবচেয়ে উত্তম:
মুহাররমের ৯ ও ১০ তারিখ (অথবা ১০ ও ১১ তারিখ) মিলিয়ে দুটি রোজা রাখা।আরও উত্তম: ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)-এর মতে, কেউ চাইলে ৯, ১০ ও ১১ তারিখ—এই তিন দিনই রোজা রাখতে পারেন।
ঘ)
তওবা, ইস্তিগফার ও পাপ বর্জন করাযেহেতু আল্লাহ তায়ালা এই মাসগুলোতে নিজেদের উপর জুলুম বা পাপ করতে নিষেধ করেছেন, তাই প্রথম কাজ হলো সব ধরনের গুনাহ খাতা থেকে নিজেকে দূরে রাখা। অতীত জীবনের ভুলত্রুটির জন্য আল্লাহর দরবারে বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা (ইস্তিগফার) করা এই মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল।
৪. বর্জনীয় ও কুসংস্কার:
হাদিস ও সাহাবিদের আমল দ্বারা মুহাররম মাসে শুধুমাত্র রোজা ও ইবাদতের প্রমাণ পাওয়া যায়। বর্তমানে সমাজে আশুরাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত কিছু অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড ও কুসংস্কার থেকে মুমিনদের সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে:কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাজিয়া মিছিল করা, বুক চাপড়ানো বা মাতম করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ。
এই দিন উপলক্ষে বিশেষ নিয়মে গোসল করা, সুরমা বা মেহেদি লাগানো, কিংবা খিচুড়ি রান্না করে উৎসবের আমেজ তৈরি করার সুনির্দিষ্ট কোনো বিধান ইসলামে নেই।
উপসংহার:
মুহাররম মাস মুমিনের জন্য ইবাদতের বসন্তকাল এবং আধ্যাত্মিক নবায়নের মাস। হযরত মুসা (আ.)-এর মুক্তি এবং কারবালার চেতনা—উভয়ই আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা রাখার শিক্ষা দেয়। সুতরাং, মনগড়া কুসংস্কার বর্জন করে বিশুদ্ধ সুন্নাহর আলোকে রোজা ও নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করাই হোক প্রতিটি মুমিনের প্রধান লক্ষ্য।
লেখক 
মুহাম্মদ রাশেদ খান 
সহযোগী সম্পাদক 
মাসিক ইতিহাস অন্বেষা 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *