
মুহাম্মদ রাশেদ খান
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অনেক ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তা মন্তব্য করেছেন যে, বর্তমানে দেশে ব্যবসা করা বা শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেন এক ধরণের ‘পাপ’ বা অপরাধ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মূলধনের অভাব, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে শিল্প প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।বাংলাদেশে শিল্প ও বাণিজ্য খাতের এই বর্তমান কঠিন বাস্তবতার কিছু মূল কারণ নিচে দেওয়া হলো:
আস্থাহীনতা ও আর্থিক সংকট:
উচ্চ খেলাপি ঋণের বোঝা এবং তারল্য সংকটের কারণে অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের উপক্রম হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক শিল্প খাতে।
মূলধনের অপ্রতুলতা:
ব্যাংকগুলো তাদের দীর্ঘমেয়াদী ঋণের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, কারণ শেয়ার বাজার দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
নীতিমালা ও আমলাতন্ত্র:
অতিরিক্ত করনীতি এবং পলিসি জটিলতা প্রায়শই ব্যবসায়ীদের নিরুৎসাহিত করে, যা রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমিয়ে দেয় এবং ব্যবসার খরচ বাড়ায়।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট:
নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাব এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের অসহযোগিতা, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং ঘুষ বাণিজ্য:
সরকারি প্রতিষ্ঠানের অসহযোগিতা, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং ঘুষ বাণিজ্য বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতের বিকাশকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে。 বিভিন্ন সমীক্ষা এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর ক্ষোভ থেকে স্পষ্ট যে, লাইসেন্স প্রাপ্তি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ এবং কর বা ভ্যাট পরিশোধের মতো প্রতিটি ধাপে ব্যবসায়ীদের চরম হয়রানির শিকার হতে হয়। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (BBS)-এর সাম্প্রতিক ‘সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে’ অনুযায়ী, সরকারি সেবা নিতে যাওয়া নাগরিকদের প্রায় ৩১.৬৭% সরাসরি ঘুষ দিতে বাধ্য হন। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে এই হয়রানি আরও প্রকট। সরকারি দপ্তরের অসহযোগিতা ও ঘুষ বাণিজ্যের প্রধান ক্ষেত্রগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. লাইসেন্স ও অনুমোদন জটিলতানিয়মকানুনের বেড়াজাল:
একটি নতুন ব্যবসা শুরু করতে পরিবেশ ছাড়পত্র, ফায়ার লাইসেন্স, এবং ট্রেড লাইসেন্সসহ বহু দপ্তর থেকে অনুমোদন নিতে হয়।
কৃত্রিম বিলম্ব:
ফাইল আটকে রেখে ব্যবসায়ীদের বাধ্য করা হয় টেবিলের নিচে লেনদেন করতে।
১. রাজস্ব ও ভ্যাট অফিস (NBR)অযাচিত হয়রানি:
কাস্টমস এবং ভ্যাট কর্মকর্তাদের অহেতুক আইনি জটিলতা ও ফাইল আটকে রাখার কারণে ব্যবসায়ীরা বন্দরে ও কারখানায় ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হন।
বাধ্যতামূলক অনিয়ম:
অনেক অবাস্তব নীতিমালার কারণে ব্যবসায়ীরা নিয়ম মেনে চলতে চাইলেও কর্মকর্তাদের অসহযোগিতার কারণে ঘুষ দিতে বাধ্য হন।
১. ইউটিলিটি সংযোগ (গ্যাস ও বিদ্যুৎ) দীর্ঘসূত্রিতা:
নতুন কারখানায় গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংযোগের ফাইল মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়।
দালাল চক্রের আধিপত্য:
প্রভাবশালী দালাল ও ভেতরের কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট ছাড়া স্বাভাবিক নিয়মে সংযোগ পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দালাল চক্র পুরোপুরি রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মী।
১. আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও অন্যান্য সেবাতদারকির নামে চাঁদাবাজি:
কারখানা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পরিদর্শনের নামে অনিয়মিতভাবে হয়রানি করা সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিআরটিএ ও ভূমি অফিস:
বাণিজ্যিক যানবাহন এবং জমির নামজারি বা দলিলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি ও অসহযোগিতার শিকার হতে হয়।
নির্দিষ্ট সরকারি দপ্তরের (যেমন: এনবিআর, ডিপিডিসি, কলকারখানা পরিদর্শন পরিদফতর, ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ বিভাগ, সিটি কর্পোরেশন বা পরিবেশ অধিদপ্তর ইত্যাদি) হয়রানির মুখোমুখি ব্যবসায়ী সমাজ:
নির্দিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর হয়রানি, ঘুষের চাপ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সমাজের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। নতুন ব্যবসা শুরু করা থেকে শুরু করে সচল কারখানা চালু রাখা—প্রতিটি ধাপে উদ্যোক্তাদের জিম্মি করে অর্থ আদায় করা হয়। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর (যেমন FBCCI, BGMEA, SBMA) বিভিন্ন ফোরামের অভিযোগ এবং মাঠপর্যায়ের চিত্র অনুযায়ী, এই সংস্থাগুলোর হয়রানির ধরণ নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) মনগড়া অডিট ও জরিমানা:
কাস্টমস, ভ্যাট বা ট্যাক্স কর্মকর্তারা অনেক সময় নিয়মতান্ত্রিক ফাইলেও অহেতুক ত্রুটি খুঁজে বের করেন এবং ব্যবসায়ীদের বড় অঙ্কের জরিমানার ভয় দেখিয়ে ব্যক্তিগত অনৈতিক সুবিধা দাবি করেন।
পোর্ট ও কাস্টমসে হয়রানি:
আমদানি করা কাঁচামাল ছাড়করণের সময় এইচএস কোড (HS Code) বা মূল্যায়নের নামে ডেমারেজ (বিলম্ব মাশুল) বাড়িয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে বন্দর থেকে পণ্য খালাস করতে ব্যবসায়ীরা টেবিলের নিচে লেনদেন করতে বাধ্য হন।
পোর্ট কর্তৃপক্ষ ও কাস্টমসের দুর্নীতি:
পোর্ট কর্তৃপক্ষ ও কাস্টমসের দুর্নীতি এবং হয়রানি বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায়. সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও স্বীকার করা হয়েছে যে ট্যাক্সেশন এবং বন্দর ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়। এই দুর্নীতি ও পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে সৎ ব্যবসায়ীদের খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে।দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে চিহ্নিত পোর্ট ও কাস্টমসের দুর্নীতির প্রধান ক্ষেত্রগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. কাস্টমসের শুল্কায়ন ও ফাইল আটকে হয়রানি:
পণ্যের ভুল কোডিং (HS Code):
পণ্যের বিবরণ বা এইচএস কোড (HS Code) নিয়ে ইচ্ছাকৃত বিতর্ক তৈরি করে ফাইল আটকে রাখা হয়।
মূল্য অবমূল্যায়ন ও অতিমূল্যায়ন:
পণ্যের প্রকৃত দামের চেয়ে কম বা বেশি দেখিয়ে শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা বা সৎ ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে বেশি দাম ধরে জরিমানা করার ভয় দেখানো হয়।
শারীরিক পরীক্ষার নামে বিলম্ব:
শতভাগ শততার সাথে পণ্য আনার পরও কায়িক পরীক্ষার (Physical Examination) নামে দিন-পর-দিন কনটেইনার ফেলে রেখে অবৈধ সুবিধা দাবি করা হয়।
১. বন্দর কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেটকৃত্রিম কনটেইনার জট:
অনেক সময় স্ক্যানিং মেশিন নষ্ট থাকার অজুহাতে বা কাজের ধীরগতি দেখিয়ে বন্দরে কৃত্রিম জট তৈরি করা হয়।
বখশিশ ও স্পিড মানি:
কন্টেইনার আনলোডিং, ইয়ার্ডে পোস্টিং এবং ডেলিভারি নেওয়ার প্রতিটি ধাপে সিঅ্যান্ডএফ (C&F) এজেন্টদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট হারে “স্পিড মানি” বা বখশিশ দিতে বাধ্য করা হয়।
অবৈধ ডেমারেজ ও ফাইন:
ইচ্ছাকৃতভাবে প্রক্রিয়া বিলম্বিত করে আমদানিকারকের ওপর বাড়তি পোর্ট ডেমারেজ (বিলম্ব মাশুল) চাপানো হয়।
১. কাস্টমস ও সিঅ্যান্ডএফ সিন্ডিকেট:
অসাধু কিছু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও কাস্টমস কর্মকর্তার যোগসাজশে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য এনে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়। এর ফলে সৎ আমদানিকারকরা বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন।
১. পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE) ছাড়পত্র নবায়নে কালক্ষেপণ:
প্রতি বছর পরিবেশ ছাড়পত্র নবায়ন করা বাধ্যতামূলক, কিন্তু নবায়নের ফাইল কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়।
ইটিপি (ETP) পরিদর্শনের নামে হয়রানি:
কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার (ETP) চালু থাকার পরও পরিদর্শনের নামে কর্মকর্তারা অনিয়মের মিথ্যা অজুহাত তুলে কারখানা বন্ধ বা ভারী জরিমানার হুমকি দেন।
১. ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সঅযৌক্তিক লাইসেন্স শর্ত:
অগ্নি নিরাপত্তা লাইসেন্স পেতে বা তা নবায়ন করতে এমন সব শর্ত চাপানো হয় যা অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পক্ষে বাস্তবায়ন অসম্ভব।
পরিদর্শনের নামে মাসোহারা:
প্রতি বছর কারখানা পরিদর্শনের সময় “ত্রুটি” খুঁজে বের করার ভয় দেখিয়ে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দাবি করার অভিযোগ প্রায়শই ওঠে।
১. কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) লে-আউট ও কমপ্লায়েন্স জটিলতা:
কারখানার লে-আউট প্ল্যান অনুমোদন এবং শ্রম আইন বাস্তবায়নের তদারকির নামে এই দপ্তরের পরিদর্শকরা ছোটখাটো ত্রুটিকে বড় আকার দিয়ে মামলা বা কারখানা সিলগালা করার ভয় দেখান।
শ্রমিক অসন্তোষের অপব্যবহার:
কারখানায় কোনো অভ্যন্তরীণ সমস্যা দেখা দিলে সমাধান করার চেয়ে মালিকপক্ষকে চাপে ফেলে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
১. বিদ্যুৎ বিভাগ ও ডিপিডিসি (DPDC / DESCO / PDB):
নতুন সংযোগের দীর্ঘসূত্রিতা:
পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকার পরও নতুন বাণিজ্যিক বা শিল্প সংযোগের জন্য বছরের পর বছর ঘুরতে হয়।
ভুতুড়ে বিল ও লোডশেডিং:
অনেক সময় ভুল বা অতিরিক্ত বিল (Ghost Bill) পাঠানো হয়, যা সংশোধনের জন্য গেলে হয়রানির শিকার হতে হয়। একই সাথে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না দিয়েও ডিমান্ড চার্জ ঠিকই আদায় করা হয়।
১. সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাট্রেড লাইসেন্স ফি বৃদ্ধি ও ভোগান্তি:
কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ট্রেড লাইসেন্স ফি এবং বিভিন্ন কর বৃদ্ধি করা হয়। এছাড়া লাইসেন্স নবায়নের জন্য দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হয়।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও হোল্ডিং ট্যাক্স:
হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ এবং ময়লা অপসারণের নামে স্থানীয় কর্মকর্তা ও কাউন্সিলর অনুসারীদের সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত চাঁদা আদায় করে।
ইনকাম ট্যাক্স অফিসের অসহযোগিতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ঘুষ বাণিজ্য:
ইনকাম ট্যাক্স (আয়কর) অফিসের একশ্রেণীর কর্মকর্তা ও পরিদর্শকদের অসহযোগিতা, হয়রানি এবং কৃত্রিম ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ঘুষ আদায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও সাধারণ করদাতাদের জন্য একটি চরম আতঙ্কের নাম। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর অভিযোগ এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, করদাতারা নিয়ম মেনে কর দিতে চাইলেও আয়কর বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ফাইল আটকে রেখে বা আইনি মারপ্যাঁচ দেখিয়ে অনৈতিক সুবিধা (ঘুষ) দাবি করেন।আয়কর অফিসে হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মূল ধরণ এবং কৌশলগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. অহেতুক ফাইল অডিটের (Audit) ভয় দেখানো:
কৃত্রিম ত্রুটি খোঁজা:
একজন করদাতা সঠিকভাবে রিটার্ন জমা দেওয়ার পরও অসাধু কর্মকর্তারা ফাইলে ছোটখাটো বা অবাস্তব ত্রুটি খুঁজে বের করেন।
বড় অঙ্কের জরিমানার ভয়:
ফাইলটি ‘অডিট’-এ পাঠানো হবে এবং বিপুল পরিমাণ জরিমানা বা কর ফাঁকির মামলা হবে—এমন ভয় দেখিয়ে ব্যবসায়ীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা হয়। পরবর্তীতে এই অডিট থেকে নাম বাদ দেওয়ার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করা হয়।
১. আয় ও লভ্যাংশ পুনঃমূল্যায়ন (Reassessment):
ব্যবসায়িক ব্যয় ও ক্ষতি অস্বীকার:
ব্যবসার প্রকৃত খরচ, লোকসান বা বৈধ বিনিয়োগকে অনেক সময় কর কর্মকর্তারা স্বীকৃতি দিতে চান না।
মনগড়া কর নির্ধারণ:
কর্মকর্তারা নিজেদের ইচ্ছামতো কাল্পনিক মুনাফা বা আয় দেখিয়ে করের পরিমাণ কয়েক গুণ বাড়িয়ে নোটিশ পাঠান। এই বাড়তি করের বোঝা থেকে বাঁচতে ব্যবসায়ীরা রফাদফা বা ঘুষ দিতে বাধ্য হন।
১. ফাইল আটকে রাখা ও সার্টিফিকেট প্রদানে দীর্ঘসূত্রিতাঅসহ অসহযোগিতা:
কর পরিশোধের পর ‘ট্যাক্স ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট’ বা আয়কর প্রত্যয়নপত্র পেতে ব্যবসায়ীদের মাসের পর মাস ঘুরানো হয়।
ব্যবসা পরিচালনায় বাধা:
এই সার্টিফিকেট সময়মতো না পেলে ব্যবসায়ীরা ব্যাংক লোন, এলসি (LC) খোলা বা ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে পারেন না। এই জরুরি প্রয়োজনের সুযোগ নিয়ে টেবিলের নিচে লেনদেন নিশ্চিত করা হয়।
১. ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ বা ক্রোক করার হুমকিবকেয়া করের নামে নোটিশ:
কোনো কোনো ক্ষেত্রে করদাতাকে পর্যাপ্ত সময় বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই হুট করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ (স্থগিত) করার আইনি নোটিশ বা হুমকি দেওয়া হয়। এতে ব্যবসায়িক সুনাম নষ্ট হওয়ার ভয়ে ব্যবসায়ীরা কর্মকর্তাদের দাবি করা ঘুষ দিতে বাধ্য হন।
১. আইনজীবী বা ট্যাক্স কনসালটেন্টদের (আইটিপি) সিন্ডিকেট:
মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য:
অনেক সময় আয়কর অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কিছু অসাধু ট্যাক্স আইনজীবী বা কনসালটেন্টের সাথে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। সরাসরি ঘুষ না নিয়ে এই মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করা হয়, যাতে কর্মকর্তারা নিরাপদ থাকতে পারেন।
হোল্ডিং ট্যাক্স ও সিটি করপোরেশনের হয়রানি ও দুর্নীতি:
হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ এবং সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স-পরিদর্শন ব্যবস্থা বাংলাদেশের নগরভিত্তিক শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য আরেকটি বড় হয়রানির ক্ষেত্র। ঢাকা (উত্তর ও দক্ষিণ), চট্টগ্রাম, গাজীপুর বা নারায়নগঞ্জের মতো বড় বড় সিটি করপোরেশনের অসাধু কর কর্মকর্তা ও পরিদর্শকদের সিন্ডিকেট বছরের পর বছর ধরে ব্যবসায়ীদের ব্ল্যাকমেইল করে আসছে।সিটি করপোরেশনের যেসব মূল ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি ও হয়রানির শিকার হন:
১. হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণে “অ্যাসেসমেন্ট বাণিজ্য”মনগড়া ট্যাক্স নির্ধারণ:
কোনো বাণিজ্যিক ভবনের বা কারখানার হোল্ডিং ট্যাক্স (Holding Tax) নির্ধারণের সময় প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ট্যাক্স ধার্য করে নোটিশ পাঠানো হয়।
ঘুষের বিনিময়ে ট্যাক্স কমানো:
এরপর অসাধু কর মূল্যায়নকারী (Assessor) কর্মকর্তারা গোপনে যোগাযোগ করেন। মোট ট্যাক্সের একটি বড় অংশ ঘুষ হিসেবে দিলে তারা নথিপত্রে ট্যাক্সের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেন। আর সৎভাবে আপিল করতে গেলে মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখা হয়।
১. ট্রেড লাইসেন্স ও নবায়নে কৃত্রিম জটিলতাভুল ক্যাটাগরি ও অতিরিক্ত ফি:
ব্যবসার ধরন বা ক্যাটাগরি নিয়ে ইচ্ছাকৃত বিতর্ক তৈরি করে ফাইল আটকে রাখা হয়।
অনলাইন ব্যবস্থার আড়ালে ম্যানুয়াল ঘুষ:
সরকার ট্রেড লাইসেন্স ডিজিটাল বা অনলাইন করলেও, মাঠপর্যায়ের ভেরিফিকেশন বা পরিদর্শনের (Physical Inspection) নামে কতিপয় পরিদর্শক সশরীরে এসে “স্পিড মানি” বা বখশিশ দাবি করেন। টাকা না দিলে লাইসেন্স ইস্যু বা নবায়ন ঝুলে থাকে।
১. বিজ্ঞাপনী কর ও সাইনবোর্ড বাণিজ্য:
অবৈধ সাইনবোর্ড উচ্ছেদ ও জরিমানার ভয়:
কারখানার বা শোরুমের সামনে নিজস্ব সাইনবোর্ড বা নামফলক লাগালেও সেটিকে “বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড” হিসেবে গণ্য করে বিশাল অঙ্কের ট্যাক্স দাবি করা হয়। টাকা না দিলে হুট করে ম্যাজিস্ট্রেট এনে উচ্ছেদ বা জরিমানার মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়।
১. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশের নামে চাঁদাবাজি:
পরিচ্ছন্নতা পরিদর্শকদের দৌরাত্ম্য:
কারখানার বর্জ্য অপসারণের নিয়ম ঠিক থাকার পরও সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা পরিদর্শকরা এসে পরিবেশ দূষণ বা ড্রেনেজ জ্যামের অজুহাতে মোটা অঙ্কের জরিমানা করার হুমকি দেন।
স্থানীয় ভ্যাট (VAT) অফিস ও অসাধু কর্মকর্তাদের হয়রানি, কৃত্রিম ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ঘুষ বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য:
স্থানীয় ভ্যাট (VAT) অফিস ও অসাধু কর্মকর্তাদের হয়রানি, কৃত্রিম ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ঘুষ বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য বাংলাদেশের ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ—সব ধরণের ব্যবসায়ীদের জন্য একটি অন্যতম প্রধান প্রধান অভিশাপ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) আওতাধীন স্থানীয় ভ্যাট সার্কেল ও বিভাগীয় অফিসগুলোর কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও পরিদর্শকের কারণে ব্যবসায়ীরা বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন চেম্বার অব কমার্সের অভিযোগ অনুযায়ী, স্থানীয় ভ্যাট অফিসের হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যের মূল কৌশলগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. আকস্মিক পরিদর্শন ও খাতা জব্দ করার ভয় (ঝটিকা অভিযান):
হয়রানিমূলক তল্লাশি:
স্থানীয় ভ্যাট অফিসের কর্মকর্তারা কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই হুট করে দোকানে বা কারখানায় হাজির হন।
হুমকি ও আতঙ্ক সৃষ্টি:
বেচাকেনার রসিদ বা চালানে ছোটখাটো অমিল পেলেই তারা “ভ্যাট ফাঁকি” বা “হিসাবের গরমিল”-এর অভিযোগ তোলেন। খাতা বা কম্পিউটার জব্দ করা, দোকান সিলগালা করা এবং লাখ লাখ টাকার জরিমানার ভয় দেখিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বড় অঙ্কের ঘুষ দাবি করা হয়।
১. মূসক বা চালান (Mushak 6.3) ইস্যু নিয়ে জটিলতা:
নিয়োমের অপব্যবহার:
আইন অনুযায়ী প্রতিটি বিক্রির বিপরীতে মূসক-৬.৩ চালান দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক সময় ক্রেতারা চালান নিতে চান না।
ফাঁদ পাতা:
অসাধু কর্মকর্তারা সাধারণ ক্রেতা সেজে দোকানে আসেন এবং চালান না দিলে তাৎক্ষণিক মামলা বা জরিমানার হুমকি দিয়ে ব্যবসায়ীদের জিম্মি করেন এবং সমঝোতার নামে টাকা আদায় করেন।
১. মাসিক ভ্যাট রিটার্ন দাখিলে কৃত্রিম বাধারিটার্ন গ্রহণে অনীহা:
প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে হয়। ব্যবসায়ীরা সঠিক হিসাব নিয়ে গেলেও স্থানীয় অফিসের কর্মচারীরা ফাইলে ভুল ধরার অজুহাতে রিটার্ন সহজে গ্রহণ করতে চান না।
বিলম্ব মাশুলের ভয়:
রিটার্ন জমা নিতে দেরি করিয়ে দিয়ে সময় পার করে দেওয়া হয়, যাতে ব্যবসায়ী জরিমানা ও সুদের ভয়ে টেবিলে টাকা দিতে বাধ্য হন।
১. ভ্যাট রেয়াত (Rebate) ও রিফান্ডে কালক্ষেপণ:
টাকা আটকে রাখা:
কাঁচামাল ক্রয়ের বিপরীতে ব্যবসায়ীদের যে ভ্যাট রেয়াত বা রিফান্ড পাওয়ার আইনি অধিকার রয়েছে, তা পেতে স্থানীয় অফিসে বছরের পর বছর ঘুরতে হয়।
পার্সেন্টেজ বা কমিশন বাণিজ্য:
এই রিফান্ডের টাকা ছাড় করানোর জন্য অসাধু কর্মকর্তারা মোট টাকার একটি নির্দিষ্ট অংশ (পার্সেন্টেজ) ঘুষ হিসেবে অগ্রিম দাবি করেন।
১. ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস (EFD) নিয়ে অনিয়ম:
ভূতুড়ে বিক্রয় হিসাব:
অনেক দোকানে ইএফডি (EFD) বা এসডিসি (SDC) মেশিন বসানো হয়েছে। কিন্তু প্রায়ই সার্ভার ত্রুটির কারণে হিসাব মিলতে চায় না। অসাধু কর্মকর্তারা এই প্রযুক্তিগত ত্রুটিকে ব্যবসায়ীদের কারচুপি হিসেবে আখ্যা দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন।
মূসক গোয়েন্দা ও তদন্ত পরিদপ্তর (ভ্যাট গোয়েন্দা) এর কিছু অসাধু কর্মকর্তার আকস্মিক অভিযান, ফাইল জব্দ এবং কোটি কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির মামলার ভয় দেখিয়ে বড় অঙ্কের ঘুষ আদায়:
মূসক গোয়েন্দা ও তদন্ত পরিদপ্তর (ভ্যাট গোয়েন্দা) এর কিছু অসাধু কর্মকর্তার আকস্মিক অভিযান, ফাইল জব্দ এবং কোটি কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির মামলার ভয় দেখিয়ে বড় অঙ্কের ঘুষ আদায় বাংলাদেশের মাঝারি ও বৃহৎ ব্যবসায়ী সমাজের জন্য একটি অন্যতম বড় আতঙ্কের কারণ। স্থানীয় ভ্যাট অফিসের চেয়ে ভ্যাট গোয়েন্দাদের ক্ষমতা ও পরিধি বেশি হওয়ায়, এদের তৈরি করা ভয়ভীতি ও মানসিক চাপ ব্যবসায়ীদের চরমভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর অভিযোগ ও মাঠপর্যায়ের চিত্র অনুযায়ী, ভ্যাট গোয়েন্দা বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যের মূল কৌশলগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ঝটিকা অভিযান ও নথিপত্র জব্দ (Raid) আতঙ্ক সৃষ্টি:
কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সশস্ত্র বা দলবদ্ধভাবে কারখানায় বা করপোরেট অফিসে আকস্মিক অভিযান চালানো হয়।
কম্পিউটার ও হার্ডডিস্ক জব্দ:
অফিসের সব হিসাবের খাতা, চালান বই (মূসক ৬.৩), এবং কম্পিউটার বা সার্ভারের হার্ডডিস্ক জব্দ করে নিয়ে যাওয়া হয়, যার ফলে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক ব্যবসা পরিচালনা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে।
১. কাল্পনিক ও অতিরঞ্জিত ভ্যাট ফাঁকির হিসাব (Demands):
হিসাবের মারপ্যাঁচ:
জব্দ করা নথিপত্র বা কম্পিউটারের তথ্য বিশ্লেষণ করার নামে কর্মকর্তারা ৫ থেকে ১০ বছরের পুরনো হিসাব টেনে বের করেন।
ভীতি প্রদর্শন:
ছোটখাটো বা প্রযুক্তিগত ভুলের কারণেও কোটি কোটি টাকার “ভ্যাট ফাঁকি” হয়েছে বলে খসড়া প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এই বিপুল অঙ্কের কর ও জরিমানার ভয় দেখিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করা হয়।
১. গণমাধ্যমে সম্মানহানির হুমকিমিডিয়া ট্রায়াল:
ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে বা দরকষাকষিতে রাজি না হলে, চূড়ান্ত তদন্তের আগেই “বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকি উন্মোচন” শিরোনামে প্রেস রিলিজ বা গণমাধ্যমে সংবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। ব্যবসায়িক সুনাম ও ব্র্যান্ড ভ্যালু নষ্ট হওয়ার ভয়ে অনেক বড় প্রতিষ্ঠান তাদের অন্যায্য দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়।
১. ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ ও ফৌজদারি মামলার ভয়অ্যাকাউন্ট ব্লক:
ভ্যাট আইন অনুযায়ী ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ (স্থগিত) করার নোটিশ দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। একটি চলমান ব্যবসার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ হলে এলসি (LC) খোলা বা বেতন দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়।
গ্রেপ্তারের ভয়:
রাজস্ব ফাঁকির পাশাপাশি ফৌজদারি অপরাধের ধারা যুক্ত করে মামলা বা গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে টেবিলের নিচে সমঝোতা নিশ্চিত করা হয়।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হয়রানি:
বাংলাদেশে শিল্প ও বাণিজ্য পরিচালনায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হয়রানি এবং অসহযোগিতা উদ্যোক্তাদের জন্য আরেকটি বড় মানসিক ও অর্থনৈতিক নিগ্রহের কারণ। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (SME) উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে এবং ঋণ পরিশোধের সময় ব্যাংকগুলোর অনমনীয় মনোভাব ব্যবসাকে খাদের কিনারায় ঠেলে দেয়।দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতের উদ্যোক্তারা সাধারণত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে যেসব প্রধান হয়রানির মুখোমুখি হন:
১. ঋণ অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা ও ঘুষের লেনদেন:
ফাইলের পর ফাইল যাচাই:
একটি নতুন ব্যবসা বা প্রজেক্ট লোনের জন্য মাসের পর মাস কাগজপত্র যাচাইয়ের নামে ফাইল আটকে রাখা হয়।
অনানুষ্ঠানিক কমিশন (ঘুষ):
অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ ওঠে যে, ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ বা কমিশন না দিলে লোন পাস হতে চায় না।
১. জামানত বা কোল্যাটারাল (Collateral) নিয়ে বৈষম্যছোট উদ্যোক্তাদের অবহেলা:
বড় বড় ঋণখেলাপিরা হাজার কোটি টাকা বিনা জামানতে বা নামমাত্র জামানতে পার পেয়ে গেলেও, সৎ ও ছোট ব্যবসায়ীদের সামান্য লোনের বিপরীতে কোটি টাকার সম্পদ বন্ধক (Mortgage) রাখতে বাধ্য করা হয়।
কাগজপত্রের জটিলতা:
ট্রেড লাইসেন্স, ট্যাক্স ফাইলসহ এত ধরনের অহেতুক কাগজ চাওয়া হয় যা সাধারণ একজন নতুন উদ্যোক্তার পক্ষে জোগাড় করা কঠিন।
১. সুদের হার ও গোপন চার্জের ফাঁদঅঘোষিত ফি:
লোন প্রসেসিং ফি, ডকুমেন্টেশন ফি, বা আর্লি সেটেলমেন্ট ফি-র নামে ব্যাংকগুলো চুক্তির বাইরেও বিভিন্ন সময় অতিরিক্ত টাকা কেটে নেয়।
চক্রবৃদ্ধি সুদের চাপ:
কোনো কারণে ব্যবসার মন্দাভাবের কারণে কিস্তি (EMI) দিতে দেরি হলে চক্রবৃদ্ধি হারে জরিমানা বা পেনাল্টি সুদ চাপানো হয়, যা ব্যবসাকে দেউলিয়া করে তোলে।
১. ডলার ও এলসি (LC) খোলার ক্ষেত্রে বৈষম্য:
কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খুলতে গেলে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মাসের পর মাস ঘুরানো হয়, অথচ বড় বড় কর্পোরেট গ্রুপগুলোকে অনায়াসে এলসি সুবিধা দেওয়া হয়।
সরকারি কর্মচারীদের দ্বারা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ এবং হয়রানি:
সরকারি কর্মচারীদের দ্বারা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ এবং হয়রানি বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক বাধা। সরকারি নীতি অনুযায়ী জনগণের সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের যেকোনো দুর্ব্যবহারই দুর্নীতির শামিল, কারণ সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে যে তারা জনগণের সেবক, মালিক নন। তা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে বহু উদ্যোক্তাকে নিয়মিত হেনস্থার শিকার হতে হয়।ব্যবসায়ীরা সাধারণত যেসব দপ্তরে এবং যেভাবে দুর্ব্যবহারের সম্মুখীন হন:
১. সেবার বদলে “প্রভুত্বসুলভ” আচরণলাইসেন্স ও পরিদর্শনে হয়রানি:
কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, বা সিটি কর্পোরেশনের মতো সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে গেলে অনেক কর্মচারী ব্যবসায়ীদেরকে সাহায্য করার পরিবর্তে অপরাধীর মতো জেরা বা ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন।
অহেতুক বিলম্ব:
ফাইলের ত্রুটি সংশোধনের পথ না দেখিয়ে টেবিলে টেবিলে ঘুরিয়ে মানসিক চাপ তৈরি করা হয়, যার মূল উদ্দেশ্য থাকে অনৈতিক সুবিধা বা ঘুষ আদায় করা।
১. রাজস্ব ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের ব্ল্যাকমেইলিং:
রাজস্ব আদায়ের নামে ধমক:
ভ্যাট বা ট্যাক্স অফিসে সৎ করদাতা ব্যবসায়ীদেরকেও অনেক সময় অহেতুক জরিমানা বা আইনি ব্যবস্থার ভয় দেখিয়ে হেনস্থা করা হয়। দেশের বড় একটি অংশের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ের রাজস্ব কর্মকর্তারা প্রায়ই নীতিমালার ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে হয়রানি করেন।
মর্যাদাহানি:
শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কাস্টমস বা বন্দরে পিয়ন ও নিচু পদের কর্মচারীরাও অনেক সময় তুই-তোকারি বা অসম্মানজনক ভাষা ব্যবহার করে।
১. পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের চাঁদাবাজি:
পরিদর্শনে এসে হুমকি:
পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস বা রাজউকের মতো প্রতিষ্ঠানের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা হুটহাট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে এসে কাগজপত্র যাচাইয়ের নামে সাধারণ কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখায় এবং ব্যবসার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করে।
শিল্প পুলিশের (Industrial Police) একাংশের চাঁদাবাজি ও হয়রানি:
শিল্প পুলিশের (Industrial Police) একাংশের চাঁদাবাজি ও হয়রানি বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে (যেমন: আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম) উদ্যোক্তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন এবং কারখানার নিরাপত্তা দেওয়ার নামে গঠিত এই বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটের কিছু অসাধু সদস্য উল্টো ব্যবসায়ীদের ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ে লিপ্ত হচ্ছে বলে প্রতিনিয়ত অভিযোগ উঠছে। শিল্পাঞ্চলগুলোতে সাধারণত যেসব উপায়ে এই চাঁদাবাজি ও হয়রানি চালানো হয়:
১. ঝুট ব্যবসা ও সাব-কন্ট্রাক্ট নিয়ন্ত্রণপছন্দের সিন্ডিকেটকে কাজ দিতে বাধ্য করা:
পোশাক কারখানার ঝুট (বাকি অংশ বা গার্মেন্টস ওয়েস্ট) ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনৈতিক ক্যাডারদের হাতে থাকে। নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটকে কম দামে ঝুট না দিলে কারখানায় কৃত্রিম ঝামেলা তৈরির হুমকি দেওয়া হয়।
১. শ্রমিক অসন্তোষের ভয় দেখিয়ে “মাসোহারা” আদায়মিথ্যা গোয়েন্দা তথ্য:
অনেক সময় কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ বা আন্দোলনের ভুয়া গোয়েন্দা তথ্য (Intelligence) দিয়ে মালিকদের আতঙ্কিত করা হয়।
নিরাপত্তার নামে বখরা:
কারখানা চালু রাখতে এবং ঝামেলা এড়াতে “মাসোহারা” বা স্পিড মানি দিতে বাধ্য করা হয়। টাকা না দিলে শ্রমিক অসন্তোষের সময় পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবে দেরিতে সাড়া দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
১. মামলা ও তদন্তের নামে ব্ল্যাকমেইলিংমালিক ও কর্মকর্তাদের হয়রানি:
কোনো কারখানায় দুর্ঘটনা বা শ্রমিক বিক্ষোভ হলে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই কারখানার মালিক, জিএম বা কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তাদের আসামি করার ভয় দেখানো হয়।
মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার বাণিজ্য:
এফআইআর (FIR) বা চার্জশিট থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়।
১. লজিস্টিকস ও পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি:
মালামাল পরিবহনে বাধা:
কারখানা থেকে পণ্যবাহী কাভার্ড ভ্যান বা ট্রাক বের হওয়ার সময় মহাসড়কে এবং কারখানার গেটে বিভিন্ন চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশির নামে অবৈধ টাকা আদায় করা হয়।
শুল্ক গোয়েন্দা ও ট্রাফিক পুলিশের হয়রানি এবং চাঁদাবাজি:
শুল্ক গোয়েন্দা ও ট্রাফিক পুলিশের হয়রানি এবং চাঁদাবাজি বাংলাদেশের সরবরাহ চেইন (Supply Chain) এবং পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে দ্বিমুখী সংকট তৈরি করেছে। একদল বন্দরে বা সীমান্তে পণ্য আটকে ব্যবসায়ীদের ব্ল্যাকমেইল করে, আর অন্য দল সেই পণ্য যখন ট্রাকে করে বাজারে যায়, তখন রাস্তায় রাস্তায় “বখরা” আদায় করে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে যে, ট্যাক্স ও কাস্টমস সংগ্রহ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দুর্নীতি বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান বাধা। এই দুই বিভাগের চাঁদাবাজির প্রধান রূপ এবং তা প্রতিরোধে ব্যবসায়ীদের করণীয় নিচে তুলে ধরা হলো:
১. শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (CIID) হয়রানি:
শুল্ক গোয়েন্দাদের মূল কাজ চোরাচালান ও শুল্ক ফাঁকি রোধ করা হলেও, অনেক সময় বৈধ আমদানিকারকদের ফাইল আটকে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগ ওঠে:
“কনসাইনমেন্ট” আটকে রাখার ভয়:
সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও কাস্টমসের ক্লিয়ারেন্স হওয়া পণ্যকে “গোপন সংবাদ আছে” বা “পুনঃপরীক্ষা করা হবে” বলে বন্দরে বা বিমানবন্দরে আটকে রাখা হয়।
ভুল অসদাচরণের অভিযোগ:
আন্ডার-ইনভয়েসিং (মূল্য কম দেখানো) বা মিথ্যা ঘোষণার অজুহাত তৈরি করে বড় অঙ্কের জরিমানা বা ফৌজদারি মামলার ভয় দেখিয়ে দর-কষাকষি করা হয়।
ডিলিং বাণিজ্যের দীর্ঘসূত্রতা:
ডেমারেজ (বিলম্ব মাশুল) বাড়ার ভয়ে ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে তাদের দাবি পূরণ করেন।
১. ট্রাফিক পুলিশের “রাতের মহোৎসব” ও স্পিড মানি:
পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান যখন বন্দর থেকে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বা ঢাকার পাইকারি বাজারে (যেমন: কারওয়ান বাজার, পুরান ঢাকা) প্রবেশ করে, তখন ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজি শুরু হয়:
কাগজপত্র পরীক্ষার নামে আটক:
গাড়ির ফিটনেস, রুট পারমিট ও লাইসেন্স সম্পূর্ণ সঠিক থাকার পরও শুধু সময়ক্ষেপণ করার জন্য গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।
মামলার ভয় ও স্পট ফাইন:
টাকা না দিলে ইচ্ছাকৃতভাবে অবান্তর কারণে বড় অঙ্কের “অনলাইন কেস” বা মামলা ঠুকে দেওয়া হয়।
লাইনম্যান ও টোকেন বাণিজ্য:
অনেক স্পটে ট্রাফিক পুলিশ সরাসরি টাকা না নিয়ে তাদের নিযুক্ত “লাইনম্যান” বা কথিত শ্রমিক নেতাদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট টোকেনের বিনিময়ে দৈনিক বা মাসিক ভিত্তিতে জিপি (Gate Pass) বা চাঁদা আদায় করে।
মন্ত্রী, এমপি এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় পরিচালিত চাঁদাবাজি:
মন্ত্রী, এমপি এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় পরিচালিত চাঁদাবাজি বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতের প্রসারে অন্যতম বড় বাধা। মাঠপর্যায়ের চিত্র এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর (যেমন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি – DCCI) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট ও ধরণ অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর প্রকোপ আরও বেড়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যবসায়ীদের যেভাবে জিম্মি করা হয়, তার মূল ক্ষেত্রগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. গণপরিবহন ও টার্মিনাল সেক্টররুট পারমিট ও জিপি টোল:
দেশের বড় বড় বাস ও ট্রাক টার্মিনালগুলো (যেমন গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ) স্থানীয় এমপি বা প্রভাবশালী নেতাদের অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। প্রতিটি ট্রিপ বা গাড়ি ছাড়ার সময় “জিপি” (গেইট পাস) বা শ্রমিক ইউনিয়নের নামে বাধ্যতামূলক মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করা হয়।
পণ্যবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি:
মহাসড়কগুলোতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও একশ্রেণীর অসাধু পুলিশ সদস্যের যোগসাজশে পণ্যবাহী ট্রাক থেকে চাঁদা নেওয়া হয়। এর ফলে কাঁচামাল ও পণ্যের পরিবহন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যায়, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
১. পাইকারি বাজার ও ফুটপাত নিয়ন্ত্রণকারওয়ান বাজার ও পাইকারি আড়ত:
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মিরপুর শাহআলী বাজারসহ দেশের প্রধান পাইকারি বাজারগুলোতে রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের দৈনিক চাঁদা আদায় বাণিজ্য ওপেন সিক্রেট। দোকান বরাদ্দ ও পণ্য নামানোর প্রতিটি ধাপে নেতাদের টাকা দিতে হয়।
ফুটপাত ও অস্থায়ী দোকান:
স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর, দলীয় ক্যাডার এবং লাইনম্যানদের মাধ্যমে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দৈনিক বা মাসিক ভিত্তিতে কোটি কোটি টাকা চাঁদা তোলা হয়।
১. ঝুট ব্যবসা ও শিল্পাঞ্চল নিয়ন্ত্রণগার্মেন্টস ঝুট সিন্ডিকেট:
পোশাক শিল্প এলাকাগুলোতে (সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ) কারখানার ঝুট (ফেব্রিক বর্জ্য) ক্রয়ের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ থাকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের হাতে। মালিকপক্ষ তাদের পছন্দের ব্যবসায়ীর কাছে ঝুট বিক্রি করতে চাইলে কারখানায় ভাঙচুর বা শ্রমিক অসন্তোষ উসকে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
জোরপূর্বক মালামাল সরবরাহ:
নতুন কোনো কারখানা বা বহুতল ভবন নির্মাণ করতে গেলে স্থানীয় নেতাদের নির্ধারিত সিন্ডিকেট থেকে নিম্নমানের রড, সিমেন্ট বা বালু চড়া দামে কিনতে বাধ্য করা হয়।
১. বড় ব্যবসায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজিট্যান্ডার ও উন্নয়ন কাজ:
সরকারি যেকোনো বড় উন্নয়ন প্রকল্প বা ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী-এমপিদের ঘনিষ্ঠ চক্রের কাছে। কাজ পেতে হলে নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ বা “কমিশন” অগ্রিম দিতে হয়।
ভীতি প্রদর্শন ও বেনামী চাঁদা:
অনেক সময় প্রভাবশালী নেতাদের নাম ব্যবহার করে বা সরাসরি ফোন করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে “পার্টির ফান্ড”, “নির্বাচনী খরচ” বা “স্থানীয় উৎসবের” নামে মোটা অঙ্কের অনুদান দাবি করা হয়, যা মূলত এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজি।
উপসংহার (Conclusion):
বাংলাদেশে একটি শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা থেকে শুরু করে তা সফলভাবে পরিচালনা করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে উদ্যোক্তাদের যে চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন: এনবিআর, ভ্যাট অফিস, ডিপিডিসি, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও কলকারখানা পরিদর্শন পরিদফতর) একাংশের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, হয়রানিমূলক অডিট, কাল্পনিক নোটিশ এবং পদ্ধতিগত ঘুষের বাণিজ্য ব্যবসার খরচকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর ওপর মন্ত্রী, এমপি এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় পরিচালিত বহুমুখী চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট ব্যবসা পরিচালনাকারিদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে।এই দমবন্ধকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে নিম্নোক্ত সংস্কারগুলো অপরিহার্য:
পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন:
লাইসেন্সপ্রাপ্তি, ভ্যাট-ট্যাক্স রিটার্ন এবং ইউটিলিটি সংযোগের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইন ও মানবস্পর্শহীন (Human-free) করা, যাতে টেবিলের নিচে লেনদেনের সুযোগ বন্ধ হয়।
জবাবদিহিতা ও আইনি সংস্কার:
অসাধু কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা (যেমন- মনগড়া অডিট বা অতিরঞ্জিত জরিমানার ভয় দেখানো) সীমিত করা এবং হয়রানির বিরুদ্ধে দ্রুত বিচারিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জিরো টলারেন্স:
ব্যবসায়ী সমাজকে জিম্মি করে ঝুট ব্যবসা, পরিবহন খাত এবং পাইকারি বাজারে যে রাজনৈতিক চাঁদাবাজি চলে, তা কঠোর হস্তে দমন করা।
সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি:
সরকারি দপ্তরগুলোকে “নিয়ন্ত্রণকারী বা শোষক” ভূমিকা পরিহার করে ব্যবসার “সহায়ক বা অনুঘটক” হিসেবে কাজ করতে হবে।ব্যবসায়ীরা চোর বা অপরাধী নন; তারা দেশের কর্মসংস্থান ও জিডিপির মূল চালিকাশক্তি। তাই রাষ্ট্র যদি অবিলম্বে ব্যবসায়ী সমাজকে এই প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক হয়রানি থেকে মুক্ত করতে না পারে, তবে নতুন উদ্যোক্তারা হারিয়ে যাবেন এবং দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
লিখেছেন:-মুহাম্মদ রাশেদ খান
সহযোগী সম্পাদক
মাসিক ইতিহাস অন্বেষা