
নওগাঁ প্রতিনিধিঃ নওগাঁয় পারিবারিক কলহ ও কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার জেরে স্ত্রী হালিমা খাতুনকে হত্যার দায়ে স্বামী মোঃ শামীম সরদারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে জেলা ও দায়রা জজ আদালত নওগাঁ ও স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-০১ এর বিচারক মোহাম্মদ রোকনুজ্জামান এই রায় প্রাদান করেন।
মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৮ আগস্ট নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার দোহালী কোয়ালীপাড়া গ্রামের মোঃ শামীম সরদারের সঙ্গে হালিমা খাতুনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর তারা ঢাকায় বসবাস করতেন। পরবর্তীতে হালিমা একটি কন্যা সন্তান জন্ম দিলে শামীম সন্তানকে মেনে নিতে অস্বীকার করেন এবং স্ত্রী-সন্তানের প্রতি অবহেলা শুরু করেন। পরবর্তীতে শামীম মাঝে মধ্যে স্ত্রী হালিমাকে দেখতে গেলেও তাদের মধ্যে সামান্য বিষয় নিয়ে ঝগড়া হতো। মেয়ের পরিবার থেকে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে যেতে বললে শামীম বিভিন্ন অজুহাত দেখান।
হঠাৎ করে শামীম ১৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর মেয়ের পরিবারকে ফোন করে স্ত্রীকে হালিমা খাতুনকে গ্রামের বাড়ি মহাদেবপুর, নওগাঁয় পাঠিয়ে দিতে বলেন। মেয়ের পরিবার মেয়েকে একা পাঠাতে রাজি না হওয়ায় ১৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর সকালে তার শ্বশুর বাড়িতে যান এবং সন্তানকে শ্বশুর বাড়ি রেখে স্ত্রী হালিমা খাতুনকে নিয়ে মহাদেবপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। শামীম হালিমাকে বাড়িতে নিয়ে আসার পর মেয়ের পরিবার থেকে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে ফোন করে মেয়ের সাথে কথা বলতে চাইলে তাদের মেয়ে কাজে ব্যস্ত আছেন বলে শামীম বিভিন্ন তালবাহানা করতে থাকে।
পরবর্তীতে ২৯ ডিসেম্বর নওগাঁ সদর মডেল থানাধীন তিলকপুর ইউনিয়নের (কিশোরীপুর) একটি ধান ক্ষেত থেকে হালিমার গলাকাটা ও ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ মেয়ের পরিবারকে ফোন করে জানালে তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মেয়ের গলা কাটা, মুখে ও পেটে ধারালো অস্ত্রের রক্তাক্ত জখম অবস্থায় লাশ দেখে সনাক্ত করেন। অতঃপর মেয়ের পরিবারের সদস্যরা শামীমের খোঁজখবর নিতে গিয়ে জানতে পারেন যে, মেয়ের লাশ উদ্ধার হওয়ার পর হতে শামীম পলাতক রয়েছে। পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও মেয়ে সন্তান জন্ম গ্রহণ করায় শামীম ১৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর-২৯ ডিসেম্বরের মধ্যে যেকোন সময় স্ত্রী হালিমা খাতুনকে হত্যা করে মৃত্যু নিশ্চিত করে মরদেহ গোপন করার জন্য ঘটনাস্থলে ফেলে যান। এ ঘটনায় নিহত হালিমার বাবা বাদী হয়ে নওগাঁ সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলাটির তদন্ত শেষে ২০২২ সালের ১৩ মার্চ আসামির বিরুদ্ধে ৩০২/২০১ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়। ২৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও শুনানি শেষে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোঃ রোকনুজ্জামান আসামির উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন।
মামলাটি রাষ্ট্রপক্ষে পরিচালনা করেন জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মোঃ শাহরিয়ার এবং আসামিপক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোঃ এমরান হোসেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. শাহরিয়ার বলেন, এই রায়ে আমরা রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট। ক্ষতিগ্রস্থতরা ন্যয় বিচার পেয়েছে। এই রায়ের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে।