
স্টাফ রিপোর্টার বগুড়াঃ
আমরা যখন ঈদের আমেজে পরিবার নিয়ে বসে গরুর মাং’স খাচ্ছি, মিষ্টি লিচুর স্বাদ নিচ্ছি, তখন সীমান্তের কাঁটাতারের ফাঁকে কিছু মানুষ জীবনের সবচেয়ে নির্মম সময় পার করছে।
ভাবুন তো, টানা ৬২ ঘণ্টা! এক-দুই ঘণ্টা নয়, একদিন নয়, তিন দিনেরও বেশি সময় ধরে খোলা আকাশের নিচে বসে থাকা। মাথার ওপর কালো মেঘ, চারদিকে ঝ’ড়-বৃষ্টি, ব’জ্রপাতের বিক’ট শব্দ। অথচ আশ্রয়ের জন্য একটি ছাউনি পর্যন্ত নেই। নেই নিরাপত্তা, নেই নিশ্চয়তা, নেই ভবিষ্যতের কোনো উত্তর।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, তাদের মধ্যে আছে শিশু, বৃদ্ধ, নারী। যে শিশুরা এই বয়সে মায়ের কোলে ঘুমাবে, বাবার হাত ধরে হাঁটবে, তারা আজ সীমান্তের কাঁটাতারের পাশে অনিশ্চয়তার বন্দী। তৃষ্ণায় কাতর হয়ে যখন তারা পানি চেয়েছে, তখন তাদের বাবা-মায়ের বুক ফেটে গেছে অসহায়ত্বে। একজন বাবা যখন নিজের সন্তানের জন্য এক গ্লাস পানির বিনিময়ে টাকা দিতে চায়, তখন বুঝতে হবে সে কতটা অসহায় হয়ে পড়েছে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই পানিটুকুও মেলেনি। শেষ পর্যন্ত শিশুগুলোকে ডোবার ময়লা পানি খেয়ে তৃষ্ণা মেটাতে হয়েছে। একজন বাবা-মায়ের জন্য এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে?
মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার একটি ঠিকানা থাকে, একটি দেশ থাকে, একটি ঘর থাকে। ঝড়ের সময় পাখিরাও জানে কোথায় ফিরে যেতে হবে। কিন্তু এই মানুষগুলো যেন সেই অধিকারটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। তারা না ভারতের, না বাংলাদেশের—দুই দেশের মাঝখানে আটকে থাকা কিছু অসহায় প্রাণ।

রাজনীতি, কূটনীতি, সীমান্তনীতি—এসব বড় বড় শব্দের আড়ালে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় সাধারণ মানুষ। যারা কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না, কোনো নীতি নির্ধারণ করে না, অথচ সিদ্ধান্তের বোঝা তাদের কাঁধেই এসে পড়ে। কাঁটাতারের বেড়ার দুই পাশে দাঁড়িয়ে ক্ষমতাবানরা হিসাব-নিকাশ করে, আর মাঝখানে বসে থাকে ক্ষুধার্ত শিশু, ক্লান্ত বৃদ্ধ, আতঙ্কিত মা।
একজন মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হলো—”আমি জানি, কোথাও না কোথাও আমার জন্য একটি ঘর অপেক্ষা করছে।” কিন্তু যখন সেই ঘর হারিয়ে যায়, তখন মানুষ শুধু ক্ষুধার্ত হয় না, সে ভেতর থেকেও ভেঙে পড়ে।
সীমান্তের এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবতার চেয়ে বড় কোনো পরিচয় নেই। রাজনৈতিক বিরোধ, রাষ্ট্রীয় দ্বন্দ্ব কিংবা সীমান্তের কড়াকড়ি—সবকিছুর ঊর্ধ্বে একজন মানুষ অন্তত খাদ্য, পানি এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অধিকার রাখে।
আজ কাঁটাতারের ওপারে বসে থাকা সেই শিশুদের কান্না, সেই মায়েদের আত’ঙ্ক, সেই বাবাদের অসহায় দৃষ্টি—আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে, পৃথিবীতে কি এখনও মানুষের জন্য মানুষের দরদ বেঁচে আছে?
যখন রাত গভীর হবে, আমরা হয়তো নিজের বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ব। কিন্তু সীমান্তের সেই মানুষগুলো তখনও খোলা আকাশের নিচে বৃষ্টিতে ভিজবে, বজ্রপাতের শব্দে চমকে উঠবে, আর অপেক্ষা করবে—কেউ একজন তাদের মানুষ হিসেবে দেখুক, শুধু একটি সংখ্যা বা রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে নয় !