👁 179 Views

আল কুরআনের ভাষ্যমতে আগুন কত প্রকার ও কি কি?

লেখক .  মুহাম্মদ রাশেদ খান
আল-কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী আগুনকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: দুনিয়ার উপকারী আগুন এবং আখিরাতের শাস্তির আগুন।কুরআনে আখিরাতের বা জাহান্নামের আগুনের তীব্রতা এবং স্তরভেদে সাতটি ভিন্ন নাম উল্লেখ করা হয়েছে:
জাহান্নাম (جهنم):
এটি জাহান্নামের সবচেয়ে উপরের স্তর এবং সাধারণ পাপীদের শাস্তির স্থান。
লাজা (لظى):
এই আগুন লেলিহান শিখার মতো, যা চামড়া ও মাংস ঝলসে দেয় (সূরা আল-মা’আরিজ: ১৫-১৬)।
হুতামা (الحطمة):
আল্লাহর জ্বালানো এই আগুন দাউদাউ করে জ্বলে এবং মানুষের অন্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায় (সূরা আল-হুমাজাহ: ৪-৭)。
সায়ির (سعير):
এটি প্রজ্বলিত ও প্রজ্জ্বলিত আগুন, যা অবাধ্যদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে。
সাকার (سقر):
এমন এক আগুন যা কিছুই বাকি রাখে না এবং চামড়া পুড়িয়ে কালো করে দেয় (সূরা আল-মুদ্দাসসির: ২৮-২৯)。
জাহিম (الجحيم):
এটি অত্যধিক উত্তপ্ত ও লেলিহান আগুনের বিশাল কুন্ডলী, যা অবাধ্য ও সীমালঙ্ঘনকারীদের আবাসস্থল (সূরা আল-হাজ্ব: ৫১)。
হাওিয়াহ (الهاوية):
জাহান্নামের সবচেয়ে গভীর ও ভয়ংকরতম স্তর, যেখানে পাপাচারীদের নিক্ষেপ করা হবে (সূরা আল-কারিয়াহ: ৯-১১)
আল্লাহর আগুন বলতে কি বুঝায়?
আল্লাহর আগুন বলতে পবিত্র কুরআনে সরাসরি “নারুল্লাহ” (نَارُ اللَّهِ) বা আল্লাহর বিশেষ আগুনকে বোঝানো হয়েছে।
এটি সাধারণ কোনো আগুন নয়, বরং বিশেষভাবে সৃষ্ট পরকালের এক শাস্তির নাম। এই আগুন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. হুতামা নামক আগুনকুরআনে এটিকে “নারুল্লাহিল মুক্বদাহ” (نَارُ اللَّهِ الْمُوقَدَةُ) অর্থাৎ “আল্লাহর প্রজ্বলিত আগুন” বলা হয়েছে (সূরা আল-হুমাজাহ: ৬)। এটি জাহান্নামের হুতামা নামক স্তরের আগুন।
২. বিশেষ বৈশিষ্ট্যঅন্তর ভেদ করে:
দুনিয়ার আগুন শুধু চামড়া ও মাংস পোড়ায়, কিন্তু আল্লাহর এই আগুন মানুষের বুক চিড়ে সরাসরি কলিজা বা অন্তরকে দগ্ধ করবে (সূরা আল-হুমাজাহ: ৭)।
অনন্ত যন্ত্রণা:
অন্তর পুড়ে যাওয়ার পরেও অপরাধী মারা যাবে না, বরং দীর্ঘস্থায়ী তীব্র যন্ত্রণা ভোগ করবে।
বদ্ধ পরিবেশ:
এই আগুন অপরাধীদের চারপাশে স্তম্ভের মতো উঁচুতে চারদিক থেকে বন্ধ করে দেওয়া হবে, যাতে পালানোর কোনো পথ না থাকে (সূরা আল-হুমাজাহ: ৮-৯)।
১. যাদের জন্য এই আগুনযারা মানুষের পেছনে নিন্দা ও গীবত করে। যারা মানুষের সামনে অপবাদ ও অপমান করে। যারা শুধু অর্থ জমা করে এবং বারবার তা গণনা করে (মনে করে সম্পদ তাকে অমর করবে)।
আল্লাহর আগুনের শাস্তির হাত থেকে বাঁচার জন্য কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত দোয়াসমূহ সম্পর্কে জানতে চাই:
আল্লাহর আগুন এবং জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য পবিত্র কুরআন ও হাদিসে বেশ কিছু শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ দোয়া বর্ণনা করা হয়েছে। নিচে নিয়মিত আমল করার মতো প্রধান দোয়াগুলো উল্লেখ করা হলো:
১. পবিত্র কুরআনে বর্ণিত দোয়াসমূহদোয়া ১ (সবচেয়ে বেশি পঠিত ও ব্যাপক দোয়া):
আরবি: رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِউচ্চারণ: রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আজাবান্নার।
অর্থ: “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ইহকালে কল্যাণ দান করুন এবং পরকালেও কল্যাণ দান করুন। আর আমাদের জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন।” (সূরা আল-বাকারাহ: ২০১)
দোয়া ২ (ক্ষমা ও মুক্তি পাওয়ার দোয়া):
আরবি: رَبَّنَا إِنَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِউচ্চারণ: রব্বানা ইন্নানা আমান্না ফাগফির লানা জুনুবানা ওয়া কিনা আজাবান্নার।
অর্থ: “হে আমাদের রব! আমরা নিশ্চয়ই ঈমান এনেছি, অতএব আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমাদের আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন।” (সূরা আলে ইমরান: ১৬)
দোয়া ৩ (জাহান্নামকে দূরে সরানোর দোয়া):
আরবি: رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ ۖ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًاউচ্চারণ: রব্বানাসরিফ আন্না আজাবা জাহান্নামা, ইন্না আজাবাহা কানা গরমা।
অর্থ: “হে আমাদের রব! আমাদের থেকে জাহান্নামের আজাব দূরে সরিয়ে দিন; নিশ্চয়ই এর আজাব অবিচ্ছিন্ন ও ধ্বংসাত্মক।” (সূরা আল-ফুরকান: ৬৫)
১. হাদিস শরিফে বর্ণিত দোয়াসমূহ:
দোয়া ৪ (সকাল-সন্ধ্যার বিশেষ আমল):
রাসূলুল্লাহ (সা.) ফজরের ও মাগরিবের নামাজের পর কারো সাথে কথা বলার আগে এই দোয়াটি ৭ বার পড়তে বলেছেন। ওই দিন বা রাতে মারা গেলে জাহান্নাম থেকে মুক্তির ফায়সালা লিখে দেওয়া হয়।
আরবি: اللَّهُمَّ أَجِرْنِي مِنَ النَّارِউচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান নার।
অর্থ: “হে আল্লাহ! আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।”(যদি সবার জন্য দোয়া করেন তবে বলবেন: আল্লাহুম্মা আজিরনা মিনান নার)
দোয়া ৫ (জান্নাত লাভ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি):
হাদিসে এসেছে, কোনো বান্দা দিনে ৩ বার এই দোয়া করলে জাহান্নাম নিজে আল্লাহর কাছে বলে, “হে আল্লাহ! তাকে আমার থেকে মুক্তি দিন”।
আরবি: اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْجَنَّةَ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ النَّارِউচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল জান্নাতা ওয়া আউজুবিকা মিনান নার।
অর্থ: “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জান্নাত প্রার্থনা করছি এবং জাহান্নামের আগুন থেকে আপনার আশ্রয় চাচ্ছি।”
দোয়া ৬ (নামাজের তাশাহহুদে পঠিত দোয়া):
ফরজ বা নফল যেকোনো নামাজের শেষ বৈঠকে আত্তাহিয়াতু ও দুরুদ শরিফ পড়ার পর সালাম ফেরানোর আগে এই দোয়াটি পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ:
আরবি: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ ، وَمِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ ، وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ ، وَمِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِউচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন আজাবি জাহান্নাম, ওয়া মিন আজাবিল ক্ববরি, ওয়া মিন ফিতনাতিল মাহয়া ওয়াল মামাতি, ওয়া মিন শাররি ফিতনাতিল মাসীহিদ দাজ্জাল।
অর্থ: “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি জাহান্নামের আজাব থেকে, কবরের আজাব থেকে, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে এবং মসীহ দাজ্জালের ফিতনার ক্ষতি থেকে।”
পরামর্শ: আল্লাহর আগুনের শাস্তি (হুতামা) থেকে বাঁচতে দোয়ার পাশাপাশি সর্বদা মানুষের পেছনে গীবত বা পরনিন্দা করা, মানুষকে উপহাস করা এবং অবৈধভাবে সম্পদ পুঞ্জীভূত করার মানসিকতা থেকে দূরে থাকা আবশ্যক।
লেখক
মুহাম্মদ রাশেদ খান
সহযোগী সম্পাদক
মাসিক ইতিহাস অন্বেষা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *