
রংপুর ব্যুরো প্রধান: রংপুরের হারাগাছ পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ধুমেরকুঠি হায়দারিয়া দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ঘিরে নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে।
বিদ্যালয়ে লাইব্রেরিয়ান পদে শিক্ষক থাকলেও নেই কার্যকর পাঠাগার। প্রায় দুই মাস ধরে অচল বিজ্ঞান ল্যাব। পর্যাপ্ত কম্পিউটার বা ল্যাপটপ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে আইসিটি শিক্ষা। নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ থেকেও শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ অভিভাবক ও স্থানীয়দের।
এ ছাড়া বিদ্যালয়ের ১৫ থেকে ২০ বিঘা সম্পত্তি থাকার দাবি থাকলেও এসব সম্পত্তির সঠিক হিসাব ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত কমিটির পরিবর্তে এডহক কমিটির মাধ্যমে বিদ্যালয় পরিচালনা, একই ব্যক্তিদের বারবার কমিটিতে রাখা এবং প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, লাইব্রেরিয়ান পদে শিক্ষক থাকলেও নেই আলাদা কোনো কার্যকর পাঠাগার। লাইব্রেরিয়ান মো. আকরামুল জানান, আগের লাইব্রেরির বই ভিজে যাওয়ায় সেটি বর্তমানে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। আপাতত একটি শ্রেণিকক্ষে বই রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিজ্ঞান ল্যাব নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। শিক্ষার্থীদের দাবি, জরাজীর্ণ অবস্থায় থাকা ল্যাবটি প্রায় দুই মাস ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে না। ফলে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, পিটি শিক্ষক থাকলেও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত খেলাধুলা ও শরীরচর্চার সুযোগ নেই। পিটি শিক্ষক জানান, খেলাধুলার সরঞ্জাম প্রধান শিক্ষকের আলমারিতে রাখা রয়েছে।
আইসিটি শিক্ষক থাকলেও পর্যাপ্ত কম্পিউটার বা ল্যাপটপ নেই বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের দাবি, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় ব্যবহারিক ক্লাস পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে। কোনো কোনো সময় নিজের ল্যাপটপ নিয়ে এসে শিক্ষার্থীদের ক্লাস করান বলেও জানান তিনি।
বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রধান শিক্ষক নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকেন না। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত পরিচালনা কমিটির পরিবর্তে বারবার এডহক কমিটি গঠন করা হচ্ছে। প্রায় ১২ বছর ধরে একই প্রক্রিয়ায় কমিটি গঠন এবং একই ব্যক্তিদের বারবার কমিটিতে রাখার অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় ও কয়েকজন শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া সেশন ফিসহ বিভিন্ন খাতের আয় এবং ব্যয়ের হিসাব যথাযথভাবে প্রকাশ করা হয় না বলে অভিযোগ তাদের।
এর আগে বিদ্যালয়ের কয়েকটি গাছ কেটে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছিল প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। সহকারী প্রধান শিক্ষক আতাউল রহমান জানান, প্রতিষ্ঠানের নামে ১৪ থেকে ১৫ বিঘা সম্পত্তি রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের বড় অংশ প্রধান শিক্ষক নিয়ন্ত্রণ করেন বলেও তিনি দাবি করেন।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, সহকারী শিক্ষকদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা নেই। শ্রেণিকক্ষের একটি কক্ষেই তারা অফিসের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলীর বক্তব্য জানতে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি লিখিত অভিযোগ এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা মাধ্যমিক কর্মকর্তা ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে যোগাযোগের কথা বলেন। পরে তিনি সরাসরি দেখা করে কথা বলার প্রস্তাব দেন। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার কাছ থেকে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে রংপুর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এনায়েত উল্লাহ বলেন, বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আঞ্চলিক মাধ্যমিক কর্মকর্তা রোকসানা বেগম জানান, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাগার, বিজ্ঞানাগার, তথ্যপ্রযুক্তি ও ক্রীড়া সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, আয়-ব্যয় ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।
অভিভাবক ও স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়ের সম্পত্তি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা কমিটি এবং শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র বের করা হোক।