👁 130 Views

শিশু রাফসানের মৃত্যুর পর ফের আলোচনায় ডা. কল্লোল

কুষ্টিয়া প্রতিনিধিঃ দেড় বছরের শিশু মো. রাফসানের মৃত্যুর পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে কুষ্টিয়ার পরিচিত শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এইচ. এস. কল্লোলের নাম। শিশুটির পিতা সাংবাদিক আমিন হাসান পূর্ব থেকেই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসা ও উচ্চমাত্রার ওষুধ প্রয়োগের অভিযোগ তুলে আসছিলেন। রাফসানের মৃত্যুর পর সেই অভিযোগ নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ১২ এপ্রিল কুষ্টিয়া শহরের ছয় রাস্তার মোড় এলাকার বৈশাখী ক্লিনিকে ১৪ মাস বয়সী শিশু রাফসানকে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে প্রথমে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ২০ জুন দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে রাফসান। পরদিন শনিবার (২১ জুন) রাত সাড়ে ৯টায় কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের সুলতানপুর ঈদগাহ মাঠে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পার্শ্ববর্তী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
এর আগে গত ৯ মে সাংবাদিক আমিন হাসান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে ডা. এইচ. এস. কল্লোলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনেন। তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক কুষ্টিয়া সদর হাসপাতাল ও সনো টাওয়ারে নিয়মিত রোগী দেখেন এবং শিশুদের চিকিৎসায় অতি শক্তিশালী ও উচ্চমাত্রার ওষুধ ও ইনজেকশন প্রয়োগ করেন।
আমিন হাসানের অভিযোগ, এসব ওষুধ ব্যবহারের ফলে অনেক শিশুর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়লে রোগীদের দ্রুত কুষ্টিয়ার বাইরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার করা হয়। অন্য চিকিৎসকদের কাছে নেওয়ার পর ব্যবহৃত ওষুধের মাত্রা দেখে তারা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বলেও তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্য, কিছু শিশুকে আইসিইউ ও লাইফ সাপোর্ট পর্যন্ত নিতে বাধ্য হতে হয়েছে।
রাফসানের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরনো অভিযোগগুলো নতুন করে সামনে আসে। অনেক অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বিষয়টির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।
আমিন হাসানের ওই ফেসবুক পোস্টে সনি আজিম নামে একজন মন্তব্য করেন, “উনি ডাক্তার না কসাই।” বাদশা আলমগীর নামে অপর একজন লিখেছেন, অতিরিক্ত ওষুধ প্রয়োগে শিশুরা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত।
শেখ নাজমুল হোসেন নামে আরেক ব্যক্তি দাবি করেন, তার পরিবারের এক সদস্য অতীতে ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে দীর্ঘদিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এছাড়া অনেকেই শিশুদের চিকিৎসায় ওষুধ প্রয়োগ, ক্লিনিক ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসা তদারকির বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে সাংবাদিক আমিন হাসান বলেন, আমার সন্তানকে সুস্থ করার জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কুষ্টিয়া থেকে রাজশাহী, পরে সাভারে উন্নত চিকিৎসা নিতে হয়েছে। দীর্ঘ দুই মাস মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে আমার সন্তান চলে গেছে। আমি চাই, আমার সন্তানের চিকিৎসা সংক্রান্ত পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হোক এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে আর কোনো পরিবারকে এমন শোক বহন করতে না হয়।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডা. এইচ. এস. কল্লোলের ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
রাফসানের পিতা আমিন হাসান দৈনিক দ্যা ডেইলি ট্রাইবুনাল পত্রিকার কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। দেড় বছরের শিশু রাফসানের অকাল মৃত্যুতে কুষ্টিয়ায় কর্মরত সাংবাদিকদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় সাংবাদিকরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন।
একই সঙ্গে সাংবাদিক আমিন হাসানের উত্থাপিত অভিযোগসমূহ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তারা। সাংবাদিকদের মতে, চিকিৎসাসেবা-সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন এবং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন মর্মান্তিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিমত, চিকিৎসা-সংক্রান্ত অভিযোগ অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। তাই শিশুর মৃত্যুর ঘটনাসহ উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে বেসরকারি ক্লিনিকের চিকিৎসা পদ্ধতি, ওষুধ প্রয়োগ এবং রোগী ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নিয়মিত তদারকি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
রাফসানের মৃত্যুতে শোকাহত পরিবার ও স্বজনদের আহাজারি যেমন এলাকাবাসীকে নাড়া দিয়েছে, তেমনি চিকিৎসাসেবার মান, জবাবদিহিতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে উত্থাপিত অভিযোগ ও তদন্তের দাবির বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *