👁 496 Views

নওগাঁর বলিহার রাজবাড়ী ও পাহাড়পুর বিহার পরিদর্শনে ভারতীয় হাইকমিশনার

নওগাঁ প্রতিনিধি:  বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে নওগাঁয় পৃথক দুটি জেলার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক নিদর্শন বলিহার রাজবাড়ী ও পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার পরিদর্শনে এসেছিলেন রাজশাহীতে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার মনোজ কুমার।

এর অংশ হিসেবে শনিবার (১৯সেপ্টেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত বদলগাছী উপজেলায় অবস্থিত পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার ও জাদুঘর পরিদর্শন করেন তিনি। এর আগে একইদিন বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে নওগাঁ  সদর উপজেলার বলিহার এলাকায় অবস্থিত বলিহার রাজবাড়ী পরিদর্শন করেন। এসময় সংসদ সদস্য ডা. ইকরামুল বারী টিপু ফুলেল তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানান সহকারী হাইকমিশনার মনোজ কুমারকে। যৌথভাবে তারা বলিহার রাজবাড়ী চত্বরে পৌঁছালে স্থানীয়রা তাঁদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।

পরিদর্শনকালে তাঁরা ঐতিহাসিক রাজবাড়ীর বিভিন্ন অংশ ও প্রাচীন স্থাপনা ঘুরে দেখেন। একই সাথে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের সাথে কুশল ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। সেখানে মন্দির কমিটিসহ স্থানীয়রা বলিহার রাজবাড়ী ও মন্দিরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে সংস্কারের দাবি জানান। এসময় রাজবাড়ীটির ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ সেই সাথে প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং সার্বিক উন্নয়নের জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার মনোজ কুমার। তাকে সার্বিক সহযোগিতার কথা ব্যক্ত করেন এমপি ডা. ইকরামুল বারী টিপু। এরপর ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার আরেকটি ঐতিহাসিক স্থান পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে পরিদর্শনে যান।

তথ্য সূত্রে জানা যায়, বলিহার রাজবংশের রয়েছে এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। ১৮২৩ সালে জমিদার রাজেন্দ্রনাথ এখানে একটি রাজ-রাজেশ্বরী দেবীর মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। তিনি মন্দিরে পিতলের তৈরি রাজেশ্বরী দেবীর একটি মূর্তি স্থাপন করেছিলেন। মূর্তটি বলিহারসহ এই অঞ্চলের প্রসিদ্ধ ছিল। বলিহার জমিদার পরিবার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নৃসিংহ চক্রবর্তী। সম্রাট আওরঙ্গজেব কর্তৃক জায়গির লাভ করে বলিহারের জমিদাররা এ এলাকায় নানা স্থাপনা গড়ে তোলেন যার মধ্যে বলিহার রাজবাড়ি অন্যতম। দেশ বিভাগের সময়কালে বলিহারের রাজা ছিলেন বিমেলেন্দু রায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এবং পরবর্তীতে রাজবাড়ির বিভিন্ন নিদর্শন, আসবাবপত্র, জানালা দরজাসহ বিভিন্ন সামগ্রী লুট হয়ে যায়। রাজবাড়ীর ভেতরের কম্পাউণ্ডে নাটমন্দির, রাজ-রাজেশ্বরী মন্দির, জোড়া শিব মন্দির আর বিশাল তিনতলা বিশিষ্ট জমিদার বাড়ি। যদিও বিভিন্ন মন্দিরের দেয়ালের কারুকাজ, মূল্যবান রিলিফের কাজগুলো এখন অস্পষ্ট ও ভাঙ্গা। এই কারুকাজগুলো ছিল এই মন্দির গুলোর শোভাবর্ধক।

অপরদিকে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারটি মোট ৭০.৩১ একর জমির উপর অবস্থিত। আয়তনে এর সাথে ভারতের নালন্দা মহাবিহারের তুলনা করা হয়। ১৮৭৯ সালে স্যার কানিংহাম এই বিশাল কীর্তি আবিষ্কার করেন। কথিত আছে বাংলার সুবিখ্যাত ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ও কুমার শরৎকুমার রায় ১৯২৩ সালের ১ মার্চ আনুষ্ঠানিক ভাবে সোমপুর বিহারের প্রতœতাত্বিক খনন শুরু করেন এবং এই খননের মাধ্যমে প্রমানিত হয় এটি ছিল একটি বৌদ্ধ মন্দির ও তৎকালিন বৃহত্তর বিদ্যাপিঠ। সে সময় ভিক্ষুরা পড়ালেখা করতো। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়।  পাহাড়পুরকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার বলা হয়। কাস্টোডিয়ান ফজলুল করিম আরজুর চেষ্টায় বর্তমানে বিহারটিকে আধুনিক মানের করা হয়েছে।

বলিহার রাজবাড়ী পরিদর্শনকালে সংসদ সদস্য ডাঃ ইকরামুল বারী টিপু বলেন, “বলিহার রাজবাড়ী কেবল একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নয়, এটি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক। এই প্রত্নসম্পদ রক্ষা ও চত্বরের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”

ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার মনোজ কুমারও এলাকাটির প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণে সহযোগিতার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

স্থানীয় সচেতন মহল ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে, ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের এই যৌথ পরিদর্শন বলিহার রাজবাড়ীর হারিয়ে যাওয়া গৌরব ফিরিয়ে আনতে এবং ওই এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে আরও সুদৃঢ় করতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে।

বলিহার রাজবাড়ির রাজেশ্বরী দূর্গা মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক খোকন চন্দ্র প্রামানিক বলেন, মান্দার এমপি ডাঃ ইকরামুল বারী টিপু ও ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার মনোজ কুমার স্যার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে একসাথে এসেছিলেন। তাদেরকে সবকিছু দেখালাম। মন্দিরের উন্নয়নের জন্য যদি কোনো প্রয়োজন হয়, তাহলে মনোজ স্যার সার্বিক সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন। আমরাও চাই আমাদের অরক্ষিত ঐতিহ্যবাহী বলিহার রাজবাড়ীটি সংস্কার হোক। তবে তারা আসাতে আমরা সনাতন ধর্মাবলম্বীরা খুব খুশি হয়েছি। এখন শুধু প্রয়োজন একটু সহযোগিতা।

পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের সহকারী পরিচালক (কাস্টোডিয়ান) মোহাম্মদ ফজলুল করিম আরজু বলেন, ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার দুপুর এক টার দিকে পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার পরিদর্শনে এসেছিলেন। ছিলেন প্রায় সাড়ে ৫টা পর্যন্ত। এসময় তিনি জাদুঘরসহ সকল কিছু পরিদর্শন করেন। তার কাছে স্থানটি অনেক ভালো লেগেছে। পরিবার নিয়ে আবারও আসতে চেয়েছেন। তিনি যাওয়ার সময় পরিদর্শনের বহিতে তার মন্তব্য লিখে গেছেন।

ফজলুল করিম আরজু আরও বলেন, বদলগাছী উপজেলায় অবস্থিত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় বিহার পাহাড়পুরের আদি নাম সোমপুর বিহার। এটি মূলত পাল রাজ্যত্বের রাজধানী ও সেই সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো। এখানে সারা বছর দেশ ও বিদেশ থেকে আগত দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটে। তারই ধারাবাহিকতায় ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার স্যার পরিদর্শনে এসেছিলেন। উনি আমাদের কথা শুনেছেন এবং খুশি হয়েছেন। এসময় তার সফর সঙ্গী হিসেবে তিনজন ছিলেন। এছাড়া পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে নিয়োজিত ট্যুরিস্ট পুলিশ ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *