
অর্থনৈতিক প্রতিনিধি। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন নিয়ে-অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে প্রস্তাবিত খনি এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ফুলবাড়িতে এ প্রেক্ষিতে খনিবিরোধী আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। কয়লা মজুদ এলাকার বাকি তিন উপজেলা পার্বতীপুর, বিরামপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলায় কেন প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়নি। চার উপজেলা আপামর সাধারণ মানুষ নীরবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে- আর খনিতে জমি গেলে কতো টাকা পাওয়া যাবে- এরকম ভাবনার মধ্যে আছে বলে সরজমিন পরিদর্শনে জানা যায়।
এদিকে উন্মুক্ত পদ্ধতির খনি নিয়ে সভা সমাবেশে শোনা বক্তব্য ছাড়া স্থানীয় চার উপজেলার মানুষের খুব বেশি জানা আছে বলে মনে হয়নি। জিজ্ঞেস করে তাদের কাছে উন্মুক্ত খনি সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা আছে বলে মনে হয়নি। বরং নানা রকম বিভ্রান্তিকর তথ্য পাওয়া যায়। স্থানীয়রা প্রকৃত কারিগরি তথ্য সম্পর্কে এখনও ওয়াকিফহাল নন। জাতীয় ও স্থানীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলাপ ও অনুসন্ধান জানিয়ে বেরিয়ে এসেছে উন্মুক্ত পদ্ধতির নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।
দেশের ৫টি কয়লা মজুদের মধ্যে একমাত্র বড়পুকুরিয়া থেকে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। খালাশপীর ও দীঘিপাড়া মজুদ নিয়ে সমীক্ষায় ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে খনি করার সুপারিশ এসেছে। বিদেশি কোম্পানি এশিয়া এনার্জি ফুলাবড়িসহ চার উপজেলার কয়লা আবিস্কারের পর সমীক্ষাশেষে সরকারের কাছে উন্নয়ন পরিকল্পনা জমা দিয়েছে দু্ই দশক আগে। ওই পরিকল্পনায় উন্মুক্ত বা ওপেনপিট পদ্ধতিতে খনি করার কথা রয়েছে। অন্যদিকে পঞ্চম কয়লা মজদু জামালগঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত কোন সমীক্ষাই হয়নি। ২০০৬ সালে তেল গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটির আন্দোলন-বিক্ষোভের পর উন্মুক্ত খনির কাজ কোন অগ্রগতি হয়নি। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ফুলবাড়ির বিষয়টি আবার সামনে আসে। উন্মুক্ত খনি বিষয়ে মানুষের জানার আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। দেশের ভয়াবহ জ্বালানি সঙ্কটের প্রেক্ষিতে দ্রুত সমাধান পেতে এর বিকল্প নেই বলে ভাবা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনের সঙ্গে আলাপ-অনুসন্ধানে জানা যায়, উন্মুক্ত বা ভূগর্ভস্থ পদ্ধতি সরকার বা কোন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নির্ধারণের ব্যাপার না। মাটির কতোটা গভীরে, কতোটা পুরুত্বে এবং ভূগর্ভস্থ পানির কোন স্তরে মজুদ বিদ্যমান সে ভিত্তিতে আর্থিক ও কারিগরি বিবেচনায় পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। ফুলবাড়ি প্রকল্পের প্রকাশিত তথ্যাদি থেকে দেখা যায়, পার্বতীপুর, ফুলবাড়ি, বিরামপুর ও নবাবগঞ্জে কয়লা মজুদ ১৫০ থেকে ২৭০ মিটার গভীরতায়। মাটির কম গভীরতার কয়লা মজুদ ওপেন পিট পদ্ধতিতে উত্তোলন করা কারিগরি-আর্থিকভাবে সুবিধাজনক। এই পদ্ধতিতে ৯০ ভাগ সম্পদ উত্তোলনযোগ্য। ভূমি ধসের ঝুঁকি থাকে না। এই কয়লা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে তোলার সুপারিশ আসে সমীক্ষায়। এতে চারউপজেলায় মোট মজুদ ৫৭কোটি ২০ লাখ মেট্রিক টনের মধ্যে তিনদশকের বেশি সময় ধরে প্রায় ৪৭কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন কয়লা তোলা যাবে। তবে এই পদ্ধতিতে মজুদের ওপর বসতি থাকলে তা সরাতে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হয়। বড় বড় প্রকল্পে মানুষের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন ছাড়া প্রকল্প করার কথা জানা যায় না। উত্তরাঞ্চলের এই খনি পরিকল্পনায় পুনর্বাসন সবচেয়ে বড় কাজ হিসাবে দেখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
খনি বিশেষজ্ঞরা জানান, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ভূমির ওপর থেকে মাটি সরিয়ে পাশে রেখে দেয়া হয়। কয়লা উত্তোলনে পর গর্ত বা খাদ ব্যাকফিলিংয়ের মাধ্যমে বন্ধ করে আগের মতো করা হয়। প্রস্তাবিত খনিতে ২০০০ হেক্টর জমিতে একবার খনন করা হবে। কয়লা তোলার পর তা পূনর্ভরণ বা ব্যাকফিলিং করা হবে। এভাবে ক্রমশ খনির উত্তোলন এগোবে উত্তর থেকে দক্ষিণে। জানা যায়, খনি শেষে পুরো এলাকার জমি উৎপাদনমুখী করবে উন্নয়নকারী কোম্পানি। কয়লা উত্তোলনের আগে সরকার খনির যেসব এলাকা অধিগ্রহণ করবে, সবাইকে পুনর্বাসনের আওতায় আবে কোম্পানি। এমনকি পুনর্বাসনের জন্য নতুন শহর ও অনেকগুলো নতুন গ্রাম গড়ে তোলা হবে। উন্মুক্ত খনির ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে কৃষি সহ নানাকাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। জানা যায়, প্রস্তাবিত এই খনিতে ‘ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট’ এর আওতায় পানি পরিশোধন করে কৃষি ও গৃহস্থালি কাজে সরবরাহের সুপারিশ রয়েছে। খনির আশপাশের এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখার জন্য ভূগর্ভে আবার পানি পুনর্ভরণের ছক আঁকা রয়েছে।
উল্লেখ্য, ফুলবাড়ি, পাবর্তীপুর, বিরামপুর ও নবাবগঞ্জের কয়লা উচ্চ জ্বালানি ক্ষমতা যুক্ত উন্নতমানের বিটুমিনাস কয়লা। এ কয়লা জাতীয় কয়লা চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করবে। বছরে আড়াই বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারলে বলে ধারণা করা হয়েছে।
