
নওগাঁ প্রতিনিধি: বাংলাদেশের আমের রাজধানী নওগাঁয় হঠাৎ করেই এবার আমের ভরা মৌসুমের প্রথম থেকেই নেই আমের আশানুরূপ দাম। জমি ও গাছ পরিচর্যা, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ও প্যাকেজিং খরচ বাড়লেও সেই হিসাবে বাড়েনি আমের দাম। এতে লাভের পরিমাণ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে আম চাষী ও বাগানিদের।
তবে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে বাজারে সব জাতের আম সরবরাহ কমে যাওয়ায় ও মওসুমের সময় মধ্য অবস্থায় চলে আসায় বেড়ে গেছে আমের দাম।
বর্তমানে জেলার সবচেয়ে বড় আমের মোকামগুলোর একটি সাপাহারে প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু হচ্ছে কেনাবেচা। তবে আড়ত চলে সকাল ৮ টা থেকে রাত টার ৮টা পর্যন্ত। দূর-দূরান্ত থেকে চাষিরা তাদের বাগানের আম নিয়ে আসছেন মোকামে। এদিকে বাজারে আমের সরবরাহ বাড়লেও দাম নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে অনেকের। বাজারে আম্রপালী বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ১ হাজার ৭শত থেকে ৪ হাজার টাকা মণ দরে। এছাড়া বারি-৪ ২২শত থেকে ২৫শত টাকা, ব্যানানা ম্যাঙ্গো ৩৫০০ থেকে ৪০০০ হাজার, হাঁড়িভাঙ্গা ৩হাজার ৬শত থেকে ৩ হাজার ৮শত টাকা। তাছাড়া দুপুরের পর থেকে সরবরাহ কিছুটা কমে গেলে মণ প্রতি ৩০০/৪০০ টাকা বৃদ্ধি পায়। এখানে প্রতিদিন ৫ কোটি টাকার বেশি আম বেচাকেনা হচ্ছে।
বিভাগের কৃষি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে জেলায় আম বাগান ছিল মাত্র ৬ হাজার ২৬৮ হেক্টর জমিতে। লাভজনক হওয়ায় বর্তমানে এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টরে। মাত্র এক দশকে প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে আমের আবাদ। চলতি মৌসুমে এসব বাগান থেকে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন।
জনপ্রিয় জাত আম্রপালী আমের ভালো ফলনের আশার মধ্যেও দুশ্চিন্তায় ছিলেন আম চাষিসহ বাগানিরা। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্পের অভাবে প্রতি বছর ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে বিপুল পরিমাণ আম।
এ বিষয়ে উৎআম চাষিরা বলছেন, প্রতি বছর উৎপাদন খরচ ও শ্রমিকের মজুরি বাড়লেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত দাম। এ ছাড়া ফলন বেশি হলে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে বাজারে আমের দাম কমিয়ে দেন। ফলে ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকতে হয়। ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন চাষিরা। অন্যদিকে বড় কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান না থাকায় মৌসুমে নষ্ট হচ্ছে ৩০০-৪০০ কোটি টাকার আম। তাছাড়া ঢলতা হিসেবে তাঁদের কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে ক্যারেটসহ ৫২ কেজিতে মণ। এমন ঢলতা তাঁদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়ে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, জেলায় চলতি মৌসুমে ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। যা থেকে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিকটন।
গত বছর জেলায় ৩০ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছিল এবং উৎপাদন হয়েছিল ৩ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিকটন আম।
জেলা প্রশাসনের ঘোষণা অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৫ মে থেকে জেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে আম সংগ্রহ শুরু হয়। এরপর ধাপে ধাপে বাজারে উঠতে থাকে গুটি, হিমসাগর, নাগ ফজলি, আম্রপালি, ন্যাংড়া, খিরসাপাত, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, হাঁড়িভাঙ্গা, সুরমা ফজলী,ড্যাপা ফজলী গৌড়মতিসহ নানা জাতের আম। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও পাঠানো হচ্ছে এসব আম।
বাগানি ও আম চাষিদের হিসাবে, এক বিঘা মাঝারি আকারের বাগানে সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ মণ আম উৎপাদন হয়। জমির ইজারা, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিক মজুরি, পরিবহন ও প্যাকেজিং খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিঘায় উৎপাদন ব্যয় গিয়ে ঠেকেছে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকায়। সেই হিসেবে প্রতি মণ আম উৎপাদনে তাদের ব্যয় করতে হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ টাকা থেকে প্রায় ২ হাজার টাকা। বর্তমানে প্রতি মণ আম বাগান থেকে মোকামে পৌঁছাতে গড়ে ৩২ থেকে ৩৪ টাকা ব্যয় হচ্ছে। এতে প্রতি মণ আম ১ হাজার ৫০০ টাকার নিচে বিক্রি হলে অনেক ক্ষেত্রেই লাভ পাওয়া সম্ভব হয় না।
সাপাহার উপজেলার বাসুলডাঙ্গার আমচাষী সায়েদ আলী মণ্ডল বলেন, তাঁর প্রায় ২০ বিঘা আম্রপালী আমের বাগান আছে। এর মধ্যে পোরশার পলাশবাড়ী মৌজায় ১০ বিঘা (৩৩৫ শতক) জমিতে আম্রপালীর বাগান ২০২২ সালে রোপণ করেছি। আম পাকা শুরু হলে ২৫-৩০ দিনের মধ্যেই তা শেষ হয়ে যায়। কৃষক চাইলেও তখন আর কোনোভাবে বাগানের আম গাছে রাখতে পারেন না। বাজারে আমের আমদানি বেশি হলে আড়তদার ব্যবসায়িরা সিন্ডিকেট করে আমের দাম কমিয়ে দেন। তখন কৃষকরা আম প্রসেসিং করার কোন প্রকার সুযোগ ও কোন উপায় না থাকায় কম দামে আম বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। এতে করে আমরা সাধারণ কৃষকরা চরম লোকসানের মুখে পড়ি। বড় কোনো হিমাগার অথবা আমকেন্দ্রিক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে কৃষকরা লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পেতেন।
দিঘিরহাট এলাকার আমচাষি আব্দুল মান্নান মন্টু জানান, ৬ বিঘা জমিতে তার আম্রপালী আমের বাগান রয়েছে। প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। ফলন ভালো হলেও বর্তমান বাজার দর নিয়ে তিনি একেবারেই সন্তুষ্ট নন। তাঁর আশা, মওসুমের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে চাহিদা বাড়লে দামও বাড়বে। এ বছর অনেক গাছে আমের পরিমাণ তুলনামূলক কম। গত বছর মওসুমের শুরুতেই আম্রপালী অনেক বেশি দামে বিক্রি হয়েছিল। এবার দাম কম থাকায় উৎপাদন খরচ ওঠানো নিয়েই নানা শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পোরশা উপজেলার পুরইল গ্রামের আম চাষী মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ শাহ্ জানান, তিনি কামারধা মৌজায় বিশ বিঘা জমিতে আম্রপালী চাষ করেছেন। তার মতে, বর্তমান বাজার দরে খুব বেশি লাভের সুযোগ নেই। তবে মওসুমের শেষ দিকে দাম কিছুটা বাড়লে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে বলে তিনি আশা করেন। তবে তিনি নিজে আম ভেঙ্গে বিক্রি না করে ৬ লাখ টাকায় সাপাহারের এক পার্টির কাছে বাগানের আম আগাম বিক্রি করে দিয়েছেন।
একই এলাকার আরেক চাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি পুরইল মৌজায় ৩ (১০৩ শতক) বিঘা জমিতে ২০২২ সালে বারি-৪ আম চাষ করেছেন। গত বছর বাগানেই ৪৫ হাজারে বিক্রি করে দেন। জমি মালিককে প্রতি বিঘা ২২ হাজার করে ৬৮হাজার ৬০০ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। সেবার তাঁর ৩৫ হাজার টাকা লস হয়েছে। তবে এবারে এখনো বিক্রি করতে পারেননি। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কত টাকায় বিক্রি করা যায়।
একই উপজেলার নোনাহার গ্রামের আমচাষি জালাল উদ্দিন শাহ্ বলেন, শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি মসিদপুর মৌজায় ৮ বিঘা জমিতে গৌড়মতি আম চাষ করেছেন। এছাড়া তিনি ১২ বিঘা জমিতে আম্রপালী চাষ করেছেন। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর আবহাওয়া শুরু থেকেই আম চাষের অনুকূলে নয়। যার কারণে প্রায় সব বাগানেই আমের পরিমাণ কম। গত বছর মানভেদে আম্রপালী মণপ্রতি ১৫০০-৪০০০ হাজার টাকা দরে বিক্রি করেছি। এ বছর ৩ হাজার টাকার কমে আম বিক্রি হলে উৎপাদন খরচ ওঠানো সম্ভব হবে না।
তিনি আরো বলেন, পোরশার সরাইগাছি এলাকায় আম কেন্দ্রিক শিল্প প্রতিষ্ঠান বা ম্যাংগো প্রসেসিং জোন থাকলে কৃষকরা আমের ন্যায্যমূল্য পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
আশার জায়গা আম রপ্তানি বৃদ্ধি:
দাম নিয়ে চাষিদের উদ্বেগের মধ্যেও আশার জায়গা হয়ে উঠছে রপ্তানি। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের আমের চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে। রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের লক্ষ্যে চলতি মৌসুমে জেলার ১৮৬ হেক্টর জমিতে আম্রপালি, ব্যানানা ম্যাংগো ও গৌড়মতি জাতের প্রায় ১ কোটি ১১ লাখের বেশি আমে ফ্রুট ব্যাগিং করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত আম তুলনামূলক নিরাপদ ও আকর্ষণীয় হওয়ায় বিদেশি বাজারে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়।
গত বছর জেলার সাপাহার ও পোরশা উপজেলা থেকে বিভিন্ন রপ্তানিকারকের মাধ্যমে ২৮৪ টন আম মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছিল। কৃষি সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সঠিক পরিকল্পনা ও বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই পরিমাণ কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব।
সাপাহার উপজেলা আম আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমাম হোসেন রিফাত বলেন, সারা দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় আমের হাট সাপাহার। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েক হাজার ব্যবসায়ী প্রতি বছর এখানে আম কেনাবেচা করতে আসেন। এ বাজারে মৌসুমে ৬ হাজার থেকে সাত হাজার কোটি টাকার আম কেনাবেচা হয়। আমাদের যা আম উৎপাদন হয় তার ২০ শতাংশ আম নষ্ট হয়ে যায়। যার বাজারমূল্য ৩০০-৪০০ কোটি টাকা। বড় কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান তৈরি হলে কৃষকদের পাশাপাশি ব্যবাসয়ীরাও লাভবান হবেন। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে এখানে আমকেন্দ্রিক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক হুমায়রা মণ্ডল বলেন, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ভারী শিল্প স্থাপনের বিষয়ে বিভিন্ন সমন্বয় মিটিংয়ে প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়। কৃষি বিভাগের একটি প্রজেক্ট রয়েছে রফতানি যোগ্য আম উৎপাদন। আমরা সেখানে সাপাহার অঞ্চলে কুলিং হাউস এবং প্যাকিং হাউস নির্মাণের বিষয়ে সুপারিশ করেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি হলে কৃষকরা লাভবান হবেন।