👁 394 Views

‎রোগের চিকিৎসার চেয়ে কারণ বন্ধ করা জরুরি- ভেজাল খাদ্য প্রতিরোধই হোক জাতীয় অগ্রাধিকার

                                  ‎-আশিকুর রহমান সবুজ   ‎

‎​দেশের স্বাস্থ্য খাতের দিকে তাকালে একটি চিরচেনা চিত্র ফুটে ওঠে—হাসপাতালগুলোতে রোগীদের উপচে পড়া ভিড়, ওষুধের দোকানে দীর্ঘ লাইন আর সাধারণ মানুষের আয়ের সিংহভাগ চিকিৎসা ব্যয়ের পেছনে চলে যাওয়া। প্রতি বছর বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বাড়ছে, তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন অবকাঠামো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি আসলেই একটি সুস্থ জাতি গড়ে তুলতে পারছি? নাকি অসুস্থতার পেছনে কেবল অর্থ ঢেলে যাচ্ছি? চিকিৎসাবিজ্ঞানের আদি এবং চিরন্তন সত্য হলো—’প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’। অথচ আমাদের পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে প্রতিকার বা চিকিৎসার ওপর ভিত্তি করে। এখনই সময় এই ধারা পরিবর্তনের। রোগের চিকিৎসার পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের চেয়ে রোগের মূল কারণ বন্ধ করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

‎​আমাদের দেশে অসংক্রামক ব্যাধি যেমন—ক্যান্সার, কিডনি বিকল, লিভার সিরোসিস, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, এর অন্যতম প্রধান ও প্রত্যক্ষ কারণ হলো অনিরাপদ এবং ভেজাল খাদ্য। প্রতিদিন আমরা যে চাল, ডাল, মাছ, মাংস, ফলমূল কিংবা প্রক্রিয়াজাত খাবার টেবিলে তুলছি, তার একটি বড় অংশই কোনো না কোনোভাবে বিষাক্ত কেমিক্যালে দূষিত। এই ভেজাল খাদ্য নামক ‘ধীরে কাজ করা বিষ’ (Slow Poison) আমাদের দেশের মানুষের ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে প্রতিনিয়ত ধ্বংস করছে। আমরা একদিকে বিষ খেয়ে অসুস্থ হচ্ছি, অন্যদিকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে সেই রোগ নিরাময়ের চেষ্টা করছি—এই আত্মঘাতী চক্র থেকে আমাদের বের হতে হবে।

‎‎​যদি আমরা স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতের মোট বাজেটের মাত্র ২০ শতাংশ অর্থ কঠোরভাবে ভেজাল খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং নিবিড় বাজার মনিটরিংয়ে ব্যয় করতে পারি, তবে দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল হবে অভাবনীয়। একটি বাস্তবসম্মত হিসাব বলছে, খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে স্বাস্থ্য খাতের মোট ব্যয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব। এটি কোনো কাল্পনিক সংখ্যা নয়, বরং একটি বিশুদ্ধ অর্থনৈতিক সমীকরণ। যখন বাজারে খাদ্যের মান নিশ্চিত হবে এবং মানুষ রাসায়নিকমুক্ত খাবার পাবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার অর্ধেকের বেশি কমে যাবে। ফলে একদিকে যেমন সরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর রোগীর চাপ কমবে, অন্যদিকে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে চিকিৎসার পেছনে নিঃস্ব হতে হবে না। ওষুধের পেছনে দেশের যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়, তাও সাশ্রয় হবে।

‎​খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এটিকে কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক কাজ হিসেবে দেখলে চলবে না; একে ঘোষণা করতে হবে ‘জাতীয় অগ্রাধিকার’ হিসেবে। এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত কিছু পদক্ষেপ:

‎​বাজেটের কৌশলগত পুনর্বিন্যাস: স্বাস্থ্য বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং বাজার মনিটরিং সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বরাদ্দ দেওয়া।

‎‎​প্রযুক্তির ব্যবহার ও আধুনিক ল্যাব: উপজেলা ও জেলা পর্যায় পর্যন্ত অত্যাধুনিক ফুড টেস্টিং ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং নিয়মিত মোবাইল কোর্টের কার্যকারিতা বাড়ানো।

‎​কঠোর আইনের দৃষ্টান্তমূলক প্রয়োগ: খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান কার্যকর করা, যাতে কেউ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস না পায়।

‎‎​উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত তদারকি: কৃষকের মাঠ থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা বাজার—প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

‎​একটি সুস্থ, সবল ও মেধাবী জাতি ছাড়া কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমরা যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ উপহার দিতে চাই, তবে হাসপাতালের শয্যা বাড়ানোর চেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে আমাদের ভাতের থালাটি বিষমুক্ত করার ওপর। চিকিৎসালয় বাড়ানোর চেয়ে রোগ সৃষ্টির পথ বন্ধ করাই আসল বুদ্ধিমত্তা। নীতিনির্ধারকদের কাছে আকুল আবেদন, স্বাস্থ্য খাতের নীতিগত দর্শনে পরিবর্তন আনুন। ভেজাল খাদ্য নিয়ন্ত্রণকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে এখনই স্বাস্থ্য বাজেটের সঠিক পুনর্বিন্যাস করুন। সুস্থ বাংলাদেশ গড়ার এটাই হোক মূল ভিত্তি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *