👁 232 Views

২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ‘তামাকমুক্ত’ করার মহাপরিকল্পনা: আমাদের প্রস্তুতি ও করনীয় /

                                        লেখক: মুহাম্মদ রাশেদ খান

ভূমিকা:
টেকসই উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ ‘তামাকমুক্ত’ করার দূরদর্শী মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে [theunion.orgwho.int]。 বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (FCTC)-এর আলোকে প্রণীত এই রোডম্যাপের মূল লক্ষ্য হলো আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে দেশে তামাকের ব্যবহার ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা। তামাকের কারণে প্রতি বছর দেশে অগণিত মানুষের অকালমৃত্যু, বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং কৃষি জমির উর্বরতা হ্রাসের মতো বহুমাত্রিক সংকট তৈরি হচ্ছে। এই জাতীয় ক্ষতি রুখতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ উপহার দিতে সরকার আইন সংস্কার, কঠোর কর নীতি, বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধকরণ এবং তামাক চাষিদের বিকল্প পুনর্বাসনের মাধ্যমে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে।
১. তামাকের কারণে বার্ষিক মৃত্যু ও অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিসংখ্যান (অনূচ্ছেদ)বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির সাম্প্রতিক যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, তামাকের ব্যবহার বাংলাদেশে একটি নীরব মহামারি সৃষ্টি করেছে। দেশে প্রতি বছর তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে (যেমন ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং সিওপিডি) আক্রান্ত হয়ে আনুমানিক ১,৬১,০০০ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৪০ জন মানুষ তামাকের কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন। শুধু জীবনহানিই নয়, তামাকের এই ছোবলে দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তামাক ব্যবহারকারীদের চিকিৎসা ব্যয় এবং উৎপাদনশীলতা হারানোর কারণে প্রতি বছর দেশের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০,৫৬০ কোটি টাকা, যা তামাক খাত থেকে অর্জিত বার্ষিক রাজস্ব আয়ের চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া পরোক্ষ ধূমপানের কারণে দেশের প্রায় ৩ কোটি ৮৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এবং বিপুল সংখ্যক শিশু প্রতিনিয়ত চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।
২. ২০৪০ সালের তামাকমুক্ত মহাপরিকল্পনার প্রধান মূলমন্ত্র ও স্লোগানবাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করার এই জাতীয় আন্দোলনে জনসচেতনতা বাড়াতে এবং মাঠপর্যায়ে কঠোর বার্তা দিতে বেশ কিছু মূলমন্ত্র ও স্লোগান ব্যবহার করা হচ্ছে:
“২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ” (প্রধান লক্ষ্য ও ভিশন)।
“তামাক নয়, খাদ্য ফলান” (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল প্রতিপাদ্য, যা বৃহত্তর কুষ্টিয়াসহ দেশের তামাক চাষিদের বিকল্প ফসল চাষে উৎসাহিত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে)।
“তামাকমুক্ত প্রজন্ম, আমাদের অঙ্গীকার” (তরুণদের ই-সিগারেট ও ভেপিং থেকে দূরে রাখার স্লোগান)
“জীবন বাঁচান, তামাক ছাড়ুন” (স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক মূলমন্ত্র)
২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ‘তামাকমুক্ত’ করার মহাপরিকল্পনা মূলত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (FCTC) এবং উন্নত দেশের সফল ‘ক্ষতি হ্রাস কৌশল’ (Harm Reduction Strategy)-এর আলোকেই তৈরি করা হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো ২০৪০ সালের মধ্যে তামাক বা তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা।এই মহাপরিকল্পনা বা রোডম্যাপের প্রধান স্তম্ভ এবং বাস্তবায়ন কৌশলগুলো নিচে বিশদভাবে দেওয়া হলো:
১. তামাকের চাষ ও উৎপাদন নিয়ন্ত্রণনগদ ফসলের তালিকা থেকে বাদ: 
সরকারিভাবে তামাককে আর ‘অর্থকরী ফসল’ বা নগদ ফসলের তালিকায় রাখা হচ্ছে না।সরকারি খাস জমি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা: লিজ দেওয়া কোনো সরকারি খাস জমিতে তামাক চাষ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার আইনি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।ব্যাংক ঋণ বন্ধ ও বিকল্প ফসলে প্রণোদনা: তামাক চাষের জন্য কৃষকদের যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যাংক ঋণ দেওয়া বন্ধ করা হয়েছে। এর বিপরীতে যারা তামাক ছেড়ে ভুট্টা, ধান বা সবজি চাষ করবেন, তাদের বিশেষ ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
২. শক্তিশালী আইন সংস্কার (২০২৬ সংশোধনী) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন মেনে সম্প্রতি আইন ও নীতিগত ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে:
শতভাগ ধোঁয়ামুক্ত এলাকা: 
সব ধরনের পাবলিক প্লেস এবং ইনডোর স্পেসে ‘ডেজিগনেটেড স্মোকিং জোন’ বা ধূমপানের নির্দিষ্ট এলাকা রাখার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে।
সচিত্র সতর্কবার্তা বৃদ্ধি: 
তামাকজাত পণ্যের প্যাকেটে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তার আকার ৫০% থেকে বাড়িয়ে ৭৫% করা হয়েছে এবং মোড়কীকরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি বিক্রি নিষিদ্ধ: 
স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং খেলার মাঠের ১০০ মিটারের মধ্যে যেকোনো ধরনের তামাক বা নিকোটিন পণ্য বিক্রি সম্পূর্ণ বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে।
ই-সিগারেট ও ভেপিং নিষিদ্ধ: 
উদীয়মান সব তামাক পণ্য (যেমন ই-সিগারেট, হিটেড টোব্যাকো) আমদানি ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
৩. কর ও রাজস্ব নীতি (Health Development Surcharge):
তামাকের খুচরা মূল্যের ওপর ১% স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ (Health Development Surcharge) আরোপ করা হয়েছে। এই সংগৃহীত তহবিলটি জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল (NTCC) এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে তামাকবিরোধী গণসচেতনতা তৈরি, মাঠপর্যায়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং তামাক চাষিদের পুনর্বাসনে ব্যবহার করা হচ্ছে।
৪. বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা (TAPS Ban):
তামাক কোম্পানিগুলোর সমস্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিজ্ঞাপন, স্পন্সরশিপ এবং প্রচারণামূলক কার্যক্রম (TAPS) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।কোম্পানিগুলো সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রম বা করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (CSR)-এর নামে কোনো ধরনের চ্যারিটি বা প্রচার চালাতে পারবে না।
৫. মাঠপর্যায়ের লক্ষ্যমাত্রা:
বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির গবেষণা অনুযায়ী, এই মহাপরিকল্পনা সফল করতে প্রতি বছর ন্যূনতম ১৮ লাখ বর্তমান তামাক ব্যবহারকারীকে এই অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে এবং তরুণ প্রজন্মকে তামাকের প্রাথমিক সংযুক্তি থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখতে হবে।
বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের (মূলত কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা) মধ্যে কুষ্টিয়া জেলায় সবচেয়ে বেশি তামাক আবাদ হয়। কৃষি তথ্য অনুযায়ী, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর, ভেড়ামারা ও মিরপুর উপজেলায় প্রতি মৌসুমে প্রায় ১১,৩৮৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়ে থাকে। এর মধ্যে শুধুমাত্র মিরপুর উপজেলায় প্রায় ৬,৪৫৫ হেক্টর এবং দৌলতপুর উপজেলায় ৩,৬৯৬ হেক্টর জমিতে তামাক আবাদ হয়।বৃহত্তর কুষ্টিয়ার কৃষি ও তামাক চাষের তথ্য সম্পর্কে আরও জানতে বা নির্দিষ্ট কোনো উপজেলার পরিসংখ্যান সম্পর্কে জানতে চাইলে জানাতে পারেন।
বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের অন্তর্গত মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার তামাক চাষের পরিস্থিতি এবং তামাকের আবাদ নিয়ন্ত্রণে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার তামাক চাষের পরিসংখ্যান:
কুষ্টিয়া জেলার মতো মেহেরপুর এবং চুয়াডাঙ্গাতেও তামাক কোম্পানিগুলোর দেওয়া অগ্রিম ঋণ, বিনামূল্যে বীজ-সার এবং নিশ্চিত বাজারের প্রলোভনে পড়ে কৃষকরা ব্যাপক হারে তামাক চাষ করছেন।
মেহেরপুর জেলা: 
মেহেরপুর সদর, গাংনী এবং মুজিবনগর—এই তিনটি উপজেলাতেই প্রতি বছর হাজার হাজার হেক্টর জমিতে তামাকের আবাদ হচ্ছে। বিশেষ করে গাংনী ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠে রবি শস্য ও সবজির পরিবর্তে তামাক চাষ দিন দিন বাড়ছে। এখানে সাধারণত ২,৫০০ থেকে ৩,৫০০ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়ে থাকে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা: 
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা ও দামুড়হুদা উপজেলায় তামাকের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। এই জেলায় আনুমানিক ১,৫০০ থেকে ২,০০০ হেক্টর জমিতে তামাকের আবাদ হয়।
নোট: তামাক কোম্পানিগুলোর আগ্রাসনের কারণে স্থানীয় কৃষি বিভাগ প্রতি বছর আবাদ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
২. তামাক চাষ কমানো বা নিয়ন্ত্রণে সরকারি পদক্ষেপ:
সরকার ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ‘তামাকমুক্ত’ করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কৃষি বিভাগ এবং প্রশাসন বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে:
বিকল্প ফসল চাষে প্রণোদনা ও ঋণ: 
তামাকের পরিবর্তে লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প ফসল হিসেবে ভুট্টা, সরিষা, বোরো ধান এবং শীতকালীন সবজি চাষে কৃষকদের সরকারিভাবে বিনামূল্যে বীজ ও সার দেওয়া হচ্ছে।
পিকেএসএফ (PKSF) এর বিশেষ উদ্যোগ: 
সরকারি সহযোগী সংস্থা পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (PKSF) বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলে তামাক চাষিদের পুনর্বাসনের জন্য কাজ করছে। তামাক ছেড়ে নিরাপদ খাদ্য ফসল চাষ করলে কৃষকদের সহজ শর্তে বিশেষ কৃষি ঋণ দেওয়া হচ্ছে।
সচেতনতা বৃদ্ধি ও মাঠ দিবস: 
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) নিয়মিত উঠান বৈঠক ও মাঠ দিবসের মাধ্যমে তামাক চাষের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি (যেমন মাটির উর্বরা শক্তি হ্রাস, নাইট্রোজেন-পটাশিয়ামের চরম ঘাটতি এবং ক্যানসারের ঝুঁকি) সম্পর্কে কৃষকদের সচেতন করছে।
আইনি ও নীতিগত কঠোরতা: 
জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল (NTCC) তামাক কোম্পানির প্রলোভন ও সরাসরি মাঠ পর্যায়ের বিপণন কার্যক্রমের ওপর কঠোর নীতিমালা আরোপের চেষ্টা করছে, যাতে তারা কৃষকদের অগ্রিম চুক্তি করতে বাধ্য করতে না পারে।
বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলে তামাক এবং এর প্রধান বিকল্প ফসল ভুট্টার বিঘাপ্রতি (৩৩ শতাংশ) উৎপাদন খরচ ও মুনাফার একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো।মাঠপর্যায়ের তথ্য এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (PKSF) এর সমীক্ষা অনুযায়ী, বাহ্যিক দৃষ্টিতে তামাক চাষ লাভজনক মনে হলেও পরিশ্রম, সময় এবং মাটির স্বাস্থ্যের ক্ষতি বিবেচনা করলে ভুট্টার মতো বিকল্প ফসল চাষ অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও নিরাপদ।
বিঘা প্রতি তামাক বনাম ভুট্টা চাষের তুলনামূলক ছক:
ছক বিষয়তামাক চাষভুট্টা চাষউৎপাদন সময়প্রায় ৫ থেকে ৬ মাসমাত্র ৩ থেকে ৪ মাসবিঘাপ্রতি খরচ৪০,০০০ – ৪৫,০০০ টাকা১৫,০০০ – ২০,০০০ টাকাগড় উৎপাদন৮ – ১০ মণ (শুকনো পাতা)৪৫ – ৫০ মণবাজার মূল্য৮০,০০০ – ৯০,০০০ টাকা৪৫,০০0 – ৫০,০০০ টাকানিট লাভ (গড়)৪০,০০০ – ৪৫,০০০ টাকা৩০,০০০ – ৩৫,০০০ টাকাশারীরিক শ্রমচরম মাত্রায় (পুরো পরিবার ব্যস্ত থাকে)অত্যন্ত কম (সহজ পরিচর্যা)জ্বালানি খরচতামাক পোড়াতে প্রচুর কাঠের প্রয়োজন হয়কোনো জ্বালানি খরচ নেইমাটির উর্বরতাউর্বরা শক্তি ও পুষ্টিগুণ মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়মাটির ক্ষতি হয় না, গাছের অবশিষ্টাংশ জৈব সার হয়মূল পার্থক্যের কারণসমূহ:
সময় ও ফসল চক্র: 
তামাকের পেছনে কৃষকের যে ৬ মাস সময় নষ্ট হয়, সেই একই সময়ে একজন কৃষক ভুট্টা তুলে আরেকটি বাড়তি ফসল (যেমন ডাল বা সবজি) ঘরে তুলতে পারেন। ফলে সামগ্রিক লাভ তামাকের চেয়ে বেশি হয়।
প্রকৃত লাভ বনাম দৃশ্যমান লাভ: 
তামাক বিক্রি করে এককালীন বেশি টাকা দেখা গেলেও এতে সার ও কীটনাশকের পেছনে বিপুল টাকা খরচ হয়। এছাড়া পরিবারের সদস্যদের যে হাড়ভাঙা খাটুনি দিতে হয়, তার মজুরি হিসাব করলে তামাক চাষে প্রকৃত লাভ অনেক কমে যায়।
কোম্পানির ফাঁদ: 
তামাক কোম্পানিগুলো শুরুতে বিনামূল্যে বীজ ও সার দিয়ে কৃষকদের চুক্তিভুক্ত করে। কিন্তু ফসল কাটার পর তারাই আবার দর নির্ধারণ করে, ফলে কৃষকরা অনেক সময় ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। অন্যদিকে ভুট্টার বাজার এখন অনেক স্থিতিশীল এবং পোল্ট্রি ও মাছের খাদ্যের জন্য এর চাহিদা ব্যাপক।
তামাকের বিকল্প উচ্চমূল্যের সবজি চাষের লাভ-ক্ষতি এবং তামাক চাষের কারণে মাটির স্থায়ী ক্ষতির পরিসংখ্যানগত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. তামাকের বিকল্প সবজি চাষের লাভ-ক্ষতির পরিসংখ্যান:
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের তথ্য এবং দেশ রূপান্তর-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আধুনিক পদ্ধতিতে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ, আলু, খিরা বা পেঁপের মতো উচ্চমূল্যের বিকল্প ফসল আবাদ করে কৃষকরা তামাকের চেয়ে ন্যূনতম চারগুণ বেশি আর্থিক লাভ করতে পারছেন।
নিচে বিঘাপ্রতি (৩৩ শতাংশ) একটি গড় খরচের তুলনামূলক পরিসংখ্যান দেওয়া হলো:
শীতকালীন পেঁয়াজ:
বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ প্রায় ২০,০০০ – ২৫,০০০ টাকা। ফলন হয় প্রায় ৫০ – ৬০ মণ। বর্তমান বাজারদরে (গড় ১,৫০০ টাকা মণ) এটি বিক্রি করে নিট লাভ থাকে ৫০,০০০ – ৬০,০০০ টাকা। তামাকের চেয়ে এটি অনেক কম সময়ে (১১০ দিন) ঘরে তোলা যায়।
আলু:
বিঘাপ্রতি খরচ ৩০,০০০ – ৩৫,০০০ টাকা। ফলন হয় ৮০ – ১০০ মণ। বাজারমূল্য ভালো থাকলে সব খরচ বাদ দিয়ে নিট লাভ থাকে ৪০,০০০ – ৫০,০০০ টাকা।
খিরা/শসা:
এটি অত্যন্ত স্বল্পমেয়াদি এবং উচ্চফলনশীল। বিঘাপ্রতি ১৫,০০০ – ২০,০০০ টাকা খরচ করে মাত্র ৬০-৭০ দিনে ৩৫,০০০ – ৪৫,০০০ টাকা নিট মুনাফা করা সম্ভব।
তামাক (তুলনা):
যেখানে তামাক চাষে বিঘাপ্রতি প্রায় ৪০,০০০ – ৪৫,০০০ টাকা খরচ করে ৫-৬ মাস হাড়ভাঙা খাটুনির পর নিট লাভ থাকে ৪০,০০০ – ৪৫,০০০ টাকা।
২. তামাক চাষের কারণে মাটির স্থায়ী ক্ষতির পরিসংখ্যান:
গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন সূচক অনুযায়ী, তামাক চাষ সাময়িকভাবে বেশি লাভজনক মনে হলেও এটি মাটির উর্বরতা ও স্বাস্থ্যকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছে। কুষ্টিয়া ও উত্তরবঙ্গের তামাক চাষের ওপর করা গবেষণা প্রতিবেদন এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা থেকে প্রাপ্ত কিছু ভীতিজাগানিয়া পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো:
মাটির রাসায়নিক স্বাস্থ্যের অবক্ষয়:
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ ফসলি জমির তুলনায় তামাক চাষের জমিতে মাটির গুণগত মান বা সয়েল কোয়ালিটি ইনডেক্স (SQI) ১৯.২৩% এবং মাটির রাসায়নিক স্বাস্থ্য সূচক (SHI) ২৭.৮৭% পর্যন্ত হ্রাস পায়।
তীব্র অম্লত্ব বা অ্যাসিডিক হওয়া:
কুষ্টিয়া অঞ্চলের তামাক জমিতে পরপর দুই বছর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, তামাক চাষের আগে মাটির গড় পিএইচ (pH) মান ৭.৮৬ থাকলেও মাত্র দুই মৌসুম পর তা কমে ৭.৪৪ এ নেমে আসে। মাটি অতিরিক্ত অ্যাসিডিক হয়ে যাওয়ার কারণে ওই জমিতে অন্য কোনো খাদ্যশস্যের স্বাভাবিক ফলন বাধাগ্রস্ত হয়।
পুষ্টি উপাদান নিঃশেষ হওয়া:
তামাক গাছ মাটি থেকে অন্য যেকোনো ফসলের চেয়ে দ্রুত নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম (NPK) শুষে নেয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৬২.১৬% কৃষক স্বীকার করেছেন যে তামাক চাষের কারণে তাদের জমির উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে কমছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষকরা প্রতি বছর প্রায় ৩৫.১৪% বেশি রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা মাটিকে আরও অকেজো করে তুলছে।
অণুজীব ও মাটির জৈবিক মৃত্যু:
২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, তামাক চাষের জমিতে উপকারী অণুজীব (Microbial biomass) এবং এনজাইমের কার্যকারিতা ৩৫% থেকে ৬০% পর্যন্ত কমে গেছে। এর ফলে মাটি প্রাকৃতিকভাবে পুষ্টি তৈরির ক্ষমতা হারিয়ে সম্পূর্ণ ‘মৃত মাটিতে’ পরিণত হচ্ছে।
451
টপসয়েল বা উপরিভাগের মাটি ক্ষয়:
উবিনীগ (UBINIG) এর পরিবেশগত সমীক্ষা অনুযায়ী, তামাক চাষের ফলে প্রতি হেক্টর জমি থেকে বছরে প্রায় ১০০ কেজিরও বেশি উর্বর উপরিভাগের মাটি (Topsoil) ক্ষয় হয়ে হারিয়ে যায়।
তামাক চাষের ফলে কৃষক ও তাদের পরিবারের তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং তামাক নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনের আইনি ভূমিকা সম্পর্কিত বিস্তারিত পরিসংখ্যান ও তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
১. তামাক চাষের ফলে কৃষক ও পরিবারের স্বাস্থ্যঝুঁকির পরিসংখ্যানতামাক পাতা রোপণ, পরিচর্যা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় কৃষকদের শরীর সরাসরি কাঁচা তামাক পাতার সংস্পর্শে আসে। এর ফলে নিকোটিন ত্বকের মাধ্যমে রক্তে মিশে গিয়ে ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’ (GTS) নামক মারাত্মক ব্যাধির সৃষ্টি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বাংলাদেশের স্থানীয় বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য সমীক্ষা অনুযায়ী এই স্বাস্থ্যঝুঁকির ভয়াবহ পরিসংখ্যান নিচে দেওয়া হলো:
গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস (GTS):
তামাক চাষে নিয়োজিত কৃষকদের প্রায় ১৮% থেকে ২৪% নিয়মিত এই রোগে আক্রান্ত হন। কাঁচা পাতা থেকে নির্গত নিকোটিন ত্বকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করায় কৃষকরা তীব্র মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, মাথাব্যথা এবং শ্বাসকষ্টে ভোগেন।
নারী ও শিশুদের উচ্চ ঝুঁকি:
বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলে তামাক পাতা তোলা এবং শুকানোর কাজে পরিবারের নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি নিয়োজিত থাকে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকায় বসবাসকারী ৪০% এর বেশি শিশু পরোক্ষ নিকোটিন বিষক্রিয়া এবং ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসের শিকার হয়।
কীটনাশকের বিষক্রিয়া:
তামাক চাষে অতি উচ্চমাত্রার রাসায়নিক কীটনাশক (যেমন কার্বোফুরান, ডায়াজিনন) ব্যবহার করা হয়। যথাযথ সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা (মাস্ক, গ্লাভস) না থাকায় প্রায় ৬৫% কৃষক ত্বকের রোগ, চোখের অ্যালার্জি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক সমস্যায় ভোগেন।
ফুসফুসের স্থায়ী ক্ষতি:
তামাক পাতা শুকানোর জন্য কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর অঞ্চলে হাজার হাজার ‘তামাক চুল্লি’ বা তন্দুর ব্যবহার করা হয়। এই চুল্লি থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে চুল্লির আশপাশে থাকা মানুষের ফুসফুসের কার্যকারিতা গড়ে ১৫% থেকে ২৫% পর্যন্ত কমে যায়, যা পরবর্তীতে ক্যানসার ও সিওপিডি (COPD) এর ঝুঁকি বাড়ায়।
২. তামাক নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনের আইনি ভূমিকা:
বাংলাদেশ সরকারের ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫’ (সংশোধিত ২০১৩) অনুযায়ী স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন তামাক চাষ ও এর বিপণন নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু আইনি পদক্ষেপ প্রয়োগ করে থাকে:
মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা:
স্থানীয় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে তামাক চুল্লিগুলোর ওপর নিয়মিত অভিযান চালানো হয়। বনের কাঠ অবৈধভাবে তামাক চুল্লিতে পোড়ানোর অপরাধে ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন’ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের অধীনে চুল্লি মালিকদের মোটা অঙ্কের জরিমানা ও চুল্লি ভেঙে দেওয়া হয়।
কোম্পানিগুলোর আগ্রাসী বিপণন রোধ:
তামাক কোম্পানিগুলো যাতে কৃষকদের অগ্রিম সার, বীজ বা ঋণ দিয়ে তামাক চাষে বাধ্য করতে না পারে, সেজন্য টাস্কফোর্স কমিটির মাধ্যমে কোম্পানিগুলোর মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়। আইনের ধারা ৫ অনুযায়ী তামাকজাত দ্রব্যের যেকোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা নিষিদ্ধ থাকায় কোম্পানিগুলোর সাইনবোর্ড ও লিফলেট উচ্ছেদ করা হয়।
তামাকমুক্ত অঞ্চল ঘোষণা:
কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গার স্থানীয় প্রশাসন কৃষি বিভাগের সাথে যৌথভাবে নির্দিষ্ট কিছু ব্লককে ‘তামাকমুক্ত ব্লক’ বা ‘তামাকমুক্ত গ্রাম’ হিসেবে ঘোষণা করছে। এই গ্রামগুলোতে কোনো কৃষক তামাক চাষ না করলে তাদের শতভাগ সরকারি কৃষি সুবিধা (বিনামূল্যে বীজ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সেচ সুবিধা) অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে।
তামাক চাষের সময় কৃষকদের নিকোটিন বিষক্রিয়া বা ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’ (GTS) থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় এবং তামাক চুল্লিতে কাঠ পোড়ানোর ফলে বনাঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. কৃষকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে বিশেষ সুরক্ষামূলক নির্দেশিকা:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওশা (OSHA) এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, তামাক ক্ষেতে কাজ করার সময় ত্বকের মাধ্যমে নিকোটিন শোষণ ও কীটনাশকের বিষক্রিয়া ঠেকাতে কৃষকদের অবশ্যই নিচের নিয়মগুলো মেনে চলা উচিত:
শরীর সম্পূর্ণ ঢেকে রাখা:
তামাক পাতা রোপণ, পরিচর্যা ও তোলার সময় অবশ্যই লম্বা হাতার শার্ট, ফুল প্যান্ট এবং ওয়াটারপ্রুফ বা প্লাস্টিকের তৈরি এপ্রোন ব্যবহার করতে হবে.
সুরক্ষামূলক গ্লাভস ও বুট পরা:
কাঁচা তামাক পাতা সরাসরি হাত দিয়ে না ধরে কেমিক্যাল-রেজিস্ট্যান্ট বা ওয়াটার-টাইট গ্লাভস (দস্তানা) এবং পায়ে গামবুট পরা বাধ্যতামূলক.
ভিজে অবস্থায় কাজ না করা:
সকালের শিশির বা বৃষ্টির পর তামাক পাতা যখন ভেজা থাকে, তখন কোনোভাবেই ক্ষেতে নামা উচিত নয়. ভেজা পাতা থেকে নিকোটিন দ্রুত ত্বকে প্রবেশ করে.
দ্রুত কাপড় পরিবর্তন:
কাজের সময় ঘাম, শিশির বা তামাকের কষে কৃষকের পোশাক ভিজে গেলে তা শরীরে দীর্ঘক্ষণ রাখা যাবে না; দ্রুত পরিষ্কার ও শুকনো পোশাক বদলে নিতে হবে.
বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া:
তামাক পাতা স্পর্শ করার পর এবং বিশেষ করে খাবার খাওয়ার আগে হাত ও মুখ সাবান-পানি দিয়ে খুব ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে. এতে হাতের নিকোটিন অবশিষ্টাংশ প্রায় ৯৬% পর্যন্ত দূর হয়.
শিশুদের দূরে রাখা:
তামাকের নিকোটিন বড়দের চেয়ে শিশুদের শরীরে বেশি দ্রুত ক্ষতি করে. তাই পাতা তোলা, বাছা বা চুল্লির কাজে শিশুদের কোনোভাবেই নিয়োজিত করা যাবে না.
২. তামাক চুল্লিতে কাঠ পোড়ানোর কারণে বনাঞ্চলের ক্ষতির পরিসংখ্যান:
তামাক পাতা তোলার পর তা ঘরে বিক্রির উপযোগী করতে ‘ফ্লু-কিউরিং’ বা বিশেষ তামাক চুল্লিতে (তন্দুর) উচ্চ তাপমাত্রায় শুকাতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কাঠ পোড়ানোর কারণে বাংলাদেশের বনাঞ্চল মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে:
জাতীয় বনাঞ্চল উজাড়ের হার:
বৈশ্বিক গবেষণা সংস্থা টোব্যাকো অ্যাটলাস (Tobacco Atlas) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট বন উজাড় বা গাছ কাটার ৩১ শতাংশের জন্য সরাসরি দায়ী তামাক চাষ ও তামাক পাতা শুকানোর প্রক্রিয়া।
কুষ্টিয়া অঞ্চলের বনাঞ্চলের বিলুপ্তি:
উবিনীগ (UBINIG) এর পরিবেশগত প্রতিবেদন অনুসারে, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কুষ্টিয়া অঞ্চলে তামাক চুল্লিতে অনিয়ন্ত্রিত কাঠ পোড়ানোর ফলে স্থানীয় বনাঞ্চল সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে এই অঞ্চলের চুল্লিগুলোর জন্য অন্য জেলা বা সামাজিক বনায়নের গাছ কেটে কাঠের জোগান দেওয়া হচ্ছে।
পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষতি:
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ফরেস্ট্রি রিসার্চ (CIFOR) এর তথ্যানুযায়ী, তামাক চুল্লির জ্বালানির জন্য গত এক শতাব্দীতে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য জেলাগুলোর (বিশেষ করে বান্দরবান ও কক্সবাজার) প্রায় অর্ধেক (৫০%) প্রাকৃতিক বন হারিয়ে গেছে।
অকল্পনীয় গাছের অপচয়:
পরিবেশবাদীদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধুমাত্র বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলাতেই প্রতি তামাক মৌসুমে পাতা শুকানোর কাজে প্রায় ১,৭০,০০০ এরও বেশি পরিপক্ক গাছ কেটে চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো হয়।
২. বাংলাদেশে তামাকের ক্ষয়ক্ষতি:
একটি পরিসংখ্যানগত চিত্রবিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির সাম্প্রতিক যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, তামাকের ব্যবহার বাংলাদেশে একটি নীরব মহামারি সৃষ্টি করেছে। দেশে প্রতি বছর তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে (যেমন ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং সিওপিডি) আক্রান্ত হয়ে আনুমানিক ১,৬১,০০০ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৪০ জন মানুষ তামাকের কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন। শুধু জীবনহানিই নয়, তামাকের এই ছোবলে দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তামাক ব্যবহারকারীদের চিকিৎসা ব্যয় এবং উৎপাদনশীলতা হারানোর কারণে প্রতি বছর দেশের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০,৫৬০ কোটি টাকা, যা তামাক খাত থেকে অর্জিত বার্ষিক রাজস্ব আয়ের চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া পরোক্ষ ধূমপানের কারণে দেশের প্রায় ৩ কোটি ৮৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এবং বিপুল সংখ্যক শিশু প্রতিনিয়ত চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।
৩. কৃষি ও মাটির স্থায়ী ক্ষতি এবং বিকল্প চাষের সম্ভাবনা:
বাংলাদেশের বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চল (কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা) তামাক চাষের জন্য কুখ্যাত। একা কুষ্টিয়া জেলাতেই প্রতি বছর প্রায় ১১,৩৮৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়। গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক সূচক অনুযায়ী, তামাক চাষের কারণে সাধারণ ফসলি জমির তুলনায় মাটির গুণগত মান বা সয়েল কোয়ালিটি ইনডেক্স (SQI) ১৯.২৩% এবং মাটির রাসায়নিক স্বাস্থ্য সূচক (SHI) ২৭.৮৭% পর্যন্ত হ্রাস পায়। মাটি অতিরিক্ত অ্যাসিডিক হয়ে পড়ে এবং উপকারী অণুজীবের কার্যকারিতা ৩৫% থেকে ৬০% পর্যন্ত কমে যায়।
বিকল্প উচ্চমূল্যের চাষ:
তামাকের বিকল্প হিসেবে ভুট্টা এবং উচ্চমূল্যের সবজি (যেমন শীতকালীন পেঁয়াজ, আলু, খিরা) চাষ কৃষকদের জন্য অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক। তামাক চাষে ৫-৬ মাস হাড়ভাঙা খাটুনির পর যেখানে বিঘাপ্রতি নিট লাভ থাকে ৪০,০০০–৪৫,০০০ টাকা, সেখানে মাত্র ৩-৪ মাসে ভুট্টা চাষ করে ৩০,০০০–৩৫,০০০ টাকা এবং শীতকালীন পেঁয়াজ চাষ করে ৫০,০০০-৬০,০০০ টাকা নিট লাভ করা সম্ভব।
তামাকের পেছনে যে ৬ মাস সময় নষ্ট হয়, সেই সময়ে কৃষকরা ভুট্টা বা সবজি তুলে আরেকটি বাড়তি ফসল ঘরে তুলতে পারেন, যা সামগ্রিক লাভ বাড়িয়ে দেয়।
৪. স্বাস্থ্য ও বনাঞ্চলের ভয়াবহ ক্ষতি:
গ্রীণ টোব্যাকো সিকনেস (GTS): তামাক চাষে নিয়োজিত কৃষকদের প্রায় ১৮% থেকে ২৪% নিয়মিত এই রোগে আক্রান্ত হন। কাঁচা পাতা থেকে নির্গত নিকোটিন ত্বকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করায় কৃষকরা তীব্র মাথা ঘোরা ও শ্বাসকষ্টে ভোগেন।
বনাঞ্চল উজাড়:
বাংলাদেশে মোট বন উজাড় বা গাছ কাটার ৩১ শতাংশের জন্য সরাসরি দায়ী তামাক পাতা শুকানোর (ফ্লু-কিউরিং) প্রক্রিয়া। প্রতি মৌসুমে পাতা শুকানোর কাজে বিপুল পরিমাণ পরিপক্ক গাছ কেটে চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো হয়, যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে।
৫. ২০৪০ মহাপরিকল্পনা ও সরকারি পদক্ষেপসমূহসরকার ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ৪টি প্রধান স্তম্ভের ওপর জোর দিয়েছে:
১. আইন সংস্কার (২০২৬ সংশোধনী):
সব পাবলিক প্লেসে ডেজিগনেটেড স্মোকিং জোন বাতিল, তামাকের প্যাকেটে সচিত্র সতর্কবার্তা ৭৫% এ উন্নীতকরণ, এবং ই-সিগারেট ও ভেপিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধকরণ।
২. তাকাম চাষ নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্বাসন:
তামাকের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংক ঋণ বন্ধ করা এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (PKSF)-এর মাধ্যমে বিকল্প ফসল চাষের জন্য সহজ শর্তে বিশেষ কৃষি ঋণ ও সার-বীজ প্রণোদনা প্রদান।
৩. বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা নিষিদ্ধ (TAPS Ban):
তামাক কোম্পানিগুলোর সমস্ত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বিজ্ঞাপন এবং করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (CSR) এর নামে চ্যারিটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।
৪. রাজস্ব নীতি:
তামাকের ওপর ১% স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ আরোপ, যা তামাকবিরোধী গণসচেতনতা তৈরি ও মাঠপর্যায়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
৬. উপসংহার ও প্রধান মূলমন্ত্র:
২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যটি কেবল সরকারের একার নয়, এটি সর্বস্তরের মানুষের একটি যৌথ সামাজিক আন্দোলন। এই আন্দোলন সফল করতে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের তামাক চাষিদের পুনর্বাসনে আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।
এই মহাপরিকল্পনার মূল দর্শন ছড়িয়ে দিতে আমাদের প্রধান স্লোগান হোক:
“২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ”
তামাক নয়, খাদ্য ফলান”
“তামাকমুক্ত প্রজন্ম, আমাদের অঙ্গীকার”
তথ্য সূত্র (References):
১. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO):
Framework Convention on Tobacco Control (FCTC) & Global Tobacco Epidemic Report.
২. পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (PKSF):
Alternative crops of Tobacco scenario of Kustia, 2024.
৩. The Union: South Asian Summit on Sustainable Development Goals & National Tobacco Control Cell (NTCC) Documentation.
৪. সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ফরেস্ট্রি রিসার্চ (CIFOR) & Tobacco Atlas: Tobacco cultivation-induced Deforestation and environmental degradation report.
৫. দেশ রূপান্তর ও স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE): মাঠপর্যায়ের কৃষি পরিসংখ্যান ও বিকল্প উচ্চমূল্যের ফসল চাষ প্রতিবেদন।
লেখক: *মুহাম্মদ রাশেদ খান*
সহযোগী সম্পাদক
*মাসিক ইতিহাস অন্বেষা*

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *