
সংবাদ সংগ্রহের দিনগুলো ছিল সংগ্রাম, দায়িত্ব আর স্বপ্নের এক অনন্য মিশেল। অনেক সময় সকালবেলা ঘর থেকে বের হতাম একটি ভালো সংবাদের খোঁজে। রোদ, বৃষ্টি কিংবা ক্লান্তি—কোনো কিছুই তখন বাধা মনে হতো না। এদিক-সেদিক ঘুরে, মানুষের সঙ্গে কথা বলে, ঘটনার সত্যতা যাচাই করে একটি সংবাদ সংগ্রহ করতাম। তারপর মনোযোগ দিয়ে সেটি লিখে ইমেইলের মাধ্যমে অফিসে পাঠিয়ে দিতাম।
সংবাদ পাঠানোর পর শুরু হতো দীর্ঘ অপেক্ষা। বারবার মোবাইল হাতে নিয়ে ওয়েবসাইট দেখতাম, পত্রিকার পাতা খুঁজতাম। মনে হতো, এই বুঝি আমার সংবাদটি প্রকাশিত হলো। কিন্তু যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও দেখতাম সংবাদটি প্রকাশিত হয়নি, তখন বুকের ভেতর এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হতো। মনে হতো, সারাদিনের দৌড়ঝাঁপ, পরিশ্রম আর সময় যেন বৃথা গেল।
তবুও থেমে থাকার সুযোগ ছিল না। নিজেকে বুঝিয়ে বলতাম, হয়তো সম্পাদক আজ গুরুত্ব দেননি, হয়তো আগামীকাল প্রকাশ হবে। সেই আশাতেই আবার নতুন দিনের অপেক্ষা। কিন্তু কখনো কখনো পরের দিনও যখন সংবাদটির কোনো খোঁজ মিলত না, তখন হতাশা আরও গভীর হতো। মনে হতো, নিজের পরিশ্রমের মূল্য হয়তো ঠিকভাবে পৌঁছাতে পারল না।
তবে এই পেশার সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তও ছিল। অনেক সময় সংবাদ পাঠানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটি প্রকাশিত হয়ে যেত। তখন যে আনন্দ অনুভব করতাম, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। নিজের নামের নিচে প্রকাশিত সংবাদ দেখে মনে হতো, আমার পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। বুক ভরে যেত গর্বে, আর সমস্ত ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর হয়ে যেত।
কখনো কোনো পাঠক সেই সংবাদ পড়ে উপকৃত হয়েছে, কোনো সমস্যার সমাধান হয়েছে, কিংবা কোনো বিষয় কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে—এমন খবর শুনলে আনন্দ আরও বেড়ে যেত। তখন বুঝতে পারতাম, সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি মানুষের কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি দায়িত্ব।
আজও সেই অপেক্ষার দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। প্রকাশ না হওয়া সংবাদের হতাশা যেমন মনে আছে, তেমনি প্রকাশিত সংবাদের আনন্দও হৃদয়ে গেঁথে আছে। এই আনন্দ, এই কষ্ট, এই অপেক্ষা আর এই সাফল্যের গল্পগুলোই একজন সংবাদকর্মীর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি।