👁 309 Views

ধর্ম-বর্ণ নয়, পরিচয় একটাই—আমরা বাংলাদেশি,  চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রী

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম : * চট্টগ্রামে প্রথমবার দুর্গাপূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রী, সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান।
 বৈষম্যহীন, সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতা কামনা  দল, মত, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে বিভিন্ন সময়ে মানুষ যে বাংলাদেশের জন্য রক্ত দিয়েছেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
চট্টগ্রাম নগরীর ঐতিহাসিক জে এম সেন হলের দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সব নাগরিকের সমান অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেছেন, ‘ধর্ম আমাদের নিজস্ব বিষয়। কিন্তু আমাদের একমাত্র পরিচয় আমরা বাংলাদেশি।’ ২০ অক্টোবর(মঙ্গলবার) রাতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও মতবিনিময়কালে তিনি বৈষম্যহীন, সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতা কামনা করেন।
শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামের জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপে কোনো দায়িত্বপালনরত প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে নগরীতে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। সন্ধ্যার আগে থেকেই পূজামণ্ডপের আশপাশে বিএনপি নেতাকর্মী, সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ভিড় জমে। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। সংশ্লিষ্ট আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর চট্টগ্রামে দুর্গাপূজার মণ্ডপে কোনো দায়িত্বপালনরত প্রধানমন্ত্রীর এটাই প্রথম সফর।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে সামরিক বিমানে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। সেখানে তাকে অভ্যর্থনা জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনসহ স্থানীয় সংসদ সদস্য, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ও বিএনপির নেতারা।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি নগরীর রহমতগঞ্জে ঐতিহাসিক জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপে যান। রাত ৮টা ২০ মিনিটে সেখানে পৌঁছালে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি অধ্যাপক অর্পণ ব্যানার্জি, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিখিল কুমার নাথ, জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের কার্যকরী সেক্রেটারি বিপ্লব দে পার্থ এবং হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি রাজীব ধর তমালসহ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতিনিধিরা তাকে স্বাগত জানান।
পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই দেশ সবার। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান—যে ধর্মের মানুষই হোন না কেন, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের পরিচয় ও অধিকার সমান।
তিনি বলেন, ‘এই দেশের আইন আমার জন্য যেভাবে প্রযোজ্য, এই দেশের আইন আপনার জন্যও ঠিক সেভাবেই প্রযোজ্য।’ রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে সব নাগরিকের অধিকার সমানভাবে নিশ্চিত করা। ধর্মীয় পরিচয় কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠ-সংখ্যালঘুর বিভাজনের ভিত্তিতে কাউকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের মানুষ জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন। সেদিন কেউ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা করেননি। সবার লক্ষ্য ছিল দেশকে স্বাধীন করা। একইভাবে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষ একসঙ্গে অংশ নিয়েছেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মানুষ গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে। আন্দোলনের সময় আহতদের হাসপাতালে নেওয়া থেকে শুরু করে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম—সব ক্ষেত্রেই মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তারেক রহমান বলেন, সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে ধর্ম-বর্ণ কিংবা অন্য কোনো পরিচয়ের কারণে কেউ বৈষম্যের শিকার হবেন না। এ লক্ষ্য অর্জনে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক কারণে বাধ্য হয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর দেশের বাইরে থাকতে হয়েছে জানিয়েছ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরো বলেন, “আমি একজন মুসলমান। আমাকে রাজনৈতিক কারণে বাধ্য হয়ে ১৭ বছর বিদেশে থাকতে হয়েছিল। মুসলমান হিসেবে বাংলাদেশে আমি হয়ত সংখ্যাগুরু। কিন্তু এই দেশের ওপর আপনার যে অধিকার আছে, এই দেশের ওপর আমারও সেই অধিকার আছে। এই রাষ্ট্র আপনাকে যা দেবে, এই রাষ্ট্র আমাকেও তাই দেবে।”

তিনি বলেন, বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের একক দেশ নয়; এটি সবার। ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয় হলেও বাংলাদেশি নাগরিক পরিচয় সবার অভিন্ন পরিচয়। এ দেশে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে।

শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধ, বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি দেশ গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ শান্তিতে বসবাস করবে এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখবে।

তিনি বলেন, দল, মত, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে বিভিন্ন সময়ে মানুষ যে বাংলাদেশের জন্য রক্ত দিয়েছেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে সব ধর্মের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে এটি সম্প্রীতি ও জাতীয় ঐক্যের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। নাগরিক নিরাপত্তা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের পরিবেশ সুদৃঢ় করা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কোনো নাগরিক বৈষম্যের শিকার হবেন না। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কাউকে কোনো রাজনৈতিক দলের ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অন্য সব নাগরিকের মতো তাদেরও সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার রয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমেদ আরো বলেন, জেএম সেন হলে বিগত সরকারের কর্তারা সব সময় এসেছেন। তবে অতীতে এখানে আসা কেউ কেউ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, একটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং সেই দেশের সমর্থনে তারা ক্ষমতায় থাকবেন। কিন্তু এ ধরনের রাজনীতিতে তারা বিশ্বাস করেন না।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্যরা।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে নগরীর রহমতগঞ্জ, জামালখান, কাজীর দেউড়ি ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আগেই পূজামণ্ডপ ও সংলগ্ন এলাকার নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিদর্শন করেন। যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দর্শনার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে নেওয়া হয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়। আয়োজকদের মতে, দায়িত্বপালনরত প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক আস্থা এবং সব নাগরিকের সমমর্যাদার বার্তাকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এনেছে।
উল্লেখ্য, এর আগে ১৯৯৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। এবার তারেক রহমানের দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শনকে কেন্দ্র করে সেই প্রসঙ্গও আলোচনায় আসে।
রাতে বিএনপির সাংগঠনিক সভাঃ
পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে প্রধানমন্ত্রী নগরীর পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লুতে যান। রাত ১০টার দিকে সেখানে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি এবং দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের নিয়ে আয়োজিত সাংগঠনিক সভায় অংশ নেন তিনি।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় পাঁচ শতাধিক প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম ও স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় ছিল এ কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।
শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে শুভেচ্ছা বিনিময় কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী এদিন সকালে রংপুর ও দুপুরে রাজশাহীর পূজামণ্ডপও পরিদর্শন করেন। সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে এসে জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপে তার উপস্থিতি এবং সম্প্রীতির বার্তা সফরের প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে।