
ছাদেকুল ইসলাম রুবেল, পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি: গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন মসজিদ। এর নির্মাণকাল, প্রতিষ্ঠাতা কিংবা প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো লিখিত তথ্য নেই। তবে স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে নানা রহস্য, বিশ্বাস ও লোককথা।
স্থানীয়ভাবে মসজিদটি ‘ভাঙা মসজিদ’ নামে পরিচিত। আবার জ্বীন-সংক্রান্ত নানা জনশ্রুতি ও রহস্যময় গল্পের কারণে অনেকের কাছে এটি ‘জ্বীনের মসজিদ’ নামেও পরিচিত।
বেতকাপা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান মোস্ত বলেন, স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে—মসজিদটি এক রাতেই অলৌকিকভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। অনেকের ধারণা, এটি মুঘল আমলের কোনো স্থাপনা। অসম্পূর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকায় স্থানীয়ভাবে এটি ‘ভাঙা মসজিদ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
পলাশবাড়ী উপজেলার বেতকাপা ইউনিয়নের রায়তি নড়াইল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিরিবিলি পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন এই স্থাপনাকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের কৌতূহল ও বিশ্বাসের কমতি নেই।
এক রাতেই নির্মাণের জনশ্রুতি
স্থানীয়দের মুখে প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, বহু বছর আগে এক রাতে অদৃশ্য শক্তির মাধ্যমে মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। জনশ্রুতি রয়েছে, ভোর হওয়ার আগেই মসজিদের অধিকাংশ নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল।
তবে নির্মাণকাজ চলাকালে রাস্তা দিয়ে এক পথিকের চলাচলকে কেন্দ্র করে অদৃশ্য নির্মাণকারীরা কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই চলে যান—এমন গল্পও স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত। এরপর থেকেই স্থাপনাটি অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকে বলে কথিত আছে। এ কারণেই পরবর্তীতে এটি ‘ভাঙা মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়।
ইউপি সদস্য আল আমিন বলেন, এক রাতেই মসজিদ নির্মাণ কিংবা অদৃশ্য কোনো শক্তির মাধ্যমে এর নির্মাণের দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা লোককথা ও জনশ্রুতির অংশ হিসেবেই এসব গল্প প্রচলিত রয়েছে।
মুঘল আমলের স্থাপনা?
বেতকাপা ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক নুরনবী মেধা জানান, মসজিদটি ঠিক কত বছরের পুরোনো কিংবা কে এবং কখন এটি নির্মাণ করেছিলেন—এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর স্থানীয়দের কাছে নেই।
তবে অনেকের ধারণা, স্থাপনাটি মুঘল আমলের হতে পারে। বিশেষ করে সম্রাট আকবরের শাসনামলে এ অঞ্চলে নির্মিত বিভিন্ন প্রাচীন স্থাপনার সঙ্গে এর সময়কাল মিল থাকতে পারে বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করেন।
কিন্তু এ ধারণার পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো শিলালিপি, সরকারি নথি বা নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায়নি। ফলে মসজিদটির প্রকৃত ইতিহাস, নির্মাণকাল ও স্থাপত্যশৈলী সম্পর্কে নিশ্চিত হতে প্রয়োজন প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ এবং বিশেষজ্ঞদের গবেষণা।
প্রাচীন তেঁতুলগাছ ঘিরেও রহস্য
মসজিদের পাশেই রয়েছে বিশাল আকৃতির একটি পুরোনো তেঁতুলগাছ। গাছটির সঠিক বয়স সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য না থাকলেও স্থানীয়দের দাবি, তাদের পূর্বপুরুষরাও গাছটিকে একইভাবে বিশাল আকৃতিতে দেখে গেছেন।
এই তেঁতুলগাছকে ঘিরেও রয়েছে নানা রহস্যময় লোককথা। স্থানীয়দের কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, গভীর রাতে গাছটির আশপাশে জ্বীনদের আনাগোনা ঘটে। এমনকি সেখানে জ্বীনদের নাচ-গানের গল্পও প্রচলিত রয়েছে।
তবে এসব বিশ্বাস ও গল্পের কোনো বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সংস্কৃতি ও দীর্ঘদিনের লোকবিশ্বাসের অংশ হিসেবেই এসব কাহিনি টিকে আছে।
এলাকার প্রবীণ ইটভাটা ব্যবসায়ী খোকা জানান, ওই মসজিদে বেশ কয়েক বছর সৌদি আরবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঈদের আগের দিন ঈদের নামাজও আদায় করা হয়েছে।
দুই ঈদে মুখর প্রাঙ্গণ
প্রাচীন এই মসজিদের আরেকটি বিশেষত্ব হলো, এখানে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয় না। তবে বছরে দুই ঈদে স্থানীয় মুসল্লিদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে মসজিদ প্রাঙ্গণ।
স্থানীয়রা জানান, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ এখানে ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য সমবেত হন। তখন পুরো এলাকা পরিণত হয় মানুষের মিলনমেলায়।
পলাশবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুর রহমান বুলবুল জানান, মানত ও লোকবিশ্বাস মসজিদটিকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নানা ধরনের বিশ্বাস ও মানতের প্রচলন রয়েছে। সন্তান লাভ, চাকরি পাওয়া কিংবা মনের কোনো আশা পূরণ হলে অনেকে এখানে এসে মানত করেন বলে স্থানীয়দের কাছে জানা যায়।
মানত পূরণ হলে কেউ কেউ সিন্নি বা তবারক বিতরণ করেন। স্থানীয়দের এসব বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে দূর-দূরান্ত থেকেও অনেক মানুষ এখানে আসেন।
ফলে মসজিদটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবেই নয়, স্থানীয় লোকবিশ্বাস ও সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
কথিত ১৫ ওলির কবর
মসজিদের পাশেই রয়েছে কয়েকটি পুরোনো কবর। স্থানীয়দের দাবি, সেখানে আল্লাহর ওলি হিসেবে পরিচিত ১৫ জন ব্যক্তির কবর রয়েছে।
তবে এসব কবর কার এবং সেখানে শায়িত ব্যক্তিদের প্রকৃত পরিচয় কী—সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো লিখিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়টিকেও স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের জনশ্রুতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংস্কারে নতুনের ছোঁয়া
সময়ের পরিক্রমায় প্রাচীন স্থাপনাটির অবস্থা একসময় কিছুটা নাজুক হয়ে পড়েছিল। স্থানীয়রা জানান, ঐতিহ্যের স্মৃতি ধরে রাখতে নিজেদের উদ্যোগে মসজিদটির সংস্কার করা হয়েছে।
দেয়ালে চুন-সুরকির ব্যবহার এবং নতুন করে রং করার ফলে পুরোনো স্থাপনাটিতে নতুনের ছোঁয়া লেগেছে।
তবে সংস্কারকাজের কারণে মসজিদটির মূল স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য কতটা পরিবর্তিত হয়েছে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইতিহাস নাকি জনশ্রুতি?
রায়তি নড়াইল গ্রামের এই ‘ভাঙা মসজিদ’কে ঘিরে ইতিহাস, বিশ্বাস, রহস্য ও লোককথার এক অনন্য মিশেল গড়ে উঠেছে। এক রাতেই নির্মাণের গল্প, জ্বীনের আনাগোনার বিশ্বাস, প্রাচীন তেঁতুলগাছ এবং কথিত ওলিদের কবর—সব মিলিয়ে স্থাপনাটি স্থানীয় মানুষের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
তবে এসবের মধ্যে কোনটি প্রকৃত ইতিহাস আর কোনটি কেবল লোকমুখে প্রচলিত গল্প—তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
মসজিদটির প্রকৃত বয়স, নির্মাণকাল, প্রতিষ্ঠাতা ও স্থাপত্যশৈলী সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতে প্রয়োজন প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও ঐতিহাসিক গবেষণা।
কালের পরিক্রমায় দাঁড়িয়ে থাকা রায়তি নড়াইল গ্রামের এই ‘ভাঙা মসজিদ’ শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়; এটি স্থানীয় মানুষের স্মৃতি, বিশ্বাস ও লোকসংস্কৃতিরও অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রহস্যের আবরণে ঢাকা এই প্রাচীন স্থাপনাটির প্রকৃত ইতিহাস একদিন গবেষণার মাধ্যমে উন্মোচিত হবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।