👁 77 Views

চট্টগ্রাম বন্দরে পুরোনো পার্টসের আড়ালে ১২ কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়ি!

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ “নিলামের ফাঁক গলে খালাসের অপচেষ্টা, চট্টগ্রাম বন্দরে কাস্টমসের জালে রহস্যজনক চালান”
জাপান থেকে ‘ইউজড স্পেয়ার পার্টস’ বা পুরোনো গাড়ির যন্ত্রাংশের ঘোষণা দিয়ে আনা হয়েছিল একটি কন্টেইনার। কিন্তু কাস্টমস গোয়েন্দাদের সন্দেহের তীর গিয়ে ঠেকে অন্যত্র। কন্টেইনার খুলতেই বেরিয়ে আসে বিশ্বের নামিদামি ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ অংশ—লেক্সাস এলএক্স ৬০০, লেক্সাস এসসি ৪৩০ এবং বিএমডব্লিউ এম৫ মডেলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।
প্রাথমিক হিসাবে, পুরো চালানটির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৯ কোটি থেকে ১২ কোটি টাকা। অভিযোগ উঠেছে, সরাসরি বিল অব এন্ট্রি দাখিল না করে দীর্ঘদিন বন্দরে ফেলে রেখে পরবর্তীতে নিলাম প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে কম মূল্যে চালানটি খালাসের একটি পরিকল্পনা করা হচ্ছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) নজরদারিতে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।
সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম বন্দরে বিশেষ অভিযান চালিয়ে খণ্ডিত অবস্থায় থাকা এসব বিলাসবহুল গাড়ির অংশ ও বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ জব্দ করা হয়েছে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
এক মাস বন্দরে, নেই বিল অব এন্ট্রিঃ
কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্র জানায়, জাপান থেকে আসা চালানটি কাগজপত্রে ‘ব্যবহৃত স্পেয়ার পার্টস’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু পণ্য বন্দরে পৌঁছানোর পর এক মাসেরও বেশি সময় পার হলেও সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকের পক্ষ থেকে কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়নি।
এই অস্বাভাবিক বিলম্ব থেকেই সন্দেহের সূত্রপাত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
গোপন তথ্যের ভিত্তিতে কাস্টমস গোয়েন্দারা কন্টেইনারটির ওপর নজরদারি শুরু করেন। পরে সিল কেটে কায়িক পরীক্ষা চালানো হলে ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের ব্যাপক অসঙ্গতি ধরা পড়ে।
সাধারণ পুরোনো যন্ত্রাংশের পরিবর্তে কন্টেইনারে পাওয়া যায় বিলাসবহুল গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত অংশ, ইঞ্জিন ও অন্যান্য স্পর্শকাতর মেকানিক্যাল পার্টস।
কন্টেইনারে মিলল লেক্সাস-বিএমডব্লিউর অংশঃ
তল্লাশিতে লেক্সাস এলএক্স ৬০০, লেক্সাস এসসি ৪৩০ এবং বিএমডব্লিউ এম৫ মডেলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ পাওয়া গেছে। এছাড়া উদ্ধার করা হয়েছে হোন্ডা বি১৮সি টাইপ-আর ইঞ্জিন, ফ্রন্ট হাফ বা হাফ-কাট, ব্যবহৃত টায়ারসহ বিপুল পরিমাণ মেকানিক্যাল পার্টস।
কাস্টমস কর্মকর্তাদের ধারণা, বিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে আমদানি করা হলেও এসব যন্ত্রাংশ একত্র করলে পূর্ণাঙ্গ বিলাসবহুল গাড়ির বৈশিষ্ট্য পাওয়া যেতে পারে।
এ কারণে উদ্ধার হওয়া অংশগুলোর মেকানিক্যাল নম্বর, চেসিসের কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য ও অরিজিনাল মার্কিং পরীক্ষা করা হচ্ছে। যানবাহন বিশেষজ্ঞ ও অটোমোবাইল প্রকৌশলীদের সহায়তায় খতিয়ে দেখা হচ্ছে—এসব বিচ্ছিন্ন অংশে পূর্ণাঙ্গ গাড়ির ‘এসেনশিয়াল ক্যারেক্টার’ বা আবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে কি না।
নিলামের সুযোগ নেওয়ার পরিকল্পনা?
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চালানটি দীর্ঘ সময় বন্দরে রেখে বিল অব এন্ট্রি দাখিল না করার পেছনে বিশেষ উদ্দেশ্য থাকতে পারে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে কাস্টমস গোয়েন্দারা ধারণা করছেন, নিয়মিত আমদানি প্রক্রিয়ায় শুল্ক-কর পরিশোধ এড়িয়ে পণ্যগুলোকে পরিত্যক্ত হিসেবে নিলাম প্রক্রিয়ায় নেওয়ার সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্য গোপন করে কিংবা পণ্যের প্রকৃত পরিচয় আড়াল করে কম দামে বিলাসবহুল গাড়ির যন্ত্রাংশ খালাসের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা ছিল কি না, তা তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি এখনো প্রাথমিক অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত তদন্ত ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
১২ কোটি টাকার চালান, খতিয়ে দেখা হচ্ছে অর্থের উৎসঃ
কাস্টমসের প্রাথমিক মূল্যায়নে জব্দকৃত লেক্সাস ও বিএমডব্লিউর যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য পণ্য মিলিয়ে চালানটির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১২ কোটি টাকা হতে পারে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—এত বড় মূল্যের চালান কার অর্থে আমদানি করা হয়েছে? ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে কি না, প্রকৃত ইনভয়েস মূল্য কত, বিদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমদানিকারকের সম্পর্ক কী—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় এসেছে।
কাস্টমস গোয়েন্দারা চালানটির প্রকৃত আমদানি মূল্য, ব্যাংক পেমেন্ট, বাণিজ্যিক নথি ও আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করছেন। একই সঙ্গে এর সঙ্গে অবৈধ অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিংয়ের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তাও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
চূড়ান্ত তদন্তের অপেক্ষাঃ
বর্তমানে জব্দ করা পণ্যের প্রকৃত পরিচয়, সঠিক এইচএস কোড বা শ্রেণিবিন্যাস এবং প্রযোজ্য শুল্ক-কর নির্ধারণে কাজ করছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
তদন্ত শেষে পণ্যের প্রকৃত পরিচয় গোপন, ভুল ঘোষণা, শুল্ক ফাঁকি বা অন্য কোনো আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত কাস্টমস আইন ও শুল্ক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের এই চালানটি এখন কাস্টমস গোয়েন্দাদের কাছে শুধু একটি ‘পুরোনো স্পেয়ার পার্টসের কন্টেইনার’ নয়; বরং এর আড়ালে কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি, শুল্ক ফাঁকি এবং সম্ভাব্য আর্থিক অনিয়মের একটি বড় চক্র কাজ করছে কি না—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *