
মাকসুদুল হক, ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি- মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট : আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতার বেড়াজালে আটকে গেছে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে ইছামতী নদী থেকে উদ্ধার হওয়া এক আফগান নাগরিকের লাশ উত্তোলনের প্রক্রিয়া। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি মেলার পরও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত নির্দেশনার অভাবে লাশটি নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারছেন না তার পরিবার। ভাইয়ের মরদেহের অবশিষ্টাংশটুকু বুঝে পেতে গত ৫০ দিন ধরে ঝিনাইদহের জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন নিহতের হতভাগ্য ভাই ইমাল মোহাম্মদী। ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতা সত্ত্বেও ভাইয়ের মরদেহের শেষ চিহ্নটুকু নিয়ে মাতৃভূমিতে ফেরার আকুতি এখন ঝিনাইদহের বাতাসে ভাসছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার পলিয়ানপুর সীমান্তের ইছামতী নদী থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির গলিত মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় থানা পুলিশ। সে সময় মরদেহের আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) জাতীয় ডেটাবেজের সাথে না মেলায় পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। আইনি প্রক্রিয়া শেষে ১৪ এপ্রিল অলাভজনক সংস্থা আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে লাশটি ঝিনাইদহ পৌর কবরস্থানে ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে দাফন করা হয়।
লাশ দাফনের কয়েক সপ্তাহ পর, সীমান্তে অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের ছবি ও খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ছবি দেখে মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করেন আফগানিস্তানের বাসিন্দা ইমাল মোহাম্মদী। তিনি নিশ্চিত করেন, মৃত ব্যক্তি আর কেউ নন, তার আপন ভাই হাশমত মোহাম্মদী (৩৫)। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর ভাইয়ের লাশ নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে ধর্মীয় রীতিতে দাফন করার সিদ্ধান্ত নেয় তার পরিবার।
পরিচয় পাওয়ার পর হাশমতের ভাই ইমাল মোহাম্মদী প্রয়োজনীয় আইনি নথিপত্র ও প্রমাণাদিসহ বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আবেদন করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কবর থেকে লাশ উত্তোলনের বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন বা ‘সবুজ সংকেত’ দেওয়া হয়। এই অনুমতিপত্র নিয়ে ইমাল মোহাম্মদী ঝিনাইদহে আসলেও স্থানীয় প্রশাসন লাশ হস্তান্তরে অপারগতা প্রকাশ করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক প্রটোকল ও কূটনৈতিক নিয়মানুযায়ী কোনো বিদেশী নাগরিকের মরদেহ উত্তোলন বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা ও চিঠির প্রয়োজন হয়। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি থাকলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেই চূড়ান্ত নির্দেশনাটি এখনও ঝিনাইদহ জেলা বা মহেশপুর উপজেলা প্রশাসনের কাছে পৌঁছায়নি। ফলে আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা স্থানীয় প্রশাসন কবর খননের অনুমতি দিতে পারছে না।
বিগত ৫০ দিন ধরে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী অফিস ও বিভিন্ন দপ্তরে ধরণা দিচ্ছেন ইমাল মোহাম্মদী। ভাঙা ভাঙা ইংরেজি আর ইশারায় তিনি কর্মকর্তাদের কাছে আকুতি জানাচ্ছেন।
ইমাল মোহাম্মদী বলেন, “আমি শুধু আমার ভাইয়ের লাশটি নিয়ে দেশে ফিরতে চাই। আমাদের পরিবার উন্মুখ হয়ে বসে আছে শেষবারের মতো ওকে দেখার জন্য। বাংলাদেশ সরকার সদয় হয়ে যেন দ্রুত এই প্রক্রিয়াটি শেষ করে।”
স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ মানবিক। একজন বিদেশী নাগরিক তার ভাইয়ের মরদেহ নিতে এসেছেন, এখানে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারণে এত দীর্ঘ সময় কালক্ষেপণ হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হতে পারে।
মৃত হাসমত মোহাম্মদীর বাংলাদেশি আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহমুদুল হাসান মাসুম জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহির্গমন শাখা-১-এর উপসচিব কাজী আরিফুর রহমান গত ১১ আগস্ট পররাষ্ট্র সচিব, ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর এক পত্রে নিহতের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে আফগানিস্তানে পাঠাতে অনাপত্তি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠি না থাকায় ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মরদেহ উত্তোলনের প্রক্রিয়া থেমে আছে।
ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন সোমবার বিকেলে জানান, আমরা সব ধরনের সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত আছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠি পেলে মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাগজপত্র আমাদের কাছে এসেছে। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক ক্লিয়ারেন্স বা নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের আইনিভাবে কিছু করার সুযোগ নেই। ওই নির্দেশনা এলেই দ্রুত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহ উত্তোলন করে হস্তান্তর করা হবে।”
আফগান নাগরিক হাশমতের পরিবার এখন চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠির দিকে। একটি চিঠিই পারে ৫০ দিনের এই মানবিক কষ্টের অবসান ঘটিয়ে এক ভাইকে তার ভাইয়ের শেষ স্মৃতিসহ দেশে ফেরার সুযোগ করে দিতে।