👁 423 Views

চট্টগ্রামে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে ৫ ব্যাংকের আমানতকারীদের বিক্ষোভ

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ  ‘হেয়ার কাট’ নীতি বাতিলসহ ৫ দফা দাবি, স্বাভাবিক লেনদেন চালুর আহ্বান। দাবি বাস্তবায়ন না হলে শাখা পর্যায়ে অবস্থান কর্মসূচি, কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাওয়ের মতো কঠোর কর্মসূচি দেয়ারও হুঁশিয়ারি
শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংকের আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা, বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালুর দাবিতে চট্টগ্রামে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকরা। ২৯ জুন(সোমবার) সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের সামনে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশন-চট্টগ্রাম বিভাগ’-এর ব্যানারে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আন্দোলনকারীদের সেখান থেকে সরিয়ে দিলে তারা নগরীর নিউমার্কেট মোড়ে গিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন।
আন্দোলনকারীদের দাবির আওতায় থাকা পাঁচটি ব্যাংক হলো— ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আমানতকারীরা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারির এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এসব ব্যাংকের আমানতের ওপর গত দুই বছরের মুনাফা কর্তন করে মাত্র ৪ শতাংশ বিশেষ সুবিধা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যা লাখো সাধারণ ও মধ্যবিত্ত আমানতকারীর জন্য চরম আর্থিক সংকট সৃষ্টি করেছে।
তারা জানান, এসব ব্যাংকের অধিকাংশ আমানতকারী অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী, প্রবাসী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য। পেনশনের অর্থ, জমি বিক্রির টাকা কিংবা প্রবাসজীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয় ব্যাংকে জমা রেখেও দীর্ঘদিন ধরে তা উত্তোলন করতে না পারায় অনেকে চিকিৎসা, শিক্ষা ও দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহে হিমশিম খাচ্ছেন।
বিক্ষোভ সমাবেশে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের একজন আমানতকারী বলেন, “পরিবারের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ব্যাংকে টাকা রেখেছিলাম। ব্যাংকের প্রতি আস্থা রেখেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু আজ সেই টাকা ফেরত না পেয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। মুনাফা তো দূরের কথা, জমা রাখা টাকাও পাচ্ছি না। এখন সংসারও চলছে না।”
এক্সিম ব্যাংকের একজন আমানতকারী বলেন, “ব্যাংকে আমানত রাখা কোনো বিনিয়োগের ঝুঁকি নয়, এটি একজন নাগরিকের নিরাপত্তার বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস নিয়েই আমরা কষ্টার্জিত অর্থ জমা রেখেছিলাম। কিন্তু এখন চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে নিজের সঞ্চয় ব্যবহার করতে পারছি না। আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না, শুধু আমাদের ন্যায্য আমানত ও মুনাফা ফেরত চাই।”
সমাবেশে আন্দোলনকারীরা ‘হই হই রই রই, আমানতের টাকা গেল কই’, ‘আমার টাকা ব্যাংকে, আমি কেন রাস্তায়’ এবং ‘হেয়ার কাট, হেয়ার কাট, মানি না, মানব না’— এমন নানা স্লোগান দেন।
তারা জানান, প্রায় দুই বছর ধরে নিজেদের জমানো অর্থ স্বাভাবিকভাবে উত্তোলন করতে না পারায় প্রায় ৭৫ লাখ পরিবারের তিন কোটিরও বেশি মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকেই চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহে চরম সংকটে রয়েছেন।
বিক্ষোভ থেকে আমানতকারীরা পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো— হেয়ার কাট নীতি বাতিল করে চুক্তি অনুযায়ী মূল আমানত ও অর্জিত মুনাফা পরিশোধ, পাঁচটি ব্যাংকে স্বাভাবিক লেনদেন চালু, তারল্য সংকট নিরসনে বিশেষ সহায়তা প্রদান, মেয়াদোত্তীর্ণ এফডিআর, ডিপিএস ও এমটিডিআরের অর্থ চুক্তি অনুযায়ী পরিশোধ এবং নতুন ঘোষিত মুনাফার হার প্রত্যাহার করে পূর্বের চুক্তিভিত্তিক হার বহাল রাখা।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের সহঃসভাপতি শারমিন আক্তার বলেন, “আমরা আমাদের ন্যায্য অর্থ ফেরতের দাবিতে আন্দোলন করছি। সংশ্লিষ্ট সবার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি। অবিলম্বে সমাধান না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।”
বক্তারা অভিযোগ করেন, গত দুই বছরে সরকারের নীতিনির্ধারক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার স্মারকলিপি দিলেও কার্যকর কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। দাবি বাস্তবায়ন না হলে শাখা পর্যায়ে অবস্থান কর্মসূচি, কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাওয়ের মতো কঠোর কর্মসূচি দেয়ারও হুঁশিয়ারি দেন তারা।
উল্লেখ্য, একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর মোট ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। এসব ব্যাংকের হেয়ার কাট নীতি বাতিল ও স্বাভাবিক লেনদেন চালুর দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন ভুক্তভোগী আমানতকারীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *