
নাটোর প্রতিনিধি :: নাটোরে বলতে গেলে অচল স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। নেই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মেম্বারদের তৎপরতা। ফলে পারিবারিক সহিংসতা আপোষ না হয়ে বাড়ছে। ফলাফল হিসেবে ঘটছে একের পর এক পারিবারিক হত্যাকান্ড। গত এক মাসে জেলায় পারিবারিক হত্যাাকান্ডের শিকার হয়েছেন সাতজন। পাশাপাশি সংঘর্ষ ও আহত হওয়ার ঘটনা রয়েছে আরো বেশ কয়েকটি। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সচল না থাকায় পারিবারিক সহিংসতা বাড়ছে বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে জেলা আইনশৃংখলা কমিটির সভায়।
জেলার সিংড়ায় বাড়ির সিমানায় টয়লেটের একটি গর্ত করা নিয়ে দুই ছেলের মধ্যে কথা কাটাকাটিতে বড় ছেলের পক্ষ নেয়ায় মারিয়া বেগম ওরফে শরিফা (৭৫) কে গত ২৫ মে গলা টিপে হত্যা করেন তার আপন মেঝ ছেলে জনাব আলী (৫৫)। সেই টয়লেটের গর্তেই আবার মায়ের লাশ ফেলে স্লাব দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। গত ৪ জুন লাশের পচা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে জনাব আলী গভীর রাতে নিজের ছেলে আল আমিন (২৫)কে সাথে নিয়ে সেই লাশ বস্তাবন্দি করে বাড়ির পাশের কচুরিপানার ডোবায় ফেলে দেন। পরে মরদেহ উদ্ধারের একদিনের মধ্যেই পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এই হত্যাকান্ডের কথা স্বীকার করেন বাবা-ছেলে। নিহতের মেয়ে মর্জিনা বেগম বাদী হয়ে এ ঘটনায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ সেই বাবা-ছেলেকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠিয়েছে। নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরিফুল হক সিংড়া থানা চত্বরে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান। ২জুন নাটোর সদর উপজেলার বড় হরিশপুর ইউনিয়নের ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে ভোররাত সোয়া ৪টার দিকে শফিকুল ইসলাম (৪৫) নামে এক ফার্নিচার ব্যবসায়ীর মরদেহ তার বড় বোনের বাড়ির উঠান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত শফিকুল ইসলাম একই গ্রামের মৃত কাশেম আলীর ছেলে। নিহতের ছেলে রুবেল জানান, জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়ে তার বাবার সঙ্গে ফুফুদের কিছুদিন ধরে বিরোধ চলছিল।
নাটোরের সিংড়া উপজেলার ইটালী ইউনিয়নের বিষ্ণপুর গ্রামে মৎস্য ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম ওরফে রুবেল (৪৫) এর শয়নকক্ষ থেকে গত ৪ মে তার গলা কাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি এই গ্রামের পল্লী চিকিৎসক মৃত কেরামত আলীর ছেলে। নিহত ব্যক্তির লাশ উদ্ধারে দেখা যায় তার গলার সামনের অংশ সিংহভাগ কাটা ও ঘটনার সময় ধস্তাধস্তিতে দুই হাতেও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাটার দাগ রয়েছে। হত্যারকান্ডের ঘটনা তদন্তে গিয়ে নিহত ব্যবসায়ীর স্ত্রী শিউলি বেগম ও ছেলে সাইফুদ্দিন সিদ্দিক ওরফে রয়েল কে আটক করেছে পুলিশ। পরে তাদের দেয়া তথ্য মতে বাড়ির সামনের পুকুর থেকে হত্যাকান্ডে ব্যবহ্নত ধারালো চাপাতি উদ্ধার করা হয়। সিংড়া থানার ওসি রফিকুল ইসলাম জানান, স্ত্রী ও ছেলের সাথে রাগারাগি করে রাতে পাশের কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন ওই ব্যবসায়ী। সকালে তার শয়ন কক্ষের মেঝেতে গলা কাটা লাশ পাওয়া যায়। মরদেহ উদ্ধারের সময় স্ত্রী ও ছেলের আচরণ দেখে পুলিশের সন্দেহ হয়। পরে তাদের কে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার তথ্য বের হয়ে আসে। মূলত সংসারে অশান্তি থেকেই মা ও ছেলের এক সপ্তাহ আগে নেয়া পরিকল্পনা অনুযায়ী চাপাতি দিয়ে ঘুমন্ত বাবাকে তার মায়ের সামনেই জবাই করে হত্যা করেন আপন ছেলে। পুলিশ তাদের দুজনকে গ্রেফতার করেছে। একই দিনে জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার বড়াইগ্রাম পশ্চিমপাড়া মহল্লায় নেশার টাকা না পেয়ে ছুরিকাঘাতে মা সাজেদা বেগম (৫৫) কে হত্যা করেছে রাজন (২২) নামে এক পাষন্ড ছেলে। নিহত সাজেদা বেগম ওই মহল্লার আব্দুল মতিনের স্ত্রী। মাদকাসক্ত ছেলে রাজন স্ত্রীকে নিয়ে উপজেলার বাগডোব গ্রামে শশুরবাড়িতে বসবাস করেন। এছাড়া আব্দুল মতিন আরেকটি বিয়ে করে অন্যত্র বসবাস করায় সাজেদা বেগম বাড়িতে একাই থাকতেন। রাজন মাঝে মাঝেই তার মায়ের কাছে এসে মাদকসেবনের জন্য জোর করে টাকা-পয়সা নিয়ে যেতো। ঘটনার দিন সে তার মায়ের কাছে এসে পুনরায় ৫শ টাকা দাবি করে। টাকা দিতে না পারায় রাজন পকেট থেকে ছুরি বের করে তার মায়ের পেটে উপর্যুপরি আঘাত করে। এতে তার নাড়িভুড়ি বের হয়ে যায়। পরের দিন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর পুলিশ অভিযুক্ত রাজনকে তার শশুরবাড়ি থেকে আটক করেছে।
১৬মে নাটোর সদর উপজেলার কাফুরিয়া ইউনিয়নের চৌগাছী গ্রামে পারিবারিক কলহের জেরে নিজ বাড়ীতে বৃদ্ধ স্বামী আব্দুল মান্নান সরকার মানু (৭০)কে ধারালো হাসুয়া দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে তার স্ত্রী রতেজান বেগম (৫৫)। প্রতিবেশীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে বৃদ্ধ আব্দুল মান্নান সরকার মানুর সংসারে পারিবারিক কলহ বিবাদ চলে আসছিলো। ঘটনার দিন সকালে স্ত্রীর সাথে ঝগড়া করে মাঠের জমিতে কাজে যায় মানু। দুপুরে জমি থেকে কাজ শেষে বাড়ি ফিরে ক্লান্ত শরীরে স্বামী মানু নিজের বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লে স্ত্রী রতেজান বেগম ধারালো হাসুয়া দিয়ে স্বামীর ঘাড়ে স্বজোরে কোপ দেয়। রক্তাক্ত অবস্থায় নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। পুলিশ রতেজান বেগমকে গ্রেফতার করেছে।
১৭মে নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার কাশিয়ারবাড়ি ইয়ারপুর গ্রামে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে আপন চাচাতো ভাইদের লাঠির আঘাতে মোঃ মনির হোসেন (৩০) নামে এক যুবক নিহত হয়েছে। নিহত মনির হোসেন ওই গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে। এর কয়েকদিন আগে নাটোরে বাক প্রতিবন্ধি ছেলের শিলপাটার শিলের আঘাতে মা শাহীদা বেগম (৫৫) নিহত হয়েছেন। নিহত শাহীদা বেগম নাটোর শহরের মল্লিকহাটি ঘোষপাড়া এলাকার প্রয়াত শরিফুল হুদা স্টারের স্ত্রী। পুলিশ ঘটনার রাতেই ছেলে আরিফ হোসেনকে আটক করেছে। আরিফ প্রায়ই বিভিন্ন কারণে মায়ের সঙ্গে উত্তেজিত আচরণ করতেন এবং মারপিট করতেন। মাকে মারপিট করলে তার মামারা এসে আরিফকে বাড়িতে বেধে রাখতো। ঘটনার দিনও সে বঁাধা ছিলো, ছেলের কস্ট দেখে মা তার বাধন খুলে দেয়। ছাড়া পেয়েই আরিফ শিলপাটার পাথরের শিল দিয়ে মায়ের মাথায় আঘাত করেন। এতে ঘটনাস্থলেই মা শাহীদা বেগম মারা যান। নাটোর জেলা আইনশৃংখলা কমিটির সর্বশেষ সভায় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই এর পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অচলবস্থার কারণে আশে পাশের জেলার চাইতে নাটোর জেলায় আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে ও পারিবারিক বিরোধে হত্যাকান্ড অনেক বেড়েছে বলে জানানো হয়। জেলা প্রশাসক আসমা শাহীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় প্রধান অতিথি জাতীয় সংসদের হুইপ অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু গোয়েন্দা সংস্থার পর্যবেক্ষনে সহমত পোষন করেন।