
॥ এবিএম ফজলুর রহমান ॥
পাবনার ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন, সমাজসেবা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণের ইতিহাসে যে কজন মানুষ নিজেদের কর্ম, প্রজ্ঞা ও মানবিক গুণাবলির মাধ্যমে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন, আলহাজ আব্দুল লতিফ বিশ্বাস তাঁদের অন্যতম। একজন সফল শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জনের পাশাপাশি তিনি ছিলেন দানশীল, সমাজহিতৈষী এবং নানা মত ও পথের মানুষের কাছে শ্রদ্ধাভাজন এক ব্যক্তিত্ব। আজ ২৯ অক্টোবর তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২৫ সালের এই দিনে থাইল্যান্ডের বামরুণগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৫ বছর বয়সে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে পাবনার ব্যবসায়ী ও সামাজিক অঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা আজও স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও পরিচিতজনের স্মৃতিতে অমলিন।
প্রয়াত এই দানবীরের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর প্রতিষ্ঠিত মনসুরাবাদ উপশহরের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে শুক্রবার জুমার নামাজের পর দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর কবর জিয়ারত এবং পরিবারের উদ্যোগে অন্যান্য ধর্মীয় কর্মসূচি পালনের আয়োজন করা হয়েছে।
আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের জীবন কেবল ব্যবসায়িক সাফল্যের গল্প নয়; এটি মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সমাজের প্রয়োজনে এগিয়ে আসা এবং নিজের সামর্থ্যকে জনকল্যাণে কাজে লাগানোর এক কর্মময় অধ্যায়। ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি তিনি ধর্মীয়, সামাজিক ও জনহিতকর কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন। তাঁর জীবনাচরণে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
‘মর্জিনা লতিফ ট্রাস্ট’-এর মহাসচিব হিসেবে তিনি জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানে শতাধিক মসজিদ, মাদ্রাসা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন জনপদে ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। মানুষের ধর্মীয় প্রয়োজন পূরণ এবং স্থায়ী প্রতিষ্ঠান নির্মাণে তাঁর এই উদ্যোগ তাঁকে দানবীর হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। তিনি তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান লতিফ রিয়েল এষ্টেট, লতিফ গ্রুপ অব কোম্পানীজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। যেখানে কয়েক হাজার মানুষের কর্মস্ংস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
পাবনার আবাসন খাতের বিকাশেও তাঁর দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায়। ১৯৭৮ সালে পাবনা শহরের উপকণ্ঠে আরিফপুর এলাকায় তিনি গড়ে তোলেন ‘মনসুরাবাদ আবাসিক এলাকা’। ঢাকার বাইরে আবাসন উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটি ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। পরবর্তী সময়ে রাজধানীর আদাবর এলাকায় পিতার নামে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মনসুরাবাদ হাউজিং সোসাইটি’। এসব উদ্যোগে তাঁর ব্যবসায়িক বিচক্ষণতা, পরিকল্পনাশক্তি ও নতুন কিছু গড়ে তোলার প্রত্যয় প্রতিফলিত হয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের প্রথম সারির বড় ঠিকাদারদের একজন হিসেবে তিনি কর্মজীবনে সুনাম অর্জন করেন। দীর্ঘদিন পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে ব্যবসায়ী সমাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে ব্যবসায়িক পরিচয়ের বাইরেও তাঁর ছিল বিস্তৃত সামাজিক পরিসর। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। সামাজিক বিরোধ, ব্যক্তিগত সমস্যা কিংবা রাজনৈতিক মতপার্থক্য দেখা দিলে অনেকেই তাঁর শরণাপন্ন হতেন। তিনি উভয় পক্ষের কথা শুনে সমঝোতার পথ খুঁজতেন। এভাবেই সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অভিভাবকতুল্য এক শ্রদ্ধেয় মুরুব্বি।
১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি পাবনার এক সুপরিচিত ও সচ্ছল পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা মনসুর আলী বিশ্বাস ছিলেন বড় ঠিকাদার, জমিদার ও বিত্তশালী ব্যক্তি। পারিবারিক ঐতিহ্য ও নিজস্ব কর্মদক্ষতার সমন্বয়ে আব্দুল লতিফ বিশ্বাস কর্মজীবনে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি আরিফপুর গোরস্তান কমিটি, ঈদগাহ কমিটি, মসজিদ ও মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি চার সন্তানের জনক ছিলেন। তাঁর দুই সন্তান আব্দুল বাতেন বিশ্বাস ও মুক্তার হোসেন বিশ্বাস আগেই ইন্তেকাল করেছেন। জীবিত দুই সন্তানের মধ্যে রয়েছেন আলহাজ আব্দুল মতিন বিশ্বাস ও আক্তার বিশ্বাস। চার ভাইয়ের মধ্যে আলহাজ আব্দুল মজিদ বিশ্বাস জীবিত আছেন। বড় ভাই আনছার আলী বিশ্বাস ও ছোট ভাই আব্দুল মান্নান বিশ্বাস প্রয়াত হয়েছেন।
মানুষের জীবনের প্রকৃত সার্থকতা কেবল অর্জিত সম্পদ, প্রতিষ্ঠা কিংবা সামাজিক পরিচিতিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের জন্য কী রেখে যাওয়া গেল, কত মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হলো-তার মধ্যেই নিহিত জীবনের গভীর তাৎপর্য। আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের জীবন ও কর্মের দিকে ফিরে তাকালে এই সত্যই নতুন করে উপলব্ধি করা যায়। তাঁর গড়ে তোলা আবাসন এলাকা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ তাঁর কর্মময় জীবনের স্মারক হয়ে থাকবে।
প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছেন পরিবারের সদস্য, স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী, ব্যবসায়ী সমাজ ও অসংখ্য পরিচিতজন। মানুষের জীবন একদিন থেমে যায়, কিন্তু মানুষের কল্যাণে নিবেদিত কর্ম, উদারতা ও ভালোবাসার স্মৃতি কখনো হারিয়ে যায় না। দানবীর আলহাজ আব্দুল লতিফ বিশ্বাসও তাঁর কর্ম, অবদান ও মানবিকতার মধ্য দিয়ে পাবনার মানুষের হৃদয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
লেখক : এবিএম ফজলুর রহমান, পরিচালক, পাবনা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি ও সাবেক সভাপতি পাবনা প্রেসক্লাব।
এবিএম ফজলুর রহমান,
পরিচালক, পাবনা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি
ও
সাবেক সভাপতি পাবনা প্রেসক্লাব।