👁 352 Views

শার্শায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সোনামুখো বিলে ১৫ কোটি টাকার মাছ মারা গেছে

ইয়ানূর রহমান : যশোরের শার্শা উপজেলার সোনামুখো বিলে দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ বিভ্রাটে অক্সিজেন সংকট সৃষ্টি হয়ে প্রায় ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার মাছ মারা গেছে।

শুক্রবার (২১ আগস্ট) রাত আনুমানিক ১টার দিকে উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের রায়পুর-সোনামুখো বিলের সজনের ঘেরে এ মাছের মড়ক শুরু হয়। শনিবার সকাল হতে না হতেই বিপুল পরিমাণ পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মরে পানিতে ভেসে ওঠে।

খামার মালিকদের অভিযোগ, দিন-রাতের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘন ঘন ও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট হওয়ায় ঘেরে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। এর সঙ্গে বৈরী আবহাওয়া যোগ হয়ে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিপুল পরিমাণ মাছ মারা যায়। এ ঘটনায় শুধু সোনামুখো বিলের খামারিরাই নন, বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে উপজেলার অন্যান্য মৎস্যচাষিরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

সোনামুখো বিলের এ ঘেরটির মালিক এ এফ মৎস্য খামার। যৌথভাবে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন আলফাজুল হক ও ফারুক হোসেন। খামার মালিকদের হিসাবে, ২০০ বিঘা ঘেরে ৬০ লাখ পিস পাবদা মাছ চাষ করা হয়েছিল। প্রতি ১৫টি পাবদা মাছে প্রায় এক কেজি হিসেবে মোট উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার মণ। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ মাছের দাম প্রায় ১৫ হাজার টাকা। সে হিসাবে মাছের বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৫ কোটি টাকা ৫০ লক্ষ টাকা। মাছগুলো বাজারজাত ও ভারতে রপ্তানির প্রক্রিয়াও চলছিল।

খামার মালিক আলফাজুল হক বলেন, ঘেরে বিপুল পরিমাণ পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ছিল। এর বড় একটি অংশ বিক্রির উপযোগী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু হঠাৎ দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। পরে বৈরী আবহাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, “মাছের খাদ্য বাবদ বাজারের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা বাকিতে নিয়েছি। সব মিলিয়ে আমাদের প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখন এই ঋণ কীভাবে পরিশোধ করব, কীভাবে আবার ঘুরে দাঁড়াব-কিছুই বুঝতে পারছি না।”

অপর খামারি ফারুক হোসেন বলেন, “আমরা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছি। হয়তো আর ঘুরে দাঁড়াতে পারব না। এই খামারের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় একশ পরিবার নির্ভরশীল। রাত ১টার পর থেকে বিদ্যুৎ না থাকায় অক্সিজেনের ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়ে যায়। সকাল হওয়ার আগেই বিপুল পরিমাণ পাবদা মাছ মারা যায় এবং পরে পচতে শুরু করে।”

ঘের এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পানির ওপর অসংখ্য মৃত মাছ ভেসে রয়েছে। কোথাও কোথাও মাছ পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ও পরিশ্রম এক রাতের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাওয়ায় খামার মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে।

খামার সংশ্লিষ্টরা জানান, এ খামারে উৎপাদিত পাবদা মাছের একটি অংশ রপ্তানি চেইনের মাধ্যমে ভারতে যায়। ফলে এ ধরনের মাছ চাষ শুধু স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণই করে না, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ভূমিকা রাখে।

শার্শা উপজেলায় উৎপাদিত মাছ দেশের আমিষের চাহিদা পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে জানান স্থানীয় মৎস্যচাষি ও উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর।

ক্ষতিগ্রস্থ মাছ চাষিদের অভিযোগ, মাছের মড়ক শুরু হওয়ার পর থেকে শার্শা উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর বা বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে এসে খোঁজখবর নেননি। তারা দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।

মাছচাষিরা বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন শুধু একটি খামারের সমস্যা নয়। গত কয়েক দিনে দিন-রাতের ২৪ ঘণ্টায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মৎস্যচাষিরাও উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে আধুনিক পদ্ধতিতে অক্সিজেন সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল বড় বড় ঘেরগুলোতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে একই ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।

স্থানীয় মৎস্যচাষিদের দাবি, বিদ্যুৎ সরবরাহে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প বিদ্যুৎ ও অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তারা।

এদিকে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রকৃত কারণ, কতক্ষণ বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল, অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা কেন ব্যর্থ হলো এবং প্রকৃতপক্ষে কত টাকার মাছ মারা গেছে-এসব বিষয় তদন্ত করে দেখার দাবি উঠেছে।

এক রাতের বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও অক্সিজেন সংকটে নিঃস্ব হওয়ার পথে এ এফ মৎস্য খামারের দুই উদ্যোক্তা। তাদের সঙ্গে অনিশ্চয়তায় পড়েছে খামারের ওপর নির্ভরশীল প্রায় একশ পরিবার। একই সঙ্গে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে শার্শার অন্যান্য মৎস্য খামারিদের মধ্যেও। #

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *