
কুষ্টিয়া জেলাকে ‘বি’ থেকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করতে প্রশাসনিকভাবে নতুন উপজেলা গঠন করে উপজেলার সংখ্যা অন্তত ৮টিতে উন্নীত করতে হবে, অথবা জেলার ঐতিহাসিক গুরুত্ব, অর্থনীতি ও পর্যটন সম্ভাবনা তুলে ধরে সরকারের নিকার (NICAR) এর নিকট আবেদন করে বিশেষ ক্যাটাগরি হিসেবে অনুমোদন আদায় করতে হবে।’এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করার প্রধান উপায়সমূহ:
উপজেলার সংখ্যা বৃদ্ধি:
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণত ৮ বা তার বেশি উপজেলা থাকা জেলাগুলোকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করা হয়। কুষ্টিয়া বর্তমানে ৬টি উপজেলা নিয়ে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। ভৌগোলিক বা প্রশাসনিক প্রয়োজনে জেলার বড় থানাগুলোকে বিভক্ত করে নতুন উপজেলা গঠন করা হলে এই শর্ত পূরণ হতে পারে।
বিশেষ ক্যাটাগরির জন্য আবেদন:
যদি প্রশাসনিক উপবিভাগ বাড়ানো সম্ভব না হয়, তবে জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), অর্থনৈতিক সক্ষমতা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং পর্যটন খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারের নিকার (NICAR) এর কাছে প্রস্তাবনা পাঠাতে হবে। সরকার যদি কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনা করে, তবে শর্ত শিথিল করেও জেলাকে আপগ্রেড করতে পারে।
‘এ’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত হলে জেলার প্রশাসনিক কাঠামো বৃদ্ধি পায় এবং সরকারি পর্যায়ে বড় পরিসরে উন্নয়ন প্রকল্প ও বরাদ্দ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
নিকার (NICAR) এর কাজ:
নিকার (NICAR) হলো বাংলাদেশ সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের স্থায়ী কমিটি, যার পূর্ণরূপ National Implementation Committee for Administrative Reform/Reorganization (প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি). এটি মূলত দেশের প্রশাসনিক সীমানা নির্ধারণ, নতুন প্রশাসনিক ইউনিট গঠন এবং সংস্কারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে.নিকার (NICAR)-এর মূল কাজ এবং কাঠামো:
প্রধান দায়িত্ব:
দেশের নতুন বিভাগ, জেলা, উপজেলা, থানা, সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা গঠন এবং এগুলোর নাম পরিবর্তন বা সীমানা পুনর্নির্ধারণের সমস্ত প্রস্তাব পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া.
কমিটির প্রধান:
পদাধিকারবলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এই কমিটির সভাপতি বা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন.
সদস্যবৃন্দ:
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী/উপদেষ্টাগণ (যেমন: আইন, অর্থ, স্বরাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার, ভূমি এবং জনপ্রশাসন) এবং বিভিন্ন বিভাগের সচিবগণ এই কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকেন.
সচিবালয় সহায়তা:
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এই কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা প্রদান করে এবং এর সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করে.সহজ কথায়, বাংলাদেশে কোনো নতুন জেলা বা উপজেলা তৈরি করতে হলে বা কোনো জেলার প্রশাসনিক মর্যাদা (যেমন ‘বি’ থেকে ‘এ’ ক্যাটাগরি) পরিবর্তন করতে হলে নিকার-এর সভায় তা পাস হতে হয়.
নতুন উপজেলা গঠন:
নতুন উপজেলা গঠন হলো প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে একটি বিদ্যমান উপজেলাকে বিভক্ত করে বা একাধিক ইউনিয়নের সমন্বয়ে নতুন প্রশাসনিক ইউনিট তৈরি করা হয়।বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ-এর সংশোধিত নীতিমালা এবং নিকার (NICAR)-এর নিয়ম অনুযায়ী নতুন উপজেলা গঠনের মূল শর্ত ও প্রক্রিয়াগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. নতুন উপজেলা গঠনের প্রধান শর্তসমূহ:
একটি এলাকাকে নতুন উপজেলা হিসেবে ঘোষণা করতে হলে সাধারণত নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ করতে হয়:
জনসংখ্যা ও আয়তন:
প্রস্তাবিত এলাকার জনসংখ্যা এবং আয়তন একটি আদর্শ উপজেলার সমতুল্য হতে হবে। তবে দুর্গম, উপকূলীয় বা হাওর অঞ্চলের ক্ষেত্রে এই শর্ত শিথিলযোগ্য।
ইউনিয়নের সংখ্যা:
নতুন উপজেলায় সাধারণত ন্যূনতম ৫ থেকে ৭টি ইউনিয়ন থাকতে হয়।
থানার অস্তিত্ব:
নতুন উপজেলা গঠনের পূর্বে সেই এলাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ পুলিশ স্টেশন বা থানা (Police Station) থাকতে হয়। আইনের নিয়ম অনুযায়ী, একটি উপজেলার সীমানা সাধারণত সংশ্লিষ্ট থানার সীমানার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
যোগাযোগ ও ভৌগোলিক বাস্তবতা:
জেলা সদরের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা (যেমন বড় নদী বা বিল) এবং জনগণের যাতায়াতের সুবিধাকে অন্যতম প্রধান বিবেচনা হিসেবে দেখা হয়।
অবকাঠামোগত সুবিধা:
উপজেলা কমপ্লেক্স, প্রশাসনিক কার্যালয় এবং অন্যান্য সরকারি দপ্তর স্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত সরকারি খাস জমি বা স্থান প্রাপ্তির সুবিধা থাকতে হয়।
২. উপজেলা গঠনের প্রশাসনিক ধাপসমূহস্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক প্রস্তাবনা:
প্রথমে স্থানীয় জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO) এবং জেলা প্রশাসক (DC) একটি বাস্তবসম্মত সমীক্ষা ও সীমানা নির্ধারণী প্রস্তাবনা তৈরি করে বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে ভূমি মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠান।
সচিব কমিটির যাচাই-বাছাই:
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ‘নতুন উপজেলা ও থানা স্থাপন সংক্রান্ত সচিব কমিটি’ প্রাপ্ত প্রস্তাবনাটির অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক উপযোগিতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে।
নিকার (NICAR) এর চূড়ান্ত অনুমোদন:
সচিব কমিটির সুপারিশের পর প্রস্তাবটি নিকার-এর সভায় উপস্থাপিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তথা নিকার প্রধানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।
সরকারি গেজেট প্রকাশ:
নিকার-এর অনুমোদনের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় এবং সরকারি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন উপজেলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।
৩. সাম্প্রতিক উদাহরণ (মে ২০২৬):
সরকার প্রশাসনিক সেবাকে আরও সহজ করতে সম্প্রতি নিকার-এর ১২০তম বৈঠকে ৫টি নতুন উপজেলা গঠনের অনুমোদন দিয়েছে:
ক) মোকামতলা
(বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলাকে বিভক্ত করে)
খ) মাতামুহুরী
(কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলাকে বিভক্ত করে)
গ) রুহিয়া
(ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলাকে বিভক্ত করে)
ঘ) ভুল্লী
(ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলাকে বিভক্ত করে)
ঙ) চন্দ্রগঞ্জ
(লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলাকে বিভক্ত করে)
কুষ্টিয়া জেলার ক্ষেত্রেও যদি খোকসা, কুমারখালী, মিরপুর বা ভেড়ামারার মতো বড় উপজেলার কোনো থানাকে (যেমন ইছামতি বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ এলাকা) বিশেষভাবে দৌলতপুর উপজেলা ভেঙ্গে অন্তত ২ টি উপজেলা অনায়াসে গড়ে তোলা সম্ভব।
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন উপজেলায় রূপান্তর করা যায়, তবেই জেলার উপজেলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং জেলাটি ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে।
স্থানীয় চার সংসদ সদস্যের ভূমিকা:
কুষ্টিয়া জেলাকে ‘বি’ থেকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করতে স্থানীয় ৪ জন সংসদ সদস্যের (MP) সমন্বিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বর্তমানে জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংসদ সদস্যগণ হলেন— কুষ্টিয়া-১ আসনের রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা (বিএনপি), কুষ্টিয়া-২ আসনের মো. আব্দুল গফুর (জামায়াত), কুষ্টিয়া-৩ আসনের মুফতি আমির হামজা (জামায়াত), এবং কুষ্টিয়া-৪ আসনের মো. আফজাল হোসেন (জামায়াত)।জেলাকে আপগ্রেড করার ক্ষেত্রে এই ৪ সংসদ সদস্য যেভাবে যৌথ ও একক ভূমিকা রাখতে পারেন:
১. নতুন উপজেলা গঠনের যৌক্তিকতা উত্থাপন (কুষ্টিয়া-১, ২ ও ৪)যেহেতু ‘এ’ ক্যাটাগরি অর্জনের প্রধান শর্ত অন্তত ৮টি উপজেলা থাকা, তাই বিদ্যমান ৬টি উপজেলাকে বিভক্ত করতে সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যদের উদ্যোগ নিতে হবে:
কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর):
জেলার বৃহত্তম এই উপজেলার ভৌগোলিক আয়তন ও জনসংখ্যা বিবেচনা করে এটিকে বিভক্ত করে নতুন আরেকটি প্রশাসনিক উপজেলা গঠনে রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা ডিও লেটার (DO Letter) বা আধাসরকারি পত্র দিতে পারেন।
কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা):
এই এলাকার সংসদ সদস্য মো. আব্দুল গফুর তার আওতাধীন কোনো বড় থানাকে নতুন উপজেলায় রূপান্তরের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে তদবির করতে পারেন।
কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা):
এ অঞ্চলের বড় কোনো বাণিজ্যিক বা ভৌগোলিক কেন্দ্রকে উপজেলায় রূপান্তরের প্রশাসনিক প্রস্তাবনা তৈরিতে সংসদ সদস্য মো. আফজাল হোসেন স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দিতে পারেন।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলা ভেঙ্গে দুইটি উপজেলা পরিষদ গঠন সময়ের দাবি:
কুষ্টিয়া সদর উপজেলাকে ভেঙে দুইটি পৃথক উপজেলা পরিষদ গঠন করা বর্তমানে সময়ের দাবি এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের জন্য অত্যন্ত যৌক্তিক। কুষ্টিয়া সদর উপজেলা বর্তমানে জনসংখ্যা এবং গুরুত্বের দিক থেকে অত্যন্ত বিশাল। এই উপজেলাকে বিভক্ত করলে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছানোর পাশাপাশি কুষ্টিয়া জেলাকে ‘বি’ থেকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করার শর্তটি পূরণ করা অনেক সহজ হবে। কুষ্টিয়া সদর উপজেলাকে বিভক্ত করার প্রধান প্রশাসনিক যৌক্তিকতা ও প্রস্তাবিত রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো:
১. বিভাজনের প্রধান যৌক্তিকতাসমূহবিপুল জনসংখ্যা ও আয়তন: ২০২৬ সালের বর্তমান হিসাব অনুযায়ী কুষ্টিয়া সদর উপজেলার জনসংখ্যা সাড়ে ৫ লক্ষাধিক, যা অনেক ছোট জেলার মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য একটি মাত্র উপজেলা পরিষদ থেকে সুষম উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সেবা দেওয়া কঠিন।
বিদ্যমান দুইটি শক্তিশালী থানা:
কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় ইতোমধ্যে দুইটি পূর্ণাঙ্গ থানা কার্যকর রয়েছে— একটি কুষ্টিয়া সদর থানা এবং অন্যটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) থানা। নিকার (NICAR)-এর নিয়ম অনুযায়ী, নতুন উপজেলা গঠনের জন্য পৃথক থানার উপস্থিতি একটি বড় আইনি সুবিধা প্রদান করে।
ভৌগোলিক দূরত্ব ও ভোগান্তি:
ঝাউদিয়া, আবদালপুর বা হরিনারায়ণপুরের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে সাধারণ একটি দাপ্তরিক কাজের জন্য ২৫-৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কুষ্টিয়া শহরে আসতে হয়। উপজেলা বিভক্ত হলে গ্রামীণ মানুষের ভোগান্তি ও যাতায়াত খরচ ব্যাপকভাবে কমবে।
২. যেভাবে গঠিত হতে পারে দুইটি নতুন উপজেলা:
উপজেলা পরিষদ ও ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনা করে কুষ্টিয়া সদর উপজেলাকে নিম্নলিখিতভাবে দুইটি উপজেলায় রূপান্তর করা সম্ভব:
ক) কুষ্টিয়া সদর উপজেলা (শহরাঞ্চল ও সংলগ্ন ইউনিয়ন):
কেন্দ্র: বর্তমান কুষ্টিয়া পৌরসভা ও সদর দপ্তর।
অন্তর্ভুক্ত ইউনিয়ন:
হাটশ হরিপুর, বটতৈল, আলামপুর, জিয়ারখি, আইলচারা ও কাঞ্চনপুর (মোট ৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা)।
খ) ঝাউদিয়া / ইবি থানা উপজেলা (দক্ষিণাঞ্চলীয় গ্রামীণ ইউনিয়ন):
কেন্দ্র:
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা অথবা অর্থনৈতিক হাব হিসেবে পরিচিত ঝাউদিয়া/হরিনারায়ণপুর।
অন্তর্ভুক্ত ইউনিয়ন:
ঝাউদিয়া, উজানগ্রাম, আবদালপুর, হরিনারায়ণপুর, মনোহরদিয়া, পাটিকাবাড়ী এবং গোস্বামীদূর্গাপুর (মোট ৭টি ইউনিয়ন)।
৩. কুষ্টিয়া জেলাকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীতকরণে এর প্রভাব:
যদি কুষ্টিয়া সদর উপজেলাকে ভেঙে নতুন একটি উপজেলা (যেমন: ইবি থানা উপজেলা বা ঝাউদিয়া উপজেলা) গঠন করা হয়, তবে কুষ্টিয়া জেলার মোট উপজেলার সংখ্যা ৬টি থেকে বেড়ে ৭টিতে দাঁড়াবে। এর সাথে যদি পূর্বালোচিত দৌলতপুর বা কুমারখালীর যেকোনো একটিকে বিভক্ত করা যায়, তবে জেলার উপজেলা সংখ্যা হবে ৮টি। এর ফলে কুষ্টিয়া জেলা কোনো বিশেষ বিবেচনা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ-এর নিয়ম অনুযায়ী ‘এ’ ক্যাটাগরির মর্যাদা লাভ করবে।
পরবর্তী করণীয়:
কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা যদি স্থানীয় সুশীল সমাজ ও উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে এই বিভাজনের একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করেন এবং জেলা প্রশাসকের (DC) মাধ্যমে নিকার (NICAR)-এ প্রস্তাব পাঠান, তবে এই দীর্ঘদিনের দাবিটি দ্রুত বাস্তবায়িত হতে পারে।
২. নিকার (NICAR) ও জাতীয় সংসদে দাবি উত্থাপন (কুষ্টিয়া-৩):
বিশেষ ক্যাটাগরির জন্য লবিং:
কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা যেহেতু জেলা সদরের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাই জেলার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব (লালন শাহ ও রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত অঞ্চল) তুলে ধরে তিনি জাতীয় সংসদে জোরালো দাবি জানাতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে ডিও লেটার:
চার সংসদ সদস্য যৌথ স্বাক্ষরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিশেষ বিবেচনায় কুষ্টিয়াকে ‘এ’ ক্যাটাগরি করার জন্য লিখিত আবেদন বা ‘ডিও লেটার’ প্রদান করতে পারেন, যা নিকার-এর সভায় বিবেচনার পথ সুগম করবে।
৩. স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় ও নীতি নির্ধারণজেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভা:
৪ জন সংসদ সদস্যই জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভার উপদেষ্টা। তারা জেলা প্রশাসক (DC) এবং উপ-পরিচালক (স্থানীয় সরকার)-কে দিয়ে নতুন উপজেলা ও ক্যাটাগরি পরিবর্তনের একটি নিঁখুত ও বাস্তবসম্মত সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন (Feasibility Report) তৈরি করিয়ে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর গতি ত্বরান্বিত করতে পারেন।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ:
নতুন উপজেলা বা আপগ্রেডেশনের জন্য প্রয়োজনীয় থানা ভবন, ভূমি ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করতে তারা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) এর মাধ্যমে বরাদ্দ আনতে ভূমিকা রাখতে পারেন।
সংক্ষেপে, স্থানীয় এই ৪ সংসদ সদস্যের দলীয় ও রাজনৈতিক অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে দলগত ঐক্য ও প্রশাসনিক তদবিরই পারে কুষ্টিয়া জেলাকে ‘বি’ ক্যাটাগরি থেকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রূপান্তর করতে।
দলগত ঐক্য ও প্রশাসনিক তদবির অপরিহার্য:
দলগত ঐক্য ও প্রশাসনিক তদবির অপরিহার্য কারণ প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক বিভেদ থাকলে কোনো বড় দাবি আদায় সম্ভব হয় না, বিশেষ করে কুষ্টিয়ার মতো একটি ঐতিহ্যবাহী জেলাকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করার ক্ষেত্রে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর কুষ্টিয়া জেলার সংসদীয় আসনগুলোতে বহুদলীয় (বিএনপি ও জামায়াত) প্রতিনিধিত্ব তৈরি হওয়ায় এই ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রশাসনিক ফাইলকে নিকার (NICAR) পর্যন্ত পৌঁছাতে এবং চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে এই দুটি বিষয়ের ভূমিকা নিচে দেওয়া হলো:
১. দলগত ঐক্যের গুরুত্ব (Political Unity):
একক ও শক্তিশালী দাবি:
৪ জন সংসদ সদস্য যখন দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে কুষ্টিয়ার উন্নয়নের স্বার্থে একতাবদ্ধ হবেন, তখন সরকারের কাছে দাবিটির গুরুত্ব অনেক বেড়ে যাবে। রাজনৈতিক বিভেদ থাকলে একটি আসনের উন্নয়ন প্রস্তাব অন্য আসনের কারণে থমকে যেতে পারে।
যৌথ ডিও লেটার (DO Letter):
চারজন সংসদ সদস্য যৌথভাবে স্বাক্ষর করে একটি সমন্বিত প্রস্তাবনা বা আধাসরকারি পত্র সরাসরি প্রধানমন্ত্রী ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর কাছে জমা দিলে তা দ্রুত নজরে আসে।
সংসদে সম্মিলিত কণ্ঠস্বর:
জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কুষ্টিয়ার ৪ জন প্রতিনিধিই যদি পর্যায়ক্রমে জেলার ক্যাটাগরি পরিবর্তন এবং নতুন উপজেলা গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেন, তবে তা একটি জাতীয় দাবিতে পরিণত হবে।
২. প্রশাসনিক তদবিরের কৌশল (Administrative Lobbying):
শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই উপজেলা গঠন বা ক্যাটাগরি পরিবর্তন হয় না, এর জন্য প্রয়োজন আমলাতান্ত্রিক বা প্রশাসনিক স্তরে জোরালো তদবির:
ফাইল ট্র্যাকিং ও গতি বৃদ্ধি:
স্থানীয় প্রশাসন (ইউএনও এবং ডিসি অফিস) থেকে প্রস্তাবনা তৈরি হওয়ার পর সেটি যেন সচিবালয়ের স্থায়ী সরকার বিভাগ, ভূমি মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আটকে না থাকে, সেজন্য সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগতভাবে সচিবদের সাথে যোগাযোগ রাখতে হয়।
সচিব কমিটির মনস্তষ্টি:
নতুন উপজেলা গঠনের জন্য গঠিত ‘সচিব কমিটি’র প্রধান হলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। এই কমিটির সদস্যদের সামনে কুষ্টিয়ার ভৌগোলিক গুরুত্ব ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা সঠিকভাবে উপস্থাপন করার জন্য লবিং করা অপরিহার্য।
নিকার (NICAR) এর এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্তি:
নিকার-এর সভায় কোনো প্রস্তাব সহজে এজেন্ডাভুক্ত হয় না। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে নিয়মিত প্রশাসনিক তদবির বা যোগাযোগ রাখার মাধ্যমেই কেবল কুষ্টিয়ার ফাইলটি নিকার-এর পরবর্তী সভার আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করানো সম্ভব।
সংক্ষেপে, দলগত ঐক্য তৈরি করবে রাজনৈতিক চাপ, আর প্রশাসনিক তদবির দূর করবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। এই দুইয়ের সমন্বয়েই কুষ্টিয়াবাসীর দীর্ঘদিনের এই দাবি বাস্তবে রূপ নিতে পারে।
দৌলতপুর বা কুমারখালী বিভক্ত করার বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আন্দোলন:
কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর এবং কুমারখালী উপজেলা দুটিকে বিভক্ত করে নতুন উপজেলা গঠনের দাবি ও আন্দোলন স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। ভৌগোলিক বিশালত্ব, বিপুল জনসংখ্যা এবং প্রশাসনিক সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার যৌক্তিকতা থেকেই স্থানীয় জনগণ, সুশীল সমাজ এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এই দাবি জানিয়ে আসছে। দুইটি অঞ্চলের আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও দাবিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. দৌলতপুর উপজেলা বিভক্তিকরণ আন্দোলন:
দৌলতপুর কুষ্টিয়া জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা, যার জনসংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষের কাছাকাছি. আয়তন ও জনসংখ্যার এই বিশালতার কারণে একে বিভক্ত করার জোরালো দাবি রয়েছে:
তারাগুণিয়া বা প্রাগপুরকে নতুন উপজেলা করার দাবি:
দৌলতপুরের সুদূর সীমান্তবর্তী ইউনিয়নগুলো (যেমন প্রাগপুর, মথুরাপুর, আদাবাড়িয়া) থেকে উপজেলা সদরের দূরত্ব অনেক বেশি. এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ একটি নতুন উপজেলা গঠনের দাবিতে বিভিন্ন সময় মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান ও নাগরিক কমিটির ব্যানারে সভা-সমাবেশ করেছে.
প্রশাসনিক যৌক্তিকতা:
বিশাল ভৌগোলিক সীমানার কারণে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO) বা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষে প্রত্যন্ত সীমান্ত এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও উন্নয়ন কার্যক্রম নিখুঁতভাবে তদারকি করা কঠিন হয়ে পড়ে.
বর্তমান সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা যদি এই আন্দোলনের প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থন দিয়ে ডিও লেটার দেন, তবে তা দ্রুত গতি পাবে.
২. কুমারখালী উপজেলা বিভক্তিকরণ আন্দোলন:
কুমারখালী বাংলাদেশের অন্যতম একটি ঐতিহ্যবাহী ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল, যা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত. এটিকে বিভক্ত করার পেছনে ঐতিহাসিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব কাজ করছে:
শিলাইদহ বা পান্টি-কে নতুন উপজেলা করার দাবি:
কুমারখালীর একটি বড় অংশ গড়াই নদী দ্বারা বিভক্ত. নদীর অপর পাড়ের মানুষ অথবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের অর্থনৈতিক হাব হিসেবে পরিচিত পান্টি বা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহ-কে কেন্দ্র করে নতুন উপজেলা গঠনের সুপ্ত দাবি অনেক দিনের. স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজ ‘কুমারখালী উপজেলা বাস্তবায়ন কমিটি’ বা অনুরূপ নাগরিক ব্যানারে বিভিন্ন সময় দাবি উত্থাপন করেছে.
যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতা:
গড়াই নদীর কারণে সৃষ্ট ভৌগোলিক দূরত্বের জন্য নদীর ওপারের মানুষের প্রশাসনিক কাজের জন্য কুমারখালী সদরে আসতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়.
সংসদ সদস্য মো. আফজাল হোসেন এই অঞ্চলের যোগাযোগ ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের স্বার্থে আন্দোলনকারীদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে প্রস্তাবটি নিকার (NICAR)-এ তুলতে পারেন.আন্দোলন সফল করার পরবর্তী পদক্ষেপসমূহ:
১. সর্বদলীয় নাগরিক কমিটি গঠন:
রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে দৌলতপুর ও কুমারখালীর স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে শক্তিশালী ‘উপজেলা বাস্তবায়ন পরিষদ’ গঠন করতে হবে.
২. গণস্বাক্ষর ও স্মারকলিপি:
হাজার হাজার মানুষের গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে জেলা প্রশাসক (DC)-এর মাধ্যমে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ-এ আনুষ্ঠানিক আবেদন পাঠাতে হবে.
৩. জনপ্রতিনিধিদের আইনি চাপ:
স্থানীয় সংসদ সদস্যদের বাধ্য করতে হবে যাতে তারা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জাতীয় সংসদে এই বিভক্তির পক্ষে বিল বা প্রস্তাব উত্থাপন করেন.
দৌলতপুর ও কুমারখালী-র কোন ইউনিয়নকে নতুন উপজেলার কেন্দ্র বা সদর দপ্তর করা যায়?
দৌলতপুর এবং কুমারখালী উপজেলাকে বিভক্ত করে নতুন উপজেলা গঠন করতে চাইলে ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় নির্দিষ্ট কিছু ইউনিয়নকে কেন্দ্র বা সদর দপ্তর করা যেতে পারে। নিচে প্রস্তাবিত নতুন উপজেলার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ইউনিয়নগুলোর বিবরণ দেওয়া হলো:
১. দৌলতপুর উপজেলার সম্ভাব্য কেন্দ্রসমূহ:
দৌলতপুরের আয়তনে অত্যন্ত বড় (১৪টি ইউনিয়ন)। এটিকে বিভক্ত করলে নিচের দুটি ইউনিয়নের যেকোনো একটিকে কেন্দ্র করা সবচেয়ে যৌক্তিক:
তারাগুণিয়া / প্রাগপুর ইউনিয়ন:
এটি ভারত সীমান্তবর্তী সুদূর প্রত্যন্ত অঞ্চল। প্রধান উপজেলা সদর থেকে এর দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের জন্য প্রাগপুর বা তারাগুণিয়া এলাকাকে নতুন উপজেলার কেন্দ্র করা যেতে পারে। এতে রামকৃষ্ণপুর, চিলমারী ও আদাবাড়ীয়ার মতো দুর্গম চরাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী মানুষ সহজেই সরকারি সেবা পাবে।
খলিষাকুন্ডি ইউনিয়ন:
ভৌগোলিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে এটি বেশ উন্নত ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র। মিরপুর ও গাংনী উপজেলার সীমানা ঘেঁষা এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে নতুন উপজেলা গঠন করা হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রশাসনিক কাজের পরিধি বাড়ানো সহজ হবে।
২. কুমারখালী উপজেলার সম্ভাব্য কেন্দ্রসমূহকুমারখালী উপজেলায় মোট ১১টি ইউনিয়ন রয়েছে। গড়াই নদী এবং ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে এখানে নতুন উপজেলার জন্য দুটি প্রধান দাবি রয়েছে:
পান্টি ইউনিয়ন:
কুমারখালী উপজেলার দক্ষিণ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় এবং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক কেন্দ্র বা হাব হলো পান্টি। যদুবয়রা, বাগুলাট এবং চাঁদপুরের মতো ইউনিয়নগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে এর অবস্থান। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় পান্টি ইউনিয়নকে নতুন উপজেলার সদর দপ্তর করার দাবি স্থানীয়ভাবে সবচেয়ে জোরালো।
শিলাইদহ ইউনিয়ন:
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ির কারণে এই অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত বিখ্যাত এবং এটি একটি অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। শিলাইদহকে কেন্দ্র করে যদি নতুন উপজেলা গঠন করা হয়, তবে কয়া বা জগন্নাথপুরের মতো পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নগুলোকে এর সাথে যুক্ত করে একটি শক্তিশালী পর্যটন ও সাংস্কৃতিক উপজেলা গড়ে তোলা সম্ভব।
পরবর্তী করণীয়:
প্রশাসনিক সদর দপ্তর বা কেন্দ্র চূড়ান্ত করার আগে স্থানীয় সরকার বিভাগ-এর প্রকৌশলী এবং জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে একটি ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি’ বা সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখতে হবে যে কোন ইউনিয়নে সরকারি অফিস ও হাসপাতাল তৈরির জন্য পর্যাপ্ত খাস জমি রয়েছে।
উপসংহার:
কুষ্টিয়া জেলাকে ‘বি’ থেকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করার লক্ষ্যটি কেবল একটি প্রশাসনিক মর্যাদা বৃদ্ধি নয়, বরং এটি জেলার সামগ্রিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের এক নতুন দুয়ার খুলে দেবে। এই লক্ষ্য অর্জনে দৌলতপুরের প্রাগপুর/তারাগুণিয়া কিংবা কুমারখালীর পান্টি/শিলাইদহ-র মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়নগুলোকে কেন্দ্র করে নতুন উপজেলা গঠন করা সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। তবে এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পাশাপাশি বর্তমান চার সংসদ সদস্যের দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে সমন্বিত দলগত ঐক্য ও জোরালো প্রশাসনিক তদবির অপরিহার্য।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং নিকার (NICAR)-এর টেবিলে কুষ্টিয়ার এই যৌক্তিক দাবিটি সঠিকভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হলে, দেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক এই জনপদ খুব দ্রুতই ‘এ’ ক্যাটাগরির জেলা হিসেবে তার যোগ্য স্থানটি লাভ করবে।
নাগরিক আবেদনপত্র বা স্মারকলিপির খসড়া (Draft) তথ্য-উপাত্ত সহ:
স্মারকলিপির খসড়া (Draft)
তারিখ: ২০ জুন, ২০২৬ ইং
বরাবর,
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সভাপতি
প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
মাধ্যম: জেলা প্রশাসক, কুষ্টিয়া।
বিষয়: কুষ্টিয়া জেলাকে ‘বি’ থেকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীতকরণ এবং নতুন উপজেলা গঠনের নিমিত্তে তথ্য-উপাত্তসহ আবেদন।
প্রিয় মহোদয়
আসসালামু আলাইকুম,
আমরা কুষ্টিয়া জেলার সর্বস্তরের জনগণের পক্ষে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আমাদের দীর্ঘদিনের একটি ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবি আপনার সদয় বিবেচনা ও চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পেশ করছি।আপনি অবগত আছেন যে, কুষ্টিয়া বাংলাদেশের অন্যতম একটি ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ জেলা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহ, বাউল সম্রাট লালন শাহের মাজার এবং দেশের অন্যতম বৃহৎ গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প এই জেলাতেই অবস্থিত। এত গৌরবময় ইতিহাস এবং বিপুল জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও কুষ্টিয়া জেলাটি বর্তমানে প্রশাসনিকভাবে ‘বি’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত, যা জেলার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নে বড় অন্তরায়।মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিধিমালা অনুযায়ী, সাধারণত ৮ বা তার বেশি উপজেলা থাকলে একটি জেলা ‘এ’ ক্যাটাগরির মর্যাদা পায়। কুষ্টিয়ায় বর্তমানে মাত্র ৬টি উপজেলা রয়েছে। অথচ জেলার দৌলতপুর ও কুমারখালী উপজেলার আয়তন এবং জনসংখ্যা এতই বিশাল যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে উপজেলা সদরে এসে সরকারি সেবা নেওয়া অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।নিচে প্রস্তাবিত নতুন উপজেলা গঠনের স্বপক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হলো:
১. প্রস্তাবিত নতুন উপজেলা: প্রাগপুর (দৌলতপুর ভেঙে)
বর্তমান দৌলতপুরের বিশালত্ব:
এই উপজেলার মোট ইউনিয়ন ১৪টি এবং জনসংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষের কাছাকাছি। বিশাল আয়তনের কারণে প্রত্যন্ত সীমান্ত অঞ্চলের তদারকি করা কঠিন।
প্রস্তাবিত উপজেলার ইউনিয়নসমূহ:
প্রাগপুর, রামকৃষ্ণপুর, চিলমারী, মথুরাপুর ও আদাবাড়ীয়া (মোট ৫টি ইউনিয়ন)।
ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব:
প্রাগপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারত-সীমান্তবর্তী এলাকা। দুর্গম চরাঞ্চলের (যেমন চিলমারী, রামকৃষ্ণপুর) মানুষকে নদী পার হয়ে ২৫-৩০ কিলোমিটার দূরে বর্তমান দৌলতপুর সদরে আসতে হয়। এখানে নতুন উপজেলা হলে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার হবে এবং চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ কমবে।
২. প্রস্তাবিত নতুন উপজেলা: পান্টি (কুমারখালী ভেঙে)
বর্তমান কুমারখালীর সীমাবদ্ধতা:
কুমারখালী উপজেলায় মোট ১১টি ইউনিয়ন রয়েছে এবং এটি গড়াই নদী দ্বারা ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিকভাবে বিভক্ত।
প্রস্তাবিত উপজেলার ইউনিয়নসমূহ:
পান্টি, যদুবয়রা, বাগুলাট এবং চাঁদপুর (মোট ৪-৫টি ইউনিয়ন)।
অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ গুরুত্ব:
পান্টি কুষ্টিয়া জেলার অন্যতম বৃহত্তম এবং ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক কেন্দ্র (বিজনেস হাব)। জেলা ও উপজেলা সদর থেকে এর দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় এই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। পান্টিতে নতুন উপজেলা কমপ্লেক্স হলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণ হবে।
উপজেলা বৃদ্ধির মাধ্যমে কুষ্টিয়া জেলাকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রূপান্তরের সুফল:
১. প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি প্রশাসনিক সেবা সহজে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
২. নতুন উপজেলা গঠনের মাধ্যমে কুষ্টিয়ার উপজেলার সংখ্যা ৮টিতে উন্নীত হবে, যা জেলাটিকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রূপান্তরের আইনি শর্ত পূরণ করবে।
৩. ‘এ’ ক্যাটাগরির জেলা হিসেবে কুষ্টিয়া সরকারি বাজেট, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (ADP) এবং অবকাঠামোগত বড় বরাদ্দ পাওয়ার যোগ্য হবে।
৪. নতুন প্রশাসনিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি গতিশীল হবে।
অতএব প্রিয় মহোদয়, কুষ্টিয়াবাসীর দুর্ভোগ লাঘব এবং এই অঞ্চলের সুষম উন্নয়নের স্বার্থে জেলার উপজেলার সংখ্যা বৃদ্ধি করে কুষ্টিয়া জেলাকে ‘বি’ থেকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করার জন্য নিকার (NICAR)-এর আগামী সভায় বিষয়টি এজেন্ডাভুক্ত করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার জন্য আপনার নিকট আকুল আবেদন জানাচ্ছি।বিনীত নিবেদক,কুষ্টিয়া জেলা ও উপজেলা বাস্তবায়ন নাগরিক কমিটির পক্ষে—১. ………………………… ……………………. (নাম ও স্বাক্ষর)২. ………………………… ……………………. (নাম ও স্বাক্ষর)৩. ………………………… ……………………. (নাম ও স্বাক্ষর)(সর্বস্তরের জনগণের গণস্বাক্ষর সংযুক্ত)