👁 246 Views

গগন হরকরা:  অখণ্ড নদীয়া থেকে জাতীয় সংগীতের উৎসভূমি

                                            মাকসুদুল হক 
আজ ৯ই অক্টোবর, বিশ্ব ডাক দিবস। এই বিশেষ দিনে আমাদের ফিরে যেতে হয় উনিশ শতকের শেষলগ্নে, শিলাইদহের পদ্মাপাড়ে। যেখানে ইতিহাসের এক পরম সন্ধিক্ষণে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন দুই ভিন্ন গোলার্ধের মানুষ—একদিকে কলকাতার ধনাঢ্য পিরালী ব্রাহ্মণ পরিবারের অভিজাত ও তরুণ জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আর অন্যদিকে লালন সাঁইজির স্বহস্তে দীক্ষিত মুরিদ, নিম্নবর্ণের বোঝা কাঁধে বয়ে বেড়ানো প্রবীণ ডাকপিয়ন তথা পোস্টমাস্টার গগনচন্দ্র দাম, যিনি ইতিহাসে ‘গগন হরকরা’ নামে অমর হয়ে আছেন। শিলাইদহের পদ্মাপাড়ে তাঁদের সেই প্রথম চাক্ষুষ সাক্ষাৎ ও সুরের আদান-প্রদান কেবল দুটি মানুষের মিলন ছিল না; সেটি ছিল বাংলার লোক-দর্শনের কাছে আভিজাত্যের এক পরম আত্মসমর্পণের মনস্তাত্ত্বিক আবহ।
তিন পাগলের মেলা ও অভায় আশ্রম
“তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে / তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে।।”—বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের আধ্যাত্মিক ভাবধারার এই কালজয়ী পদটি কেবলই কোনো গান নয়; এটি আসলে অখণ্ড ভারতের নদীয়া জেলার সেই ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক অনন্য দলিল। লালনের দৃষ্টিতে সেই ‘তিন পাগল’—শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, প্রভু নিত্যানন্দ এবং অদ্বৈত্যচার্য যেভাবে জাত-পাতের ঊর্ধ্বে উঠে তৎকালীন সমাজ-সংস্কৃতিতে এক অভিনব প্রেমধর্মের জোয়ার এনেছিলেন, নদীয়া জেলার আলো-বাতাসে সেই ধারা যুগ যুগ ধরে প্রবহমান ছিল। আর অখণ্ড নদীয়ার সেই বিপুল শিল্প-সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞানীদের মূল ‘অভয় আশ্রম’ বা চারণভূমি হয়ে উঠেছিল তৎকালীন কুষ্টিয়া মহকুমা।
পদ্মার বোটে সেই ঐতিহাসিক সন্ধ্যা
তখন ১৮৮৯ বা ১৮৯০ সালের দিক। জোড়াসাঁকোর চেনা কোলাহল ছেড়ে তরুণ রবীন্দ্রনাথ এসেছেন শিলাইদহে জমিদারি দেখাশোনা করতে। কিন্তু কবির মন তখন জমিদারির খাতায় নয়, মজে আছে পদ্মার উদাস বাতাস আর চরের নির্জনতায়। একদিন শান্ত সন্ধ্যায় পদ্মার বুকে নোঙর করে আছে জমিদারের বিলাসবহুল বোট ‘পদ্মা’। বোটে মোমের আলোয় কবি একা বসে আছেন। ঠিক তখনই ঘাটের কাছাকাছি মেঠোপথ ধরে আসছিলেন শিলাইদহ ডাকঘরের পোস্টমাস্টার গগন হরকরা। কাঁধে তাঁর ডাকের শূন্য থলে, হাতে লণ্ঠন আর বল্লম। কিন্তু সেদিন গগনের পায়ে কোনো তাড়া ছিল না। পদ্মার বুকে পূর্ণিমার চাঁদের আলো আর সাঁইজির মুরিদানা প্রেমের টানে তিনি আপন মনে একতারার তারে আঙুল ছুঁয়ে গেয়ে উঠলেন তাঁর নিজের সদ্য বাঁধা পদ—
“আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে।
হারায়ে সেই মানুষে, তার উদ্দেশে দেশ-বিদেশে আমি দেশ-বিদেশে বেড়াই ঘুরে।।”
পদ্মার শান্ত জলের বুক চিরে সেই মেঠো সুর, সেই অসামান্য মরমী বাণী গিয়ে আঘাত করল জমিদারের বোটের জানালার কাচে। রবীন্দ্রনাথ তখন উপনিষদের অসীম ব্রহ্মের ধারণায় আচ্ছন্ন, কিন্তু গগনের কণ্ঠের এই গান যেন উপনিষদের সেই দূরবর্তী ঈশ্বরকে এক নিমেষে রক্ত-মাংসের মানুষের ভেতরের ‘মনের মানুষ’ হিসেবে সামনে এনে দাঁড় করাল। কবি আর স্থির থাকতে পারলেন না। বোটের ডেক থেকে নেমে এসে তিনি ঘাটে দাঁড়ালেন। ডাকলেন কসবা গ্রামের সেই তথাকথিত নিম্নবর্ণের সাধারণ রানারকে।
রবীন্দ্র-মনস্তত্ত্বে গগনের সুরের অভিঘাত
সেদিনের সেই প্রথম সাক্ষাতের মনস্তাত্ত্বিক আবহটি ছিল অদ্ভুত। রবীন্দ্রনাথ গগনের মুখে গানটি বারবার শুনলেন এবং মুগ্ধ হয়ে নিজের ডায়েরিতে তার বাণী টুকে নিলেন। কলকাতার নাগরিক আভিজাত্য যে সত্যকে খুঁজে পায়নি, কসবা গ্রামের এক ডাকপিয়ন তা কবির মনের গভীরে গেঁথে দিলেন। গগনের এই ‘মনের মানুষ’-এর ধারণাই পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথের কাব্যদর্শনে ‘জীবনদেবতা’ ও ‘মানুষের ধর্ম’ (The Religion of Man) হিসেবে পূর্ণতা পায়।
গগনের এই গানের গভীরতা কবিকে কতটা আলোড়িত করেছিল, তা পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ নিজেই লিখে গেছেন। ‘প্রবাসী’ পত্রিকার ১৩২২ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যায় যখন তাঁর আগ্রহে ‘হারামণি’ নামক লোকসংগীতের বিভাগটি চালু হয়, তখন গগন হরকরার এই গানটি দিয়েই তিনি সেই বিভাগের সূচনা করেছিলেন। গানটির প্রশংসা করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:
“কথা নিতান্ত সহজ, কিন্তু সুরের মূর্চ্ছনায় এর অর্থ অপূর্ব জ্যোতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।”
ধরণির বুকেই নয়, বিশ্বমঞ্চেও কবি গগনকে তুলে ধরেছেন পরম শ্রদ্ধায়। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত ‘An Indian Folk Religion’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক আলোচনা সভায় এই গানের স্মৃতিচারণ করে বিশ্বকবি বলেছিলেন:
“এই প্রথম বাউলগান, যা আমি মন দিয়ে শুনেছি এবং যার জন্য আমার মন আন্দোলিত হয়েছে। …এই গানটির রচয়িতার নাম ছিল গগন।”
গগনের জীবন ও রূপক নাটক ‘ডাকঘর’
গগন হরকরার নিভৃত জীবন, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং ডাক বিলির এই পেশা রবীন্দ্র-মনস্তত্ত্বকে এতটাই আচ্ছন্ন করেছিল যে, তাঁর বিখ্যাত রূপক নাটক ‘ডাকঘর’ (১৯১২) লেখার পেছনে গগনের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ছিল। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বালক অমল, যে বন্দি ঘরের জানালা দিয়ে বাইরের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকে এবং মুক্তির স্বপ্ন দেখে। সেই জানালার সামনে দিয়ে যখন রাজা বা সরকারের ডাকহরকরা হেঁটে যায়, তখন অমলও স্বপ্ন দেখে একদিন সে রাজার চিঠি বয়ে বেড়ানো এক ‘হরকরা’ বা রানার হবে।
গগন যেভাবে চিঠির বোঝা কাঁধে নিয়ে দূর-দূরান্তে ‘মনের মানুষ’-এর সন্ধানে সুর বেঁধে ঘুরে বেড়াতেন, ‘ডাকঘর’ নাটকের অমলের আকুলতাতেও ঠিক সেই আধ্যাত্মিক মুক্তির বার্তা ধ্বনিত হয়েছে। সাধারণ ডাক বিলির সমান্তরালে এক পরমেশ্বরের চিঠির জন্য অপেক্ষা করার যে রূপক রবীন্দ্রনাথ তৈরি করেছিলেন, তার প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণা ছিলেন রক্ত-মাংসের গগন হরকরা।
কসবা গ্রামে জন্ম ও সাঁইজির মুরিদানা
আনুমানিক ১৮৪০ থেকে ১৮৪৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কসবা (কসবা-গোবরাখালি) গ্রামে জন্ম নেন এই মহান লোক-সংগীতশিল্পী ও সুরকার। আধ্যাত্মিক সাধনার জগতে গগন হরকরা ছিলেন স্বয়ং বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের স্বহস্তে দীক্ষিত মুরিদ বা प्रत्यक्ष শিষ্য। সাঁইজির চরণে বসে পাওয়া জাত-পাতহীন সর্বজনীন মানবধর্মের সেই গভীর আত্মিক দীক্ষাই তিনি ঢেলে দিয়েছিলেন তাঁর একতারার সুরে। লালন শাহের সরাসরি সান্নিধ্য পাওয়ার কারণেই গগনের গানের বাণীতে মরমী দর্শনের এমন কালজয়ী বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল।
লোকমুখের ইতিহাস: পিয়ন থেকে পোস্টমাস্টার
রবীন্দ্র-গবেষণা ও প্রচলিত সাধারণ ইতিহাসে গগনকে মূলত শিলাইদহ ডাকঘরের একজন সাধারণ ‘ডাক হরকরা’ হিসেবেই দেখানো হয়। তবে কুষ্টিয়ার বিশিষ্ট কলামিস্ট ও প্রবীণ রাজনীতিক কমরেড হাফিজ সরকারের সংগৃহীত স্থানীয় ইতিহাস ও প্রবীণদের নির্ভরযোগ্য সূত্র এক নতুন তথ্যের আলো ছড়ায়। স্থানীয় এই সূত্র অনুযায়ী, গগন হরকরা তাঁর সততা, নিষ্ঠা ও যোগ্যতার কারণে একপর্যায়ে শিলাইদহের প্রধান ডাকঘরের ‘পোস্টমাস্টার’ বা প্রধান কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক তথ্যটি প্রমাণ করে যে তৎকালীন সরকারি ডাক বিভাগে তাঁর একটি সম্মানজনক সামাজিক অবস্থান ও প্রশাসনিক দক্ষতা ছিল, যা শিলাইদহের জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তাঁর যোগাযোগকে আরও সহজ ও গভীর করেছিল।
কুণ্ডুপাড়ার কাঙাল কুটিরে মেলবন্ধন
শিলাইদহ থেকে ডাকের চিঠি আর কাঁধে ঝোলা নিয়ে কুমারখালীতে আসার পথে গগন হরকরার অন্যতম প্রধান গন্তব্য ছিল কুণ্ডুপাড়ার ‘কাঙাল কুটির’—যেখানে বাস করতেন মফস্বল সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙাল হরিনাথ মজুমদার। কাঙাল হরিনাথের নিজের হাতে গড়া পূর্ব বাংলার প্রথম গ্রামীণ মুদ্রণালয় ‘এমএন প্রেস’ ছিল তৎকালীন মনীষীদের প্রধান আড্ডাস্থল। ছেঁউড়িয়া থেকে আসা ফকির লালন শাহ আর শিলাইদহ থেকে আসা গগন হরকরা এই কুণ্ডুপাড়ার প্রেস ঘরেই বসতেন। লালন সাঁইজির সাথে গগনের যে আত্মিক টান, তা এই কুণ্ডুপাড়ার মাটিতে বসেই বারবার সুরের আলাপনে মুখর হয়ে উঠত।
জাতীয় সংগীতের সুরের উৎস ও প্রয়াণ
গগনের বাউল সুরের ঋণ কবিগুরু কোনোদিন ভোলেননি। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের উত্তাল সময়ে যখন দেশাত্মবোধের জোয়ার জাগানোর প্রয়োজন হয়েছিল, তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক রাগ-সংগীতের ব্যাকরণ সরিয়ে রেখে গগন হরকরার এই “আমি কোথায় পাব তারে” গানের অবিকল সুরে বেঁধেছিলেন—”আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি”। আজ যা স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌম জাতীয় সংগীত। একজন সাধারণ ডাকপিয়ন বা পোস্টমাস্টারের সুরের চাদরে জড়িয়েই তৈরি হয়েছে একটি রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীতের মূল ভিত্তি।
লালন সাঁইজির ভাবাদর্শের এই মহান সুরকার আনুমানিক ১৯১০ সালের ১২ আগস্ট শিলাইদহের মাটিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু শিলাইদহের পদ্মাপাড়ের সেই প্রথম সাক্ষাতের দৃশ্যপট আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত শিল্প ও আধ্যাত্মিকতার কোনো জাত হয় না, কোনো বর্ণ হয় না। অখণ্ড নদীয়া আর কুষ্টিয়ার মাটি এভাবেই জন্ম দিয়েছে সুরের মিলনমেলা, যার চাদরে জড়িয়ে আজও বেঁচে আছে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত।
নিশান মোড়ের শূন্য হাত: এক রূপক আক্ষেপ
ইতিহাসের সেই সুরের গৌরব আর মরমী ডাকহরকরাদের স্মৃতি চিরস্মরণীয় করে রাখতে কুষ্টিয়া পৌরসভার উদ্যোগে একদা শহরের হাউজিং নিশান মোড়ে গড়ে তোলা হয় গগন হরকরার এক দৃষ্টিনন্দন স্মারক ভাস্কর্য। মাথায় পাগড়ি, পরনে ধুতি, এক হাতে আলো ছড়ানো হারিকেন আর অন্য হাতে ঘণ্টার বল্লম নিয়ে মানুষের সুখ-দুঃখের বার্তা ছড়াতে ছুটে চলা সেই প্রতিমূর্তি আজও মানুষকে মনে করিয়ে দেয় এক ফেলে আসা আবেগঘন যুগের কথা।
কিন্তু আজ সেই ভাস্কর্যের দিকে তাকালে এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক হাহাকার গ্রাস করে। সময়ের এক নির্মম ও দুঃখজনক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় আমাদের। রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে কিছু অজ্ঞাত দুষ্কৃতকারী ভাস্কর্যটির হাত থেকে খুলে নিয়ে গেছে পিতলের সেই সুরের আলো ছড়ানো প্রতীকী হারিকেন আর নিরাপত্তার একমাত্র ভরসা—ধাতব বল্লমটি। চুরির এই ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তা আর পুনরায় স্থাপন করা হয়নি। আজ নিশান মোড়ের সেই গগন হরকরা তাঁর হারিকেন আর বল্লমহীন শূন্য এক হাত বাড়িয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন।
যে মানুষের মেঠো সুরের আলো বিশ্বকবির মনে ‘জীবনদেবতা’র জন্ম দিয়েছিল, যাঁর সুরের চাদর জড়িয়ে জন্ম নিল একটি স্বাধীন দেশের জাতীয় সংগীত, আজ তাঁরই স্মারকের হাতের আলোটি নিভে গেছে চরম অবহেলায়। কাঙালের এমএন প্রেস কিংবা লালনের আখড়া নিয়ে কিছুটা চর্চা হলেও, কসবা গ্রামের এই নিভৃত সাধক আজ যেন নিজের শহরেই ব্রাত্য। বিশ্ব ডাক দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে, নিশান মোড়ের গগনের শূন্য হাতে পুনরায় আলোর লণ্ঠন আর সুরের বল্লম ফিরিয়ে দেওয়া কেবল একটি ভাস্কর্যের সংস্কার নয়; বরং আমাদের জাতীয় সত্তা ও শিকড়ের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের এক পরম পরীক্ষা।
________________________________________
লেখক: মাকসুদুল হক, লেখক, কলামিস্ট ও ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি, দৈনিক ডেসটিনি।
01711748986