👁 112 Views

রাজনৈতিক রূপান্তর ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জ: ক্ষমতাসীন দলের গতিপথ ও নাগরিক প্রত্যাশা:

মুহাম্মদ রাশেদ খান
একটি প্রধান রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যে কোনো রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা গভীর পরীক্ষা ও নাগরিক প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়। বিগত স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অবসানের পর দেশের ছাত্র-জনতা একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং মানবিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন বুকে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করেছিল। কিন্তু পরিবর্তনের পর বর্তমান সরকারের শাসনকালে আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নাগরিক মনে প্রশ্ন জাগছে—আমরা কি সত্যিই সেই কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি? জাতীয় জীবনের চলমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একদিকে যেমন নতুন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক শক্তির চর্চা চলছে, অন্যদিকে তেমনি কিছু পুরোনো ও নতুন সংকটের রূপরেখা জনমনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
মাঠপর্যায়ে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বাস্তব চিত্র:
অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর আগেই দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে এক ধরনের অস্থিরতা দৃশ্যমান হচ্ছে। দেশের সচেতন নাগরিকদের বড় অংশ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষমতাসীন দলের বা ক্ষমতা-সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মহলের একাংশের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও পেশীশক্তি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠছে।
এর বাস্তব প্রমাণ মেলে দেশের অর্থনৈতিক লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত পরিবহন খাতে। ঢাকাসহ দেশের প্রধান মহাসড়ক ও বাস টার্মিনালগুলোতে পুরোনো সিন্ডিকেটের জায়গায় নতুন চেহারার সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার লক্ষণ স্পষ্ট, যেখানে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা জবরদস্তিমূলক চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। একইভাবে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস পোশাক শিল্প বা গার্মেন্টস সেক্টরে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সহিংসতা কারখানার উৎপাদন ব্যাহত করছে। দেশের বিভিন্ন পৌরসভা ও কাঁচাবাজারে দোকানদারদের কাছ থেকে দৈনিক ভিত্তিতে চাঁদা তোলার পুরোনো সংস্কৃতি এখনও বহাল রয়েছে। এই ধরনের নৈরাজ্য ও মাস্তানি কেবল জনজীবনকে বিপর্যস্ত করছে না, বরং রাজনৈতিক পরিবর্তনের মূল স্পিরিটকে কালিমালিপ্ত করছে। স্বৈরাচারী সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে যদি আবার সেই পুরোনো কায়দাতেই মাঠপর্যায়ে সন্ত্রাস ও গুণ্ডামির চর্চা চলতে থাকে, তবে শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের উদ্দেশ্যই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক যোগ্যতা:
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার ছিল ‘জুলাই সনদ’ বা গণ-আন্দোলনের মূল চেতনা বাস্তবায়ন করা। এর মধ্যে ছিল আহতদের পুনর্বাসন, শহীদ পরিবারগুলোর উপযুক্ত মূল্যায়ন, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং খুনিদের বিচার নিশ্চিত করা। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে এক ধরনের ধীরগতি বা গড়িমসি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে ভুক্তভোগীদের মনে ক্ষোভ জমছে।
এর পাশাপাশি প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে অযোগ্য বা কেবল রাজনৈতিক বিবেচনায় একপেশে ব্যক্তিদের পদায়ন করা হচ্ছে বলে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। একটি ক্রান্তিকালে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে ধরনের দূরদর্শিতা, দক্ষতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার প্রয়োজন, তা অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। যোগ্যতার চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার পুরোনো ব্যাধি থেকে বর্তমান সরকার ও প্রশাসনও পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি, যা সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে বড় অন্তরায়।
অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা:
ক্ষমতার সুবাতাস পাওয়ার পর থেকেই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ক্ষমতার ভাগাভাগির লড়াই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ ও উপদলীয় কোন্দল বাড়ছে। এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কেবল দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে না, বরং সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলছে। যখনই কোনো দল রাষ্ট্র পরিচালনায় আসে, তখন জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়ে নিজেদের কোন্দল ও দখলদারিত্বের ভাগাভাগি নিয়ে ব্যস্ত থাকা কখনোই শুভ লক্ষণ নয়। এই ধরনের কোন্দল মাঠপর্যায়ে এক ধরনের প্রশাসনিক স্থবিরতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা তৈরি করছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও বিরোধী দলের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি:
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের ম্যান্ডেট বা সম্মতি এবং বিরোধী মতের প্রতি শ্রদ্ধা। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের বড় একটি অংশের দাবি থাকা সত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে গণভোটের মতো প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অস্বীকার বা এই বিষয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা না দেওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ার রোডম্যাপ তৈরিতে বিলম্ব রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এর পাশাপাশি, ক্ষমতার বলয়ে থাকা শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত ও অবস্থানকে অবজ্ঞা করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেকোনো টেকসই গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ এবং সহাবস্থান অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এক পক্ষ অপর পক্ষকে কোণঠাসা করার যে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তার পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা দেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও অস্থিতিশীলতাকে আরও উসকে দিচ্ছে।
উত্তরণের পথ ও নাগরিক ভাবনা:
বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে। এই পরিস্থিতিতে সরকারকে বুঝতে হবে, জনগণের ধৈর্য অসীম নয়। মাঠপর্যায়ের চাঁদাবাজি, মাস্তানি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে—তা সে যে স্তরের নেতাকর্মীই হোক না কেন। যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে প্রশাসন পরিচালনা করতে হবে এবং জুলাই সনদের শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কোনো একক দলের আধিপত্য নয়, বরং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং সংলাপের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে। সরকার যদি দ্রুত দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে ব্যর্থ হয় এবং জনআকাঙ্ক্ষাকে অবজ্ঞা করে, তবে এই ক্রান্তিকালীন সংকট আরও ঘনীভূত হবে। জনগণের ম্যান্ডেটকে সম্মান জানিয়ে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা কায়েম করাই হোক এই মুহূর্তের প্রধান জাতীয় অঙ্গীকার।
গণরায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের রাজনীতি:
একটি রক্তাক্ত ও নজিরবিহীন ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করেছিল রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল সংস্কার। স্বৈরাচারী সংস্কৃতির চিরতরে অবসান ঘটিয়ে একটি প্রকৃত অর্থেই বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ভিত্তি রচিত হবে। কিন্তু ২০২৬ সালের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের বর্তমান চিত্র চরম হতাশা, ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কারের মতো একটি ঐতিহাসিক ও মৌলিক প্রশ্নে জনগণের ম্যান্ডেটকে ধোঁকা দেওয়ার যে বিপজ্জনক খেলা শুরু হয়েছে, তা দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে এক অন্ধকার গহ্বরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
গণরায়ের সঙ্গে ধোঁকাবাজি ও চরম বিশ্বাসঘাতকতা:
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত সাংবিধানিক গণভোটে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ (৬৮.৫৯%) মানুষ জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংবিধানের আমূল সংস্কারের পক্ষে সুস্পষ্ট ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে রায় দিয়েছিল। এই গণভোটের মূল বার্তা ছিল স্পষ্ট—জনগণ এক ব্যক্তি বা এক দলের হাতে ক্ষমতার একক কেন্দ্রীভূত রূপ দেখতে চায় না; তারা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের সুষম ভারসাম্য দেখতে চায়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় আসার পর ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার জনগণের এই বিপুল রায়কে বাস্তবায়নে চরম গড়িমসি ও টালবাহানা করছে। আন্দোলনের অংশীজন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র সমালোচনা অনুযায়ী, ক্ষমতা কুক্ষিগত করার উদ্দেশ্যে দলটির সংসদ সদস্যরা শুরু থেকেই সংস্কার পরিষদের শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং পুরনো মুজিববাদী সংবিধানের দোহাই দিয়ে জুলাইয়ের গণ-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতার পথ বেছে নিয়েছেন। সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে সংবিধান ‘সংস্কার’ না করে নিছক ‘সংশোধন’ করার স্বার্থে রাষ্ট্রীয় বিপুল অর্থ অপচয় করে নতুন করে আরও একটি গণভোটের যে খোঁড়া যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, তা আসলে মূল গণরায়কে অস্বীকার ও নস্যাৎ করার শামিল, যাকে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ‘জনগণের সাথে তামাশা’ বলে আখ্যায়িত করেছে।
ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিং ও ক্ষমতার জবরদখল:
বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনায় আসার পেছনের প্রক্রিয়াটি নিয়েও রয়েছে তীব্র সমালোচনা। সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনকে দলীয়করণ এবং নানামুখী ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে বিএনপিকে একচেটিয়া আসন (২১২টি) পাইয়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। সচেতন মহলের মতে, নির্বাচনের দিন এক খরচে গণভোট ও সংসদ নির্বাচন সেরে ফেলার নামে মূলত জনমতের আড়ালে এক ধরনের সূক্ষ্ম কারচুপির আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। জনগণের ক্ষোভের প্রতিফলন যেখানে ভোটের বাক্সে অন্যান্য শক্তির পক্ষেও বিপুল পরিমাণে যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে ফলাফল জেনারেট করার এই ইঞ্জিনিয়ারিং প্রক্রিয়াই প্রমাণ করে যে, ক্ষমতাসীন দল শুরু থেকেই একটি অন্যায্য ও একপেশে আধিপত্য কায়েম করতে চেয়েছিল।
একটি ইতিবাচক বিরোধী দল পাওয়ার পরও ব্যর্থতার খতিয়ান:
এই ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরও বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অনন্য ও নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছিল। দেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এবং রাষ্ট্রকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে রক্ষা করতে দেশের প্রধান বিরোধী দল ও ১১ দলীয় জোট ওই ত্রুটিপূর্ণ ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফলাফল মেনে নিয়েছিল। সংসদে তারা একটি নিয়মতান্ত্রিক, ইতিবাচক এবং দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা রাখার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিল। এমন একটি ইতিবাচক, অহিংস ও জাতীয় স্বার্থে আপস করা বিরোধী দল পাওয়ার পরও বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় চরম এবং ঐতিহাসিক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছে। একটি ক্রান্তিকালে যে ধরণের দূরদর্শিতা প্রয়োজন ছিল, তার পরিবর্তে তারা পুনরায় সেই পুরোনো প্রতিহিংসা ও অব্যবস্থাপনার পথ বেছে নিয়েছে।
দেশজুড়ে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির উৎসব:
ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই সারা দেশে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি, মাস্তানি, দখলবাজি, গুণ্ডামি ও সন্ত্রাস চরম আকার ধারণ করেছে। দেশের অর্থনৈতিক লাইফলাইন পরিবহন খাত থেকে শুরু করে পোশাক শিল্প (গার্মেন্টস সেক্টর)-এর ঝুট ব্যবসা, কাঁচাবাজার ও পৌরসভাগুলোতে পুরোনো স্বৈরাচারী সিন্ডিকেটের জায়গায় বিএনপির নেতাকর্মীদের নতুন সিন্ডিকেট কায়েম হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
অযোগ্যদের দ্বারা সরকার পরিচালনা ও প্রাতিষ্ঠানিক ধস:
প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় খাতগুলোতে মেধা ও যোগ্যতার তোয়াক্কা না করে কেবল রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে অযোগ্য, অদক্ষ ও একপেশে ব্যক্তিদের পদায়ন করা হচ্ছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে এবং মাঠপর্যায়ে চরম প্রশাসনিক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নৈরাজ্য:
ক্ষমতার ভাগাভাগি, ঝুট ব্যবসা ও হাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারি দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এখন নিত্যদিনের ঘটনা। নিজেদের কোন্দল সামাল দিতে গিয়ে সরকার সাধারণ জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসি ও বিরোধী দলকে অবজ্ঞা:
অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহতদের পুনর্বাসনের মূল ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে সরকারের অবহেলা ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, দেশের জাতীয় স্বার্থের প্রধান অংশীজন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর যৌক্তিক মতামত ও অবস্থানকে চরম অবজ্ঞা ও কোণঠাসা করার যে পুরোনো ফ্যাসিবাদের সংস্কৃতি, সরকার তা নতুনভাবে চর্চা করছে।
উপসংহার:
ইতিহাস সাক্ষী, জনগণের রায়কে অস্বীকার করে এবং ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে মাঠপর্যায়ে সন্ত্রাস ও জবরদখল কায়েম রাখলে কোনো সরকারই টিকে থাকতে পারে না। দেশের মানুষ রক্ত দিয়ে যে পরিবর্তন এনেছিল, তা কোনো নির্দিষ্ট দলের লুটপাট ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য ছিল না। বিএনপি সরকারকে বুঝতে হবে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বিরোধী দল যে নমনীয়তা দেখিয়েছে, তাকে যেন সরকারের দুর্বলতা না ভাবা হয়। অবিলম্বে গণভোটের ৭০% রায়কে শ্রদ্ধা জানিয়ে জুলাই সনদের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ সংবিধান সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। মাঠপর্যায়ের চাঁদাবাজি ও দলীয় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিলে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় যোগ্যতার মূল্যায়ন না করলে, এই সরকারকেও ছাত্র-জনতার তীব্র প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হবে, যার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।
সর্বোপরি, জনগণের মূল আকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটিয়ে তড়িঘড়ি করে নিজেদের মতো করে একটি সংবিধান সংশোধন বিল পাস করে আগামী জানুয়ারি ২০২৭-এ আরও একটি নতুন গণভোটের নামে যে প্রহসন ও নীল নকশার পাঁয়তারা বিএনপি করছে, তা শাসকদলের জন্য বুমেরাং হতে বাধ্য। সচেতন ছাত্র-জনতা ও দেশের জনগণ একবার ৭০ শতাংশ ভোটে যে রায় দিয়ে দিয়েছে, তাকে ধামাচাপা দিতে নতুন কোনো সাজানো ব্যালটের নাটক দেশের মানুষ মেনে নেবে না। এই গণবিরোধী অবস্থান বজায় রাখলে ২০২৭ সালের জানুয়ারির সেই কথিত গণভোটই বর্তমান সরকারের পতনের চূড়ান্ত কাউন্টডাউন বা কফিনের শেষ পেরেক হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।
লেখক: কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সহযোগী সম্পাদক, মাসিক ইতিহাস অন্বেষা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *