👁 449 Views

উনিশ শতকের তিন বাতিঘর    

উনিশ শতকের বাংলার সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কুষ্টিয়ার কুমারখালী ও ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু অঞ্চলটি ছিল এক অনন্য জ্ঞানপীঠ। এ বাংলায়, বিশেষত কুষ্টিয়া অঞ্চলের হতদরিদ্র কৃষককুলের ওপর ইংরেজ ও এ দেশীয় অত্যাচারী জমিদারদের অত্যাচারের খড়্গ যখন নেমে এসেছিল, সেই দুঃসময়ে আমৃত্যু প্রতিবাদী সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার মানবিক তাড়নায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কৃষকদের পাশে। মফস্‌সল সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ও পূর্ব বাংলার প্রথম পত্রিকা ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র জনক হিতকরী পত্রিকার সম্পাদক আজ প্রায় পৌনে ২০০ বছর পরও মানুষের মনে জাগ্রত হয়ে আছেন।

একদিকে কাঙাল হরিনাথের আপসহীন গ্রামীণ সাংবাদিকতা, অন্যদিকে মহাত্মা লালন শাহের জাতহীন মরমিয়া সুর এবং মীর মশাররফ হোসেনের ক্ষুরধার সাহিত্যিক লেখনী—এই তিন বাতিঘরের মেলবন্ধন তৎকালীন ঔপনিবেশিক শোষণ ও জমিদারতান্ত্রিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। বাহ্যিক দৃষ্টিতে তিনজনের পথ আলাদা মনে হলেও, অন্তরের অন্দরমহলে তাঁদের সম্পর্কটি ছিল এক আত্মিক ও ঐতিহাসিক সখ্যের পরম দলিল। তবে ইতিহাসের পাতায় এই তিন মনীষী আজ যে গৌরবের আসনে ভূষিত, তাঁদের ব্যক্তিজীবনের উপাখ্যান ছিল চরম কষ্ট, ক্লেশ আর নির্মম অগ্নিপরীক্ষায় জর্জরিত। দুঃখের অতল সাগর পাড়ি দিয়েই তাঁরা একেকজন বাতিঘর হয়ে উঠেছিলেন।

১৮৩৩ সালে জন্ম নেওয়া কাঙাল হরিনাথ ছিলেন লালনের চেয়ে বয়সে ছোট। অত্যন্ত শিশুবয়সেই মা-বাবাকে হারিয়ে সম্পূর্ণ এতিম হওয়া হরিনাথের শৈশব কেটেছে অনাহারে-অর্ধাহারে। ক্ষুধা মেটাতে অনেক সময় মানুষের বাড়ি থেকে চেয়ে আনা “পান্তা ভাত, জামিরের (লেবু) পাতা আর লবণ” খেয়ে তাঁকে বেঁচে থাকতে হয়েছে। দারিদ্র্যের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও সহপাঠীদের বই আর ব্রাহ্মসমাজের ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকা পড়ে নিজে নিজে চেতনার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। জীবিকার তাগিদে দৈনিক মাত্র দু-পয়সা মাইনেতে কাপড়ের দোকানে শিশুশ্রমিকের কাজও করতে হয়েছে তাঁকে। ঠিক একইভাবে মহাত্মা লালন শাহের জীবনও ছিল এক চরম ট্র্যাজেডি। তীর্থভ্রমণে গিয়ে গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে যখন তিনি  মৃতপ্রায়, তখন তাঁকে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে মুসলমান পরিবারে আশ্রয় পাওয়ায় তৎকালীন হিন্দু সমাজ তাঁকে আর গ্রহণ করেনি। সমাজচ্যুত, কুলহীন ও জাতহীন হওয়ার সেই তীব্র মনঃকষ্ট ও একাকীত্বকেই লালন রূপান্তর করেছিলেন তাঁর জাত-পাতহীন পরম মরমিয়া দর্শনে। অন্যদিকে সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নিলেও ‘বিষাদসিন্ধু’র রচেরিতা মীর মশাররফ হোসেনের জীবনের শেষভাগ কেটেছে তীব্র পারিবারিক অশান্তি, মামলা-মোকদ্দমা আর চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে।

ক্লেশ জড়ানো জীবনের এই অভিন্ন সুর এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই লালন ও কাঙালকে পরস্পরের ঘনিষ্ঠ করেছিল। লালন মাঝেমধ্যে কুমারখালীতে কাঙাল-কুটিরে আসতেন, আর কাঙালও দলবল নিয়ে যেতেন ছেঁউড়িয়ায়। শিষ্যদের দল বেঁধে আসতে দেখে লালন তখন গ্রামীণ বাৎসল্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠতেন—“ওরে আমার পুনা (পোনা) মাছের ঝাঁক এসেছে।” এই লড়াইয়ে হরিনাথ একা ছিলেন না; জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনী যখনই হরিনাথকে আক্রমণ করতে উদ্যত হতো, মহাত্মা লালন শাহ তাঁর শিষ্যদের নিয়ে তাঁর সুরক্ষায় ঢাল হয়ে দাঁড়াতেন। এই ঐতিহাসিক বলয়ের সখ্যের প্রমাণ ছড়িয়ে ছিল শিলাইদহের পদ্মাবক্ষেও। প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক সুধীর চক্রবর্তী তাঁর ‘লালন’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ১৮৮৯ সালের ৫ই মে শিলাইদহের বোটে দামি চেয়ারে বসিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নতুনদাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর লালন শাহের যে ঐতিহাসিক রেখাচিত্র বা স্কেচ এঁকেছিলেন, তা-ই আজ লালনের একমাত্র প্রামাণ্য অবয়ব। যেখানে দেখা যায় বয়সের ভারে ঝুঁকে পড়া  লাঠিহাতে এক লালনকে। অথচ এই আসল ছবিটির কথা দীর্ঘদিন কেউ জানতে না পারায়, ১৯১৬ সালে নন্দলাল বসুর আঁকা একটি কাল্পনিক প্রতিকৃতিই দীর্ঘদিন ধরে লালন শাহের চেহারা হিসেবে সব বইয়ে ছাপা হয়ে আসছিল। লালনের এই মরমিয়া দর্শন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও এতটাই মজিয়েছিল যে, তিনি লালনের ‘অচিন পাখি’ গানের অন্তর্নিহিত ভাবকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন এবং ১৯২৫ সালে ভারতীয় দর্শন মহাসভায় প্রদত্ত তাঁর ‘The Philosophy of Our People’ শীর্ষক ঐতিহাসিক অভিভাষণে তা উদ্ধৃত করে এক আধ্যাত্মিকতার পরম ছোঁয়া বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

কুমারখালীতে কাঙাল হরিনাথের নিজের হাতে গড়া পূর্ব বাংলার প্রথম মুদ্রণালয় ‘এমএন প্রেস’ ছিল এই মনীষীদের মূল মিলনমেলা। কুমারখালীতে ব্রাহ্মধর্ম প্রচার করতে আসা পণ্ডিত দয়াল শিরোমণির কাছে ব্যাকরণ শেখা হরিনাথ পরবর্তীতে শৈশবে মারা যাওয়া এক প্রিয় বন্ধুর নামে এই প্রেসের নামকরণ করেছিলেন। রাজশাহীর রানী স্বর্ণকুমারীর অর্থ আনুকূল্যে নিলামে ৳৬০০ টাকায় কেনা লন্ডনের ‘ক্লাইম্যান ডিক্সন কোং’ (মডেল ১৭০৬) এর এই প্রেসের ঘরেই লালন শাহ ও মীর মশাররফ হোসেন একসাথে বসতেন। এই প্রেস থেকেই মীর মশাররফের অমর সৃষ্টি ‘বিষাদসিন্ধু’ এবং কাঙাল হরিনাথের নিজের ‘বিজয় বসন্ত’সহ ১৮টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি ফকির লালন শাহর প্রায় ২১টি লালনগীতি বই আকারে প্রথম এই এমএন প্রেস থেকেই আলো দেখেছিল।

লালন শাহের গুরু, হরিণাকুণ্ডুর হরিশপুর গ্রামের পরম দরবেশ সিরাজ সাঁইয়ের জাত-পাতহীন সর্বজনীন মানবধর্মের যে মূল বাণী—”মানুষে মানুষে কোনো ভেদ নেই”—তা হরিনাথ ও মশাররফ উভয়ের চেতনাকেই ভীষণভাবে তাড়িত করেছিল। মাঠপর্যায়ের দীর্ঘ অনুসন্ধান এবং সমকালীন বিভিন্ন তথ্যচিত্র অনুযায়ী, ১৭০৫ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেওয়া পেশায় পালকি বাহক ও অন্তরাল-নিবাসী মহান সাধক সিরাজ সাঁই-ই ছিলেন লালন-মানস গঠনের মূল আঁতুড়ঘর। ১৯১০ সালে প্রকাশিত গবেষক বসন্তকুমার পালের ঐতিহাসিক “মহাত্মা লালন ফকির” গ্রন্থে লালনের শিষ্যদের বরাতে সিরাজ সাঁইয়ের দীক্ষাগুরু হওয়ার যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা-ই পরবর্তীতে লালন-মানসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। যৌবনের শুরুতে মুমূর্ষু লালনকে বাঁচিয়ে তুলে তিনি যে অসাম্প্রদায়িক বিশ্বদর্শনের বীজ বুনে দিয়েছিলেন, তা-ই পরবর্তীতে কাঙাল হরিনাথ ও মীর মশাররফকেও তাড়িত করে। যার ফলেই ১৮৯০ সালে লালন শাহের তিরোধানের মাত্র পনেরো দিন পর, ৩১শে অক্টোবর মীর মশাররফ হোসেনের সম্পাদনায় প্রকাশিত ঐতিহাসিক ‘হিতকরী’ পত্রিকায় লালনকে নিয়ে প্রথম প্রামাণ্য জীবনীমূলক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে মশাররফ হোসেন লিখেছিলেন—‘লালন ফকীরের নাম এ অঞ্চলে কাহারও শুনিতে বাকী নাই… ইহাকে আমরা স্বচক্ষে দেখিয়াছি; আলাপ করিয়া বড়ই প্রীত হইয়াছি।’ লালন ও মশাররফের এই প্রত্যক্ষ চাক্ষুষ আলাপ ও সখ্যের প্রামাণ্য ইতিহাস এবং লালন যে দর্শনকে একতারার সুরে আখড়ায় বেঁধে রেখেছিলেন, কাঙাল হরিনাথ ও মীর মশাররফ হোসেন তাঁদের সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের মাধ্যমে তাকে সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

তবে ইতিহাসের এই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের বর্তমান বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মন বিষণ্নতায় ভরে ওঠে। সম্প্রতি কুমারখালীতে সরকার নির্মিত অত্যাধুনিক ও নান্দনিক ‘কাঙাল হরিনাথ জাদুঘর’ দেখতে গিয়েছিলাম। ২০১৭ সালে চালু হওয়া এই আধুনিক ভবনে সুবিন্যস্ত হস্তলিপি, সরঞ্জাম ও ব্লকের সম্ভার দেখে মন ভরে উঠলেও, এক চরম সত্য জানার পর তা বিষাদে রূপ নেয়। জাদুঘরে টিকিট কেটে দর্শনার্থীরা যে মুদ্রণযন্ত্র ও ধাতব অক্ষরের বাক্সটি দেখেন, সেটি আসলে কাঙালের ব্যবহৃত মূল যন্ত্র নয়—তা কেবলই একটি সদৃশ মডেলমাত্র!

প্রসঙ্গত লালনের সরাসরি ভাব শিষ্য গগন হরকরা বিশ্ব কবির শিলাইদহ পোষ্ট অফিসের প্রধান রানার বা হরকরা যিনি গানের সুরে সুরে চিঠি বিলি করতেন , তার ইতিহাস চাপা পড়ে গেছে শিলাইদহের মাটিতেই।

আসল ইতিহাস ও ঐতিহ্য আজো পড়ে আছে জাদুঘর থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে কুণ্ডুপাড়ার জরাজীর্ণ, ধ্বংসপ্রায় কাঙাল কুটিরে। সেখানে কাঙাল হরিনাথের চতুর্থ পর্যায়ক্রমের বংশধর শ্রী অশোক মজুমদারের স্ত্রী ষাটোর্ধ্ব গীতারানী মজুমদারের চাবির টানে যখন এমএন প্রেসের স্যাঁতসেঁতে, গুমোট ঘরটি খোলে, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক করুণ দৃশ্য। মেঝেটি অমসৃণ, ওপরের টিনের চালা ফুটো হয়ে ভেঙে পড়ার দশা। অথচ এই ভাঙা ঘরের কোণেই অবহেলায় পড়ে আছে কাঙাল হরিনাথ, লালন শাহ আর মীর মশাররফের স্মৃতিধন্য সেই আসল ঐতিহ্যের মূল ছাপাখানা ও অক্ষরের বাক্স। বংশধরদের কর্মসংস্থান, আবাসন ও সামান্য কিছু দাবিদাওয়া সরকার আমলে না নেওয়ায় এই অমূল্য জাতীয় সম্পদ আজো অরক্ষিত ও ধ্বংসের মুখে।

আজকের বৈষয়িক ও কর্পোরেট সাংবাদিকতার যুগে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের এই তিন বাতিঘরের অবিনাশী সখ্য এবং বর্তমানের এই অদ্ভুত বৈপরীত্য আমাদের এক পরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সুধীর চক্রবর্তী তাঁর গ্রন্থে আক্ষেপ করেছিলেন যে, আমাদের প্রথাগত ইতিহাস বা সংবাদমাধ্যম বরাবরই এই লৌকিক সাধকদের ব্রাত্য করে রেখেছে। অথচ লালন তাঁর গানে ‘পেঁচোপেঁচি’ বা ‘আলীক কুহকের’ মতো গ্রামীণ অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আজীবন গেয়েছেন—‘মানুষ হয়ে মানুষ চেনো / মানুষ হয়ে মানুষ মানো’। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও সাহিত্য কেবল শুষ্ক তথ্যের আদান-প্রদান নয়, তার পেছনে যদি লালন-সিরাজ সাঁইয়ের এই আধ্যাত্মিক সততা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সুফিবাদের অহিংস দর্শন না থাকে, তবে তা সমাজকে প্রকৃত আলো দিতে পারে না। সামান্য দূরত্বের ব্যবধানে নান্দনিক ভবনে নকলের প্রদর্শনী আর ভাঙা ঘরে আসলের অবলুপ্তি—আমাদের জাতীয় উদাসীনতারই এক চরম দলিল। হরিশপুরের ধুলোবালি থেকে কুমারখালীর কাঙাল প্রেস—ইতিহাসের এই তিন বাতিঘরের আসল আলোটুকু বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আজ আমাদের সবার।

মাকসুদুল হক . কলামিস্ট ও সাংবাদিক, হরিণাকুণ্ডু, ঝিনাইদহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *