👁 322 Views

বাঁশখালীতে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি, লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ  চট্টগ্রামের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, বেড়িবাঁধ ভাঙনের শঙ্কা, উদ্ধার-ত্রাণ জোরদারের দাবি।
টানাফঁ পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও সমুদ্রের জোয়ারে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধের সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন দুর্গতরা।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকাল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত ১১টার দিকে বৈলছড়ি এলাকায় চট্টগ্রাম-বাঁশখালী প্রধান সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়কও প্লাবিত হওয়ায় বহু এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা জানান, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যে পাঁচ শতাধিক মাটির বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাঁশ, মাটি ও টিন দিয়ে নির্মিত অসংখ্য ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছে। অনেক পরিবার গৃহহীন হয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে রয়েছেন।
পানিবন্দি এলাকায় রান্না করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ টিউবওয়েল ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। টানা বৃষ্টির কারণে অনেক এলাকায় দুই থেকে তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় মোবাইল যোগাযোগও ব্যাহত হচ্ছে।
উপকূলীয় বাহারছড়া-খানখানাবাদ অংশের বেড়িবাঁধে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, জোয়ারের প্রবল ঢেউয়ে যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি লোকালয়ে প্রবেশ করতে পারে। এছাড়াও গভীর নিম্মচাপের প্রভাবে সাগরে পানি বিপদসীমায় থাকায় জোয়ারের সময় বেড়িবাঁধের ছনুয়া, শেখেরখীল, বড়ঘোনা, গন্ডামারা, সরল, খানখানাবাদ, প্রেমাশিয়া দিয়ে বেড়িবাঁধ গড়িয়ে সাগরের লবনাক্ত পানি লোকালয়ে ঢুকে জনপদ ও লোকালয় প্লাবিত করছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে বিগত সময়ে কখনো সমগ্র বাঁশখালী জুড়ে এত ভয়াবহ বন্যা কেউ কখনো দেখেনি। এবারের বন্যায় বাঁশখালী পৌরসভা সহ ১৫ টি ইউনিয়নের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা কমবেশি প্লাবিত হয়েছে এবং সাগরের পানি বৃদ্ধি ও টানা বৃষ্ঠিতে পাহাড়ী ঢল অব্যাহত থাকায় টানা জলাবদ্ধতার সংকটে পড়েছে লক্ষ লক্ষ বাঁশখালীবাসী। সচেতন মহলের মতে ছনুয়া, শেখেরখীল, পুঁইছড়ী, গন্ডামারা, সরল, খানখানাবাদ, প্রেমাশিয়া, রায়ছটা, বৈলছড়ী, শিল্কুপ, পৌরসভার ৮০ শতাংশ গ্রামীন জনপদের রাস্তা-ঘাঁট পানির নিচে তলিয়ে আছে।বাড়ির উঠোন প্লাবিত হয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে বন্যার পানি। শতাব্দীর ইতিহাসে এবারই প্রথম বাঁশখালীর প্রধান সড়কের উপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
বন্যা পরিস্থিতির অবনতির পর উপজেলা প্রশাসন নিম্নাঞ্চল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মসজিদের মাইক ব্যবহার করে সতর্কতা প্রচার এবং পানিবন্দি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শেখেরখীল ইউনিয়নের বাসিন্দা মুজিবুল হক বলেন, কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও সমুদ্রের জোয়ারে ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা তলিয়ে গেছে। বহু মাটির ঘর ধসে পড়েছে এবং মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে।
পশ্চিম বড়ঘোনার এহতেশামুল হক হামীম বলেন, বাঁশখালীবাসী উপকুলীয় এলাকায় এমন জলাবদ্ধতা আগে কখনো দেখেনি, পাড়ার গ্রামের সকল চলাচলের রাস্তা হাঁটু ও কোমর পানিতে তলিয়ে আছে ৩/৪ দিন ধরে। বিদ্যুৎ নেই, খাবার পানি নেই, বাজারে পণ্য নেই, কোথাও যাতায়াত ও যোগাযোগের সুযোগ নেই। এ পরিস্থিতির কখন উত্তোরন ঘটবে তারও নিশ্চয়তা নেই।
গণ্ডামারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারী আরিফ উল্লাহ বলেন, কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বাঁশখালীর মানুষের দুর্ভোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তিনি অনতিবিলম্বে বাঁশখালীকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বন্যা দুর্গত এলাকা ঘোষনা করে পর্যাপ্ত ত্রান সামগ্রী পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, উদ্ধারকারী দল বৈলছড়ি এলাকা থেকে একটি পরিবারের সাত সদস্যকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে। দুর্গত এলাকায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, সরকারের ত্রাণসামগ্রী পাওয়া মাত্র দ্রুত দুর্গতদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ ও বন্যাকবলিত এলাকার পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এদিকে এলাকার সংসদ সদস্য এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদের অধিবেশনে থাকায় তিনি সরাসরি এলাকায় যেতে না পারলেও সার্বক্ষণিক পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখছেন। তিনি জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও বিত্তবানদের দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে খাল-ছড়া খনন, স্লুইস গেট সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় স্থানে নতুন স্লুইস গেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
দুর্গত এলাকার বাসিন্দাদের দাবি, দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম আরও জোরদার, পর্যাপ্ত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, শিশু খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ মোকাবিলায় বাঁশখালীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনের স্থায়ী পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *