
লেখক *মুহাম্মদ রাশেদ খান*
সান মারিনো দক্ষিণ ইউরোপের ইতালির মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত একটি স্বাধীন ও সম্পূর্ণ ভূবেষ্টিত রাষ্ট্র। এটি চারদিক থেকেই ইতালি দ্বারা বেষ্টিত এবং আয়তনের দিক থেকে পৃথিবীর পঞ্চম ক্ষুদ্রতম দেশ। এর অবস্থান এপেনাইন পর্বতমালার উত্তর-পূর্ব ঢালে।z
সান মারিনো সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু তথ্য:
অবস্থান:
এটি ইতালির এমিলিয়া-রোমানিয়া এবং মার্চে অঞ্চলের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত।
আয়তন:
মাত্র ৬১.১৯ বর্গকিলোমিটার।
ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য:
এর ভূখণ্ডটি মূলত পাহাড়ি এবং এর সর্বোচ্চ বিন্দু হলো টাইটানো পর্বত (Mount Titano)।
২০২৬ সালের জুনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সান মারিনোর মোট জনসংখ্যা আনুমানিক ৩৩,৬০৫ জন। তবে দেশটির নিজস্ব সরকারি পরিসংখ্যান (ডিসেম্বর ২০২৫ এর হিসাব) অনুযায়ী এই সংখ্যাটি প্রায় ৩৪,১৭২ জন। জনসংখ্যার দিক থেকে এটি বিশ্বের অন্যতম ক্ষুদ্রতম দেশ। সান মারিনোর জনসংখ্যা সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
বৈশ্বিক অবস্থান: জনসংখ্যার দিক থেকে এটি বিশ্বের ২৩৭টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ২২১তম অবস্থানে রয়েছে।
জনসংখ্যার ঘনত্ব:
প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৫৬০ জন মানুষ বসবাস করেন।
প্রধান শহর ও জনবসতি:
দেশটির সবচেয়ে বড় শহর হলো সেরাভালে (Serravalle), যেখানে প্রায় ১১,৩০৫ জন মানুষ থাকেন।
অন্যদিকে এর রাজধানী ‘সান মারিনো সিটি’-র জনসংখ্যা প্রায় ৪,১৮০ জন।
বিদেশি অধিবাসী: মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪,৮০০ জনই বিদেশি নাগরিক, যাদের বড় অংশই ইতালি থেকে এসে এখানে স্থায়ী হয়েছেন।
গড় বয়স: দেশের নাগরিকদের গড় বয়স প্রায় ৪৯.১ বছর, যা নির্দেশ করে এখানকার জনসংখ্যার একটি বড় অংশই প্রবীণ।
সান মারিনোর কৃষ্টি ও সংস্কৃতি:
সান মারিনোর কৃষ্টি ও সংস্কৃতি মূলত ইতালীয় ঐতিহ্যের সাথে গভীরভাবে জড়িত, তবে ৩০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ধরে রাখা নিজস্ব স্বাধীনতা এবং অনন্য ইতিহাস একে এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। সান মারিনো বিশ্বের প্রাচীনতম প্রজাতন্ত্র হিসেবে তাদের প্রাচীন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যকে অত্যন্ত গর্বের সাথে লালন করে।সান মারিনোর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির প্রধান দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
ঐতিহাসিক ও সামাজিক ঐতিহ্যলবার্টি বা স্বাধীনতা:
সান মারিনোর সংস্কৃতির মূল ভিত্তিই হলো তাদের স্বাধীনতা (“Libertas”)। সেন্ট মারিনাস নামের এক খ্রিষ্টান পাথরকাটার এই দেশের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
উৎসব ও জাতীয় দিবস:
প্রতি বছর ৩ সেপ্টেম্বর দেশটির জাতীয় দিবস ধুমধাম করে পালিত হয়। এই দিনে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে কুচকাওয়াজ, তলোয়ার যুদ্ধ এবং প্রাচীন ক্রসবো (এক ধরনের ধনুক) প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
স্থাপত্য ও শিল্পকলাইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য:
সান মারিনোর ঐতিহাসিক কেন্দ্র এবং মাউন্ট টিটানো ২০০৮ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায়।
তিনটি দুর্গ (The Three Towers):
গুয়াইতা, সেস্তা এবং মন্তালে নামের তিনটি প্রাচীন দুর্গ দেশটির সার্বভৌমত্বের প্রতীক এবং তাদের স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম সেরা নিদর্শন।
উৎসব ও লোকসংস্কৃতিমধ্যযুগীয় উৎসব (Medieval Days): প্রতি বছর জুলাই মাসে পুরো দেশ মধ্যযুগীয় রূপ ধারণ করে। স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকেরা মধ্যযুগীয় পোশাক পরে, প্রাচীন গান, নাচ এবং কারুশিল্পের প্রদর্শনী করে।
ক্রসবো কর্পস (Crossbow Corps):
১২৯৫ সাল থেকে চলে আসা ক্রসবো কর্পস এখনো সক্রিয়। তারা ঐতিহ্যবাহী পোশাকে বিভিন্ন উৎসবে অংশ নিয়ে প্রাচীন সামরিক সংস্কৃতির প্রদর্শন করে।
খাদ্য ও পানীয় (Gastronomy)
টিটানো কেক (Torta Tre Monti):
এটি সান মারিনোর সবচেয়ে বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী খাবার। এটি মূলত চকোলেট এবং হ্যাজেলনাট দিয়ে তৈরি একটি সুস্বাদু ওয়েফার কেক, যা মাউন্ট টিটানোর তিনটি পাহাড়ের প্রতীক।
ওয়াইন ও পনির:
ইতালির এমিলিয়া-রোমানিয়া অঞ্চলের মতো এখানেও উচ্চমানের পনির ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ওয়াইন (যেমন- ব্রুগনেটো এবং বিয়াঙ্কালে) সংস্কৃতির অংশ।
সান মারিনোর সামরিক শক্তি:
সান মারিনোর কোনো স্থায়ী বা প্রথাগত সেনাবাহিনী নেই এবং যেকোনো ধরনের বহিরাগত আগ্রাসন থেকে দেশটিকে রক্ষা করার মূল দায়িত্ব দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে ইতালির সশস্ত্র বাহিনীর ওপর ন্যস্ত. দেশটির নিজস্ব একটি ক্ষুদ্র প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো রয়েছে, যা “সামারিনিজ সশস্ত্র বাহিনী” (Forze Armate Sammarinesi) নামে পরিচিত. এটি মূলত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সীমান্ত পাহারা এবং রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা বজায় রাখার কাজ করে.সান মারিনোর সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. প্রধান সামরিক শাখা ও ইউনিটদেশটিতে কোনো নৌবাহিনী বা বিমানবাহিনী নেই. তাদের সামরিক কাঠামো মূলত অল্প কিছু পেশাদার সদস্য এবং স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে গঠিত কয়েকটি কর্পসের সমন্বয়ে তৈরি:
জেন্ডারমেরি (Corpo della Gendarmeria):
এটি সান মারিনোর প্রধান পেশাদার নিরাপত্তা বাহিনী, যার সামরিক মর্যাদা রয়েছে. প্রায় ৯০ থেকে ১০০ জন সক্রিয় সদস্যের এই বাহিনী অপরাধ তদন্ত, মাদক বিরোধী অভিযান এবং জনশৃঙ্খলা বজায় রাখে.
গার্ড অফ দ্য রক বা ফোর্ট্রেস গার্ড (Guardia di Rocca):
এই ইউনিটের মূল কাজ সীমান্ত এলাকা পাহারা দেওয়া এবং সরকারি ভবন (যেমন- পাবলিক প্যালেস) রক্ষা করা. এর একটি বিশেষ “আর্টিলারি ইউনিট” রয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তোপধ্বনি করার মতো আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করে.
গার্ড অফ দ্য কাউন্সিল:
এটি মূলত দেশটির শাসনপ্রধান (ক্যাপ্টেনস রিজেন্ট) এবং মহামান্য কাউন্সিলের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একটি ঐতিহ্যবাহী স্বেচ্ছাসেবক দল.
ইউনিফর্মড মিলিশিয়া:
উৎসব ও জাতীয় দিবসে কুচকাওয়াজ এবং বেসামরিক পুলিশকে জরুরি প্রয়োজনে সহায়তা করার জন্য এই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীটি কাজ করে.
১. জনবল ও নিয়োগ প্রক্রিয়াস্বেচ্ছাসেবী ব্যবস্থা:
সান মারিনোতে কোনো বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা (Conscription) নেই. নাগরিকেরা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এই বাহিনীগুলোতে যোগ দেন.
জরুরি আইন:
দেশটির সংবিধানে নিয়ম রয়েছে যে, চরম জাতীয় সংকটে বা বহিরাগত আক্রমণের শিকার হলে ১৬ থেকে ৫৫ বছর বয়সী যেকোনো নাগরিককে দেশের সুরক্ষায় ডেকে পাঠানো হতে পারে.
১. বৈশ্বিক অবস্থান ও সামরিক বাজেটগ্লোবাল র্যাংকিং:
গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার বা সামরিক শক্তির আন্তর্জাতিক সূচকে সান মারিনো ১৯৯তম (তলানিতে) অবস্থানে রয়েছে, কারণ তাদের কোনো যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, বা ভারী যুদ্ধাস্ত্র নেই.
প্রতিরক্ষা নীতি:
সান মারিনো একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত. তারা সামরিক শক্তির চেয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখাকেই অগ্রাধিকার দেয়
সান মারিনোর অর্থনৈতিক অবস্থা:
সান মারিনোর অর্থনীতি একটি অত্যন্ত উন্নত, স্থিতিশীল এবং উচ্চ-আয়ের মুক্ত-বাজার অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এটি মাথাপিছু জিডিপির (GDP per capita) দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ। কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ না থাকা সত্ত্বেও সুদীর্ঘ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং চমৎকার কূটনৈতিক কৌশলের কারণে দেশটি এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে।
১. মূল অর্থনৈতিক সূচকসমূহ (২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য)
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর ২০২৬ সালের জুন মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশটির বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিচে দেওয়া হলো:
মোট জিডিপি (Nominal GDP): প্রায় ২.৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
মাথাপিছু জিডিপি (GDP per capita):
প্রায় ৭০,১৮৭ মার্কিন ডলার (ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা PPP অনুযায়ী এটি প্রায় ৮৭,১৪১ ডলার)।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (GDP Growth):
২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধি ১.৫% হলেও ২০২৬ সালে তা কিছুটা কমে ১.৩% হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি (Inflation Rate):
বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ২.৮%।
বেকারত্বের হার:
এপ্রিল ২০, ২০২৬ -এর হিসাব অনুযায়ী বেকারত্ব মাত্র ৪.৫%, যা ইউরোপের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন।
ন্যূনতম মজুরি:
২০২৬ সালের নিয়ম অনুযায়ী এখানে সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১,৬০০ ইউরো (প্রায় ১,৮৭২ ডলার)।
১. প্রধান অর্থনৈতিক খাতসমূহ:
সান মারিনোর অর্থনীতি মূলত সেবা খাত, শিল্প উৎপাদন এবং পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল।
পর্যটন শিল্প (Tourism):
দেশের জিডিপির একটি বড় অংশ আসে পর্যটন থেকে। প্রতি বছর এখানে ৩০ লক্ষাধিক পর্যটক ঘুরতে আসেন।
উৎপাদন ও শিল্প খাত (Manufacturing):
সিরামিক, ইলেকট্রনিক্স, ওষুধ (Pharmaceuticals), পোশাক, ওয়াইন এবং আসবাবপত্র তৈরি ও রপ্তানি দেশটির আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস।
ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা:
সান মারিনোর কর ব্যবস্থা তুলনামূলক শিথিল এবং ব্যাংকিং আইন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে।
ডাকটিকিট ও মুদ্রা বিক্রি:
সংগ্রাহকদের কাছে বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট (Postage Stamps) এবং কয়েন বিক্রি করে দেশটি ভালো আয় করে।
১. বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকিবিশাল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও ক্ষুদ্র রাষ্ট্র (Microstate) হওয়ার কারণে সান মারিনোকে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে:
ইতালির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা:
সান মারিনোর রপ্তানি বাজারের প্রায় ৮০% থেকে ৯০% ইতালির ওপর নির্ভরশীল। ফলে ইতালির অর্থনৈতিক মন্দা বা আঞ্চলিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব সরাসরি সান মারিনোর ওপর পড়ে।
জনসংখ্যার বার্ধক্য (Aging Population):
দেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া দীর্ঘমেয়াদী পেনশনের ক্ষেত্রে চাপ তৈরি করছে।
আর্থিক খাতের দুর্বলতা:
ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) কঠোর নিয়মের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, আইএমএফ (IMF)-এর মতে শক্তিশালী রাজস্ব নীতি, আয়কর সংস্কার এবং ইউরোবন্ডের সফল ইস্যুর কারণে ২০২৬ সালে সান মারিনোর অর্থনীতি একটি সুরক্ষিত অবস্থানে রয়েছে।
ট্যাক্স পলিসি জনবান্ধব কিনা?
হ্যাঁ, সান মারিনোর ট্যাক্স পলিসি অত্যন্ত জনবান্ধব, সহজ এবং বিনিয়োগ-অনুকূল। পার্শ্ববর্তী দেশ ইতালিসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের তুলনায় এখানকার করের হার অনেক কম, যা সাধারণ নাগরিক, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী এবং অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণদের জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক。নিচে সান মারিনোর ট্যাক্স পলিসি জনবান্ধব হওয়ার মূল কারণগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. সাধারণ নাগরিকদের জন্য প্রগতিশীল আয়কর (Personal Income Tax)
সান মারিনোর ব্যক্তিক আয়কর (৯% থেকে ৩৫%) ইউরোপের গড় কর হারের চেয়ে অনেক কম। এর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো কম আয়ের মানুষকে খুব সামান্য কর দিতে হয়:€১০,০০০ ইউরোর নিচে আয়: মাত্র ৯% ট্যাক্স।€১০,০০১ থেকে €২০,০০০ ইউরো: ১৫% ট্যাক্স।€৮০,০০০ ইউরোর বেশি আয়: সর্বোচ্চ ৩৫% ট্যাক্স (যেখানে ইতালিতে সর্বোচ্চ আয়কর ৪৩% এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে এটি ৫০% পর্যন্ত হয়ে থাকে)।
১. কোনো ভ্যাট (VAT) নেই:
সান মারিনোতে কোনো প্রথাগত ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স বা ভ্যাট (VAT) নেই। এর পরিবর্তে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর এককালীন মাত্র ১৭% ‘মনোফেজ’ (Monofase) ট্যাক্স নেওয়া হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে এই হার কমে ২% থেকে ৬% পর্যন্ত হয়। ফলে সাধারণ মানুষের কেনাকাটার খরচ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকে।
১. প্রবীণ ও অবসরপ্রাপ্তদের জন্য বিশেষ সুবিধাবিদেশি অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ ব্যক্তিরা (যাদের বয়স ৬০ বছরের বেশি এবং বার্ষিক পেনশন ন্যূনতম ৫০,০০০ ইউরো) যদি সান মারিনোতে বসবাস শুরু করেন, তবে তাদের পেনশনের ওপর মাত্র ৬% ফ্ল্যাট ট্যাক্স নেওয়া হয়। এটি প্রবীণদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং জনবান্ধব একটি নীতি。
২. ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের জন্য বড় ছাড়:
নতুন ব্যবসা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে উৎসাহিত করতে দেশটির কর ব্যবস্থা খুবই উদার:
কর্পোরেট ট্যাক্স:
সাধারণ কর্পোরেট ট্যাক্সের হার মাত্র ১৭%।
নতুন ব্যবসার জন্য ছাড়:
কোনো উদ্যোক্তা নতুন ব্যবসা চালু করলে প্রথম ৫ বছর ট্যাক্সের ওপর ৫০% ছাড় দেওয়া হয়, অর্থাৎ কার্যকর ট্যাক্সের হার দাঁড়ায় মাত্র ৮.৫%।
স্টার্ট-আপ ও ইনোভেশন: ফিনটেক বা ব্লকচেইনের মতো উদ্ভাবনী প্রযুক্তির স্টার্ট-আপগুলোর জন্য প্রথম ৩ বছর ০% (সম্পূর্ণ করমুক্ত) এবং পরবর্তী বছরগুলোতে মাত্র ৪% থেকে ৮% ট্যাক্স ধার্য থাকে।
১. কোনো সম্পত্তি কর (Property Tax) নেই:
সান মারিনোতে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য বাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনলে কোনো বার্ষিক সম্পত্তি কর বা ওয়েলথ ট্যাক্স দিতে হয় না। সম্পত্তি কেনার সময় কেবল একবারের জন্য একটি রেজিস্ট্রেশন ট্যাক্স দিতে হয়, যা সাধারণ নাগরিকদের ওপর দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক চাপ কমায়।
কর ব্যবস্থার কিছু চ্যালেঞ্জ (Blind Spots):
ট্যাক্স পলিসি জনবান্ধব হলেও সাধারণ মানুষের জন্য একটি ছোট নেতিবাচক দিক রয়েছে:
SMaC কার্ডের বাধ্যবাধকতা:
কর ছাড় বা রিবেট পাওয়ার জন্য নাগরিকদের প্রতিটি কেনাকাটায় একটি বিশেষ সরকারি কার্ড (SMaC Card) ব্যবহার করে ব্যয়ের রসিদ ডিজিটালভাবে ট্র্যাক করতে হয়। এটি সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা আমলাতান্ত্রিক বা বাড়তি ঝামেলা মনে হতে পারে।
সারসংক্ষেপ:
সান মারিনো কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য কোনো অবৈধ “ট্যাক্স হ্যাভেন” নয়, বরং এটি একটি স্বচ্ছ, কম করের এবং অত্যন্ত নাগরিক-বান্ধব অর্থনৈতিক অঞ্চল।
সান মারিনোর সরকার ব্যবস্থা হলো:
একটি একক সংসদীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। দেশটির সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে যৌথভাবে দুজন রাষ্ট্রপ্রধান থাকেন, যাদের ক্যাপ্টেন রিজেন্ট (Captains Regent) বলা হয় এবং তাঁদের মেয়াদ মাত্র ছয় মাস।সান মারিনোর সরকার কাঠামোর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:
রাষ্ট্রপ্রধান (ক্যাপ্টেন রিজেন্ট):
দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দুজন ক্যাপ্টেন রিজেন্ট দায়িত্ব পালন করেন, যা বিশ্বে বিরল। তাঁরা দেশের পার্লামেন্টের সদস্যদের দ্বারা প্রতি বছরের ১ এপ্রিল এবং ১ অক্টোবর নির্বাচিত হন।
আইনসভা (গ্রেট অ্যান্ড জেনারেল কাউন্সিল):
সান মারিনোর আইনসভা এককক্ষ বিশিষ্ট। এতে ৬০ জন সদস্য থাকেন, যাঁরা সরাসরি সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের মাধ্যমে ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হন।
সরকার ও নির্বাহী বিভাগ:
গ্রেট অ্যান্ড জেনারেল কাউন্সিল থেকে ১০ জন সদস্য নিয়ে ‘স্টেট কংগ্রেস’ গঠিত হয়, যারা সরকারের নির্বাহী এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার মূল দায়িত্ব পালন করে।
বিচার বিভাগ:
বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়, তবে দেশের প্রচলিত আইন ও নিয়ম অনুযায়ী আলাদাভাবে পরিচালিত হয়।রাজনৈতিক ব্যবস্থা: দেশটিতে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
সান মারিনোতে মোট সরকারি আমলা এবং পাবলিক সেক্টরের কর্মচারীর সংখ্যা আনুমানিক ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ জন।
মোট জনসংখ্যার (প্রায় ৩৪,০০০ জন) সাপেক্ষে এটি বেশ বড় একটি সংখ্যা।দেশটির অফিশিয়াল তথ্য এবং কর্মসংস্থান কাঠামোর মূল বিষয়গুলো নিচে দেওয়া হলো:
পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (মূল আমলাতন্ত্র):
শুধুমাত্র মূল সরকারি প্রশাসন বা সচিবালয়গুলোতে নিয়োজিত স্থায়ী কর্মকর্তার সংখ্যা প্রায় ২,০০০ থেকে ২,১০০ জন।
সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য খাত:
এর বাইরে স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা (Institute for Social Safety) এবং শিক্ষায় নিয়োজিত রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের যুক্ত করলে এই সংখ্যা প্রায় ৪,০০০ ছুঁয়ে যায়।
শ্রমশক্তির অনুপাত:
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সান মারিনোর মোট কর্মজীবী মানুষের প্রায় ২৩.৪% মানুষ সরকারি বা পাবলিক সেক্টরে চাকরি করেন।হ
সান মারিনোর শিক্ষা ব্যবস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়:
সান মারিনোর শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত ইতালীয় মডেলের উপর ভিত্তি করে তৈরি এবং এটি অত্যন্ত উন্নত। ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য শিক্ষা সম্পূর্ণ অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক। দেশটির সাক্ষরতার হার প্রায় ৯৯.৯%। সম্পূর্ণ সান মারিনো প্রজাতন্ত্রের একমাত্র এবং প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় হলো “ইউনিভার্সিটি অফ দ্য রিপাবলিক অফ সান মারিনো” (Università degli Studi della Repubblica di San Marino)।
সান মারিনোর শিক্ষা ব্যবস্থা ও উচ্চশিক্ষার মূল দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
শিক্ষা ব্যবস্থার ধাপসমূহপ্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক: ৬ বছর বয়স থেকে শুরু হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয় (Scuola Elementare) ৫ বছর এবং নিম্ন মাধ্যমিক (Scuola Media) ৩ বছরের হয়।
উচ্চ মাধ্যমিক:
এটি ৫ বছর মেয়াদি হয়ে থাকে, যেখানে শিক্ষার্থী তার আগ্রহ অনুযায়ী একাডেমিক বা বৃত্তিমূলক (Vocational) যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে পারে।প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ইউনিভার্সিটি অফ দ্য রিপাবলিক অফ সান মারিনো: ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশটির উচ্চশিক্ষার প্রধান কেন্দ্র।
মূল বিষয়সমূহ:
এখানে ব্যাচেলর এবং মাস্টার্স পর্যায়ে কমিউনিকেশন, ডিজাইন, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইন, অর্থনীতি, বায়োমেডিকেল স্টাডিজ এবং ঐতিহাসিক বিষয়ের উপর বিভিন্ন প্রোগ্রাম চালু আছে।
ডিগ্রির মান:
এটি বোলোগনা প্রসেস (Bologna Process) অনুসরণ করে, যার ফলে এখানকার ডিগ্রি সমগ্র ইউরোপীয় উচ্চশিক্ষা অঞ্চলে (EHEA) স্বীকৃত।
দেশটির ছোট আয়তনের কারণে এটি খুব বেশি বিশ্ববিদ্যালয় নেই, তবে তারা ছোট ক্লাসের মাধ্যমে উচ্চ মানসম্পন্ন ও ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে শিক্ষা প্রদান নিশ্চিত করে থাকে।
স্থায়ী নাগরিকত্ব বা রেসিডেন্সি পাওয়ার নিয়ম:
সান মারিনোর রেসিডেন্সি (বসবাসের অনুমতি) পাওয়া তুলনামূলক সহজ হলেও স্থায়ী নাগরিকত্ব (Citizenship) পাওয়া অত্যন্ত কঠিন ও দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। ইউরোপের এই ক্ষুদ্রতম ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে থাকার জন্য মূলত বিনিয়োগ, ব্যবসা বা নির্দিষ্ট আয়ের ওপর ভিত্তি করে রেসিডেন্সি দেওয়া হয়। নিচে ২০২৬ সালের সর্বশেষ নিয়ম অনুযায়ী রেসিডেন্সি এবং স্থায়ী নাগরিকত্ব পাওয়ার উপায়গুলো বিস্তারিত দেওয়া হলো:
১. রেসিডেন্সি বা বসবাসের অনুমতি পাওয়ার উপায় (Residency Permits)
সান মারিনোতে দীর্ঘমেয়াদে থাকার জন্য মূলত ৪টি প্রধান উপায়ে রেসিডেন্সি আবেদন করা যায়:
ঐচ্ছিক বাসস্থান বা বিনিয়োগের মাধ্যমে (Elective Residence):
এটি ধনকুবের এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম। এর জন্য দুটি শর্তের যেকোনো একটি পূরণ করতে হয়:
সান মারিনোতে ন্যূনতম ৫,০০,০০০ ইউরো মূল্যের আবাসিক সম্পত্তি বা বাড়ি ক্রয় করা। অথবা, সান মারিনো সরকারি বন্ড বা ফান্ডে ন্যূনতম ৬,০০,০০০ ইউরো ১০ বছরের জন্য সুদমুক্ত ডিপোজিট রাখা। এর পাশাপাশি আবেদনকারীকে নিজের খরচে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য বীমা নিশ্চিত করতে হয়।
ব্যবসায়িক রেসিডেন্সি (Active Investor / Business Residence):
যদি কোনো বিদেশি নাগরিক সান মারিনোতে নতুন কোনো কোম্পানি বা স্টার্ট-আপ খোলেন এবং সেই কোম্পানির ন্যূনতম ৫১% শেয়ারের মালিক হন, তবে তিনি রেসিডেন্সির আবেদন করতে পারবেন। তবে শর্ত থাকে যে, কোম্পানিটিতে অন্তত ১ জন স্থানীয় স্থায়ী নাগরিককে চাকরি দিতে হবে।
অবসরপ্রাপ্তদের জন্য বাসস্থান (Pensioners’ Atypical Residence):
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) বা সুইজারল্যান্ডের প্রবীণ নাগরিকরা (যাদের বয়স ৬০ বছরের বেশি এবং বার্ষিক পেনশন আয় ন্যূনতম ৫০,০০০ ইউরো অথবা ৩০০,০০০ ইউরোর সম্পদ রয়েছে) এখানে এসে স্থায়ী হতে পারেন। তাদের জন্য মাত্র ৬% ফ্ল্যাট ট্যাক্সের বিশেষ সুবিধা রয়েছে।
চাকরি বা পারিবারিক পুনরেকত্রীকরণ:
সান মারিনোর কোনো স্থানীয় নাগরিককে বিয়ে করলে অথবা কোনো স্থানীয় কোম্পানিতে বিশেষায়িত উচ্চমানের কোনো পদে চাকরি বা ম্যানেজমেন্ট পজিশন পেলে সাময়িক স্টে-পারমিট বা রেসিডেন্সি পাওয়া যায়।
১. স্থায়ী রেসিডেন্সি (Permanent Residence)
ওপরের যেকোনো উপায়ে রেসিডেন্সি কার্ড পাওয়ার পর সরাসরি স্থায়ী মর্যাদা পাওয়া যায় না। প্রথম ১০ বছর সাময়িক রেসিডেন্সি কার্ড প্রতি বছর বা নির্দিষ্ট সময় পর পর নবায়ন করতে হয় এবং বছরে অন্তত ২৭০ দিন সান মারিনোতে অবস্থান করতে হয়। টানা ১০ বছর সফলভাবে বৈধভাবে বসবাসের পর আবেদনকারী সান মারিনোর “স্থায়ী রেসিডেন্সি” (Registered/Permanent Residence) এবং সাধারণ নাগরিকদের মতো সকল সুযোগ-সুবিধা পান।
১. স্থায়ী নাগরিকত্ব বা পাসপোর্ট পাওয়ার নিয়ম (Citizenship)
সান মারিনোর পাসপোর্ট বা পূর্ণ নাগরিকত্ব পাওয়া বিশ্বের মধ্যে অন্যতম কঠিন। এর প্রধান নিয়মগুলো হলো:
দীর্ঘ বসবাসের শর্ত (Naturalisation):
কোনো বিদেশি নাগরিককে সান মারিনোর নাগরিকত্ব পেতে হলে দেশটির ভূখণ্ডে টানা ৩০ বছর আইনসম্মতভাবে বসবাস করতে হবে।
বিয়ের মাধ্যমে:
যদি কেউ সান মারিনোর কোনো নাগরিককে বিয়ে করেন, তবে এই সময়সীমা ৩০ বছর থেকে কমে ১৫ বছর হয়।
পূর্ববর্তী নাগরিকত্ব ত্যাগ:
সান মারিনো দ্বৈত নাগরিকত্ব (Dual Citizenship) সমর্থন করে না। ফলে নাগরিকত্ব পাওয়ার চূড়ান্ত ধাপে আবেদনকারীকে তার আগের দেশের (যেমন বাংলাদেশের) নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট সম্পূর্ণ ত্যাগ করতে হবে।
অন্যান্য যোগ্যতা:
আবেদনকারীকে অবশ্যই ইতালীয় ভাষায় দক্ষ হতে হবে এবং সান মারিনোর ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর পরীক্ষায় পাস করতে হবে। এছাড়া কোনো ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড থাকা চলবে না।
সান মারিনোর ইতিহাস-ঐতিহ্য:
সান মারিনো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন এবং একমাত্র টিকে থাকা মধ্যযুগীয় প্রজাতন্ত্র, যার ইতিহাস ও ঐতিহ্য ১৭০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন রয়েছে। ৩০১ খ্রিস্টাব্দে রোমান সাম্রাজ্যের ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে বাঁচতে সেন্ট ম্যারিনাস (St. Marinus) নামক একজন পাথরকাটা খ্রিষ্টান সাধু মাউন্ট টাইটানোতে এসে এই জনবসতি স্থাপন করেন, যা পরবর্তীতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়।সান মারিনোর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মূল উপাদানগুলো নিচে কয়েকটি প্রধান ভাগে সাজানো হলো:
১. অনন্য রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ইতিহাসOldest Republic:
এটি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্র। ৩০০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে আজ পর্যন্ত এই দেশের স্বাধীনতা কখনো খর্ব হয়নি।
ক্যাপ্টেনস রিজেন্ট (Capitani Reggenti):
১২৪৩ সাল থেকে চলে আসা ঐতিহ্য অনুযায়ী এখানে প্রতি ৬ মাস পর পর দু’জন রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হন। রোমান প্রজাতন্ত্রের কনসাল পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই শাসনব্যবস্থা বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন কার্যকর গণতান্ত্রিক কাঠামো।
সংবিধানের ইতিহাস:
১৬০০ সালে ল্যাটিন ভাষায় লেখা সান মারিনোর সংবিধাকনই বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন সচল আইনি দলিল (Statutes of 1600)।
নেপোলিয়ন ও লিংকনের সম্মান:
১৭৯৭ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট পুরো ইতালি জয় করলেও সান মারিনোর স্বাধীনতার প্রতি সম্মান জানিয়ে একে স্পর্শ করেননি। এমনকি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনও এই ক্ষুদ্র দেশের প্রাচীন গণতন্ত্রের প্রশংসা করে চিঠি লিখেছিলেন।
১. ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য ও স্থাপত্য:
মাউন্ট টাইটানো ও তিন দুর্গ:
মাউন্ট টাইটানোর পর্বতচূড়ায় অবস্থিত তিনটি প্রাচীন প্রতিরক্ষা দুর্গ—গুয়াইতা (Guaita), চেস্তা (Cesta) এবং মন্তালে (Montale) এই দেশের ঐতিহ্যের মূল প্রতীক, যা তাদের জাতীয় পতাকায়ও স্থান পেয়েছে।
ইউনেস্কো স্বীকৃতি:
২০০৮ সালে সান মারিনোর ঐতিহাসিক প্রাচীন শহর এবং মাউন্ট টাইটানোকে যৌথভাবে ইউনেস্কো (UNESCO) বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করে।
১. মধ্যযুগীয় উৎসব ও ক্রীড়া ঐতিহ্য:
ক্রসবো টুর্নামেন্ট (Palio delle Balestre Grandi):
প্রতি বছর ৩ সেপ্টেম্বর দেশটির জাতীয় দিবসে নাগরিকরা চতুর্দশ শতাব্দীর প্রাচীন রাজকীয় পোশাক পরে ঐতিহ্যবাহী ক্রসবো (ধনুর্বিদ্যা) প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।
মিডিয়েভাল ডেস (Medieval Days):
জুলাই মাসে পুরো সান মারিনো শহর একটি মধ্যযুগীয় দুর্গের রূপ নেয়। রাস্তায় প্রাচীন তলোয়ার যুদ্ধ, পতাকা ওড়ানোর খেলা (Flag-waving) এবং প্রাচীন বাদ্যযন্ত্রের কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়।
১. সাংস্কৃতিক ও রন্ধন ঐতিহ্যটর্তা ত্রে মন্তি (Torta Tre Monti):
এটি সান মারিনোর সবচেয়ে বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী কেক। খাস্তা ওয়াফেল এবং চকোলেট-হ্যাজেলনাট ক্রিমের স্তরে তৈরি এই ডেজার্টটি দেখতে তাদের তিনটি দুর্গের মতো।
ডাকটিকিট ও মুদ্রা সংগ্রহ (Philately & Numismatics):
১৮৭৭ সাল থেকে সান মারিনোর নিজস্ব স্মারক ডাকটিকিট এবং বিশেষ মুদ্রা তৈরির ঐতিহ্য রয়েছে, যা বিশ্বের কৌতূহলী সংগ্রাহকদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
সান মারিনো কোনো যুদ্ধবিগ্রহ ছাড়া কেবল তাদের কূটনৈতিক চতুরতা এবং স্বাধীনতার প্রতি অনড় ভালোবাসার কারণে ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য স্থান ধরে রেখেছে।
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটিতে স্থায়ী মুসলিম অধিবাসীর সংখ্যা মাত্র ১০ থেকে ১২ জন (যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ০.০৩%)।
সারসংক্ষেপে বলা যায়,
সান মারিনো আয়তনে বিশ্বের অন্যতম ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হলেও এর ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি একে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য ও গৌরবময় স্থান দিয়েছে। ১৭০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখা এই প্রাচীনতম প্রজাতন্ত্রটি একদিকে যেমন তার মধ্যযুগীয় শাসনব্যবস্থা ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে, অন্যদিকে তেমনি আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে গড়ে তুলেছে একটি অত্যন্ত উন্নত, কর-বান্ধব এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামো। ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে ইতালির ওপর নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও, নিজস্ব রাজনৈতিক চতুরতা ও কঠোর নিরপেক্ষতার নীতি দেশটিকে সবসময় সুরক্ষিত রেখেছে। একই সাথে, ক্ষুদ্র জনসংখ্যা হওয়া সত্ত্বেও আইনগতভাবে সর্বস্তরের মানুষের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে এটি একটি শান্তিপ্রিয় ও উদার সমাজব্যবস্থার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
লেখক *মুহাম্মদ রাশেদ খান*
সহযোগী সম্পাদক
*মাসিক ইতিহাস অন্বেষা*