👁 377 Views

জমি বিরোধে ২০ ঘণ্টা বাধার পর ধানের জমিতেই মিলল আদিবাসী বৃদ্ধার শেষ ঠিকানা- সালিস ব্যর্থ, ক্ষোভ শ্রীপুরে

‎‎আশিকুর রহমান সবুজ, শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি: ‎জমি সংক্রান্ত বিরোধের নির্মম শিকার হয়ে মৃত্যুর পরও দীর্ঘ ২০ ঘণ্টা শেষ ঠিকানার জন্য অপেক্ষা করতে হলো এক আদিবাসী বৃদ্ধাকে। স্থানীয় মাতব্বর, জনপ্রতিনিধি ও পুলিশের উপস্থিতিতে দফায় দফায় সালিস হলেও কোনো সমাধান না হওয়ায় অবশেষে মাওনা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হকের নিচু ধানের জমির পানি সেচে শেষকৃত্য/দাফনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

‎​চাঞ্চল্যকর ও মর্মান্তিক এ ঘটনাটি ঘটেছে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের আক্তাপাড়া গ্রামে। গত মঙ্গলবার বিকেলে বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান ওই গ্রামের মান্দাই (ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী) সম্প্রদায়ের মৃত মফিজ উদ্দিনের সংলগ্ন প্রতিবেশী শ্রী গোপালের স্ত্রী মেনোকা রানী (৭০)।

‎​নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সহায়-সম্বলহীন এই পরিবারটি মাত্র এক শতাংশ জমিতে বসবাস করে আসছিল। সৎকারের সুবিধার্থে চার বছর আগে প্রতিবেশী মফিজ উদ্দিনের পরিবারের কাছ থেকে সাড়ে তিন শতাংশ জমি কেনেন মেনোকা রানীর ছেলে শ্রী শুবিন্দ। নামজারি (খারিজ) জটিলতায় রেজিস্ট্রি সম্পন্ন না হলেও নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও চুক্তির মাধ্যমে পুরো অর্থ পরিশোধ করা হয়। কিন্তু মঙ্গলবার বৃদ্ধা মারা যাওয়ার পর সেই জমিতে কবর/শেষকৃত্যের প্রস্তুতি নিতে গেলে প্রতিবেশী ছফর উদ্দিন কবির ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা লাঠিসোঁটা নিয়ে বাধা দেয় এবং জমি বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করে।

‎​জটিলতা তৈরি হওয়ায় খবর পেয়ে শ্রীপুর থানা-পুলিশ ও স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তিরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। দুপুর থেকে রাতভর কয়েক দফা সালিস বৈঠক হলেও প্রতিপক্ষের একগুঁয়ে অবস্থানের কারণে কোনো সুরাহা মেলেনি। ফলে সারারাত মৃতদেহের পাশে বারান্দায় বসেই আকুল প্রতীক্ষায় রাত কাটাতে হয় স্বজনদের।

‎​ঘটনায় ক্ষোভ ও আকুতি প্রকাশ করে নিহতের ছেলে শুবিন্দ বলেন, “আমরা প্রান্তিক ও নিচু জাতের মানুষ বলেই কি মায়ের লাশ রাতভর উঠানে পড়ে থাকবে? জনপ্রতিনিধি ও পুলিশের দুয়ারে ঘুরেও বিচার পেলাম না। শেষ পর্যন্ত ধান রোপণ করা কাদামাটিতেই মায়ের শেষকৃত্য করতে হলো।”

‎​পরবর্তীতে চরম মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এগিয়ে আসেন মাওনা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক। তিনি তাঁর নিজের নিচু ধানের জমি দাফন/শেষকৃত্যের জন্য ছেড়ে দেন। বুধবার সকালে স্বজনেরা সেই জমিতে জমে থাকা পানি সেচে প্রস্তুত করেন এবং মৃত্যুর ২০ ঘণ্টা পর মেনোকার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

‎​বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা বিবাদমান পক্ষকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু তারা কোনো কথা মানতে রাজি হয়নি। চরম সংকটে বাধ্য হয়েই এই বিকল্প ব্যবস্থা করতে হয়েছে।”
‎​এ বিষয়ে শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম জানান, “সংবাদ পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি সমাধানের চেষ্টা করেছিল। তবে জমি সংক্রান্ত জটিলতা ও বিবাদীদের অসহযোগিতার কারণে বিষয়টি তাৎক্ষণিক মীমাংসা করা যায়নি। ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।”

‎​এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের উপস্থিতিতেও এমন অমানবিক বাধা প্রদান এবং একজন মৃত মানুষের সৎকারের অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় এলাকা জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় বইছে। স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এবং অসহায় পরিবারটির জমির অধিকার নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ আহ্বান করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *